গেলাম। আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছেন–কংগ্রেস মন্ডপে তোমাকে দেখেছি যেন মনে হচ্ছে?
কলকাতায় কংগ্রেস হয়েছিল বছর কয়েক আগে, পলকের সেই ক্ষণিক দর্শন তাঁর রয়ে গেছে।
হ্যাঁ। তখন ভলান্টিয়ারি করতাম তো।
বেজায় চেঁচাচ্ছিলে তোমরা। মনে আছে তাই।
আমাদের ভলান্টিয়ারদের কাজই ছিল তাই। প্যান্ডেলের গেটে দাঁড়িয়ে আগমন নির্গমনের পথে নেতাদের–গান্ধী, জহরলাল, সুভাষচন্দ্র থেকে শুরু করে বড় মেজ ছোট সবাইকার জয়ধ্বনি দেবার। বিধানচন্দ্র কি জয় বলে চেঁচিয়েছি নিশ্চয়।
কী হয়েছে তোমার?
কোষ্ঠবদ্ধতা। কিছুতেই কোষ্ঠ পরিষ্কার…..।
বুঝেছি। যা খাচ্ছ তা হজম হচ্ছে না। পরিষ্কার হচ্ছে না তাই। আচ্ছা, এই ওষুধটা নিয়ে খাওগে বলে পাশের দেরাজ থেকে একটা ওষুধ বের করে দিলেন-রাত্রে শোবার আগে গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাবে, বুঝেছ?
কিন্তু দুধ পাবো কোথায়?
তবে জল মিশিয়ে খেয়ো। তাতেও কাজ দেবে।
কদিন বাদে গেলাম ফের। কী হলো? সেরে গেছে তো?
না সার, ঠিক তেমনিই…
আশ্চর্য! এমন হবার তো কথা নয়। আচ্ছা, এটা খেয়ে দ্যাখো দেখি। এটা আরো জব্বর দাবাই। আরেক বোতল দিলেন তিনি আমায়-এর জন্য দাম লাগে না স্যাম্পল ফাইল দেয় এরা ডাক্তারদের। অমনি পাই আমরা। নিয়ে যাও।
নিয়ে এলাম। যথাবিধি খেলাম। কিন্তু বাথরুমে গিয়ে ফলের সাক্ষাৎ নেই।
আবার যেতে হলো তাঁর কাছে–ঐ ছুতো ধরেই…..
এখনো সারলো না? আশ্চর্য! এমন তো হয় না। তুমি করো কী শুনি?
কী করব?
কাজ-টাজ কিছু করো না?
লেখাটেখার কাজ করি।…
কী লেখো? হিসেবের খাতা?
এই গল্প কবিতা প্রবন্ধ ইত্যাদি……
আমার বেহিসেবি দপ্তর বার করি।
টাকা পাও?
ছাপতেই চায় না কেউ, টাকা দেবে তার ওপর? ছাপালেই বর্তে যাই মশাই!
এবার ধরেছি তোমার ব্যায়রাম। এই তার ওষুধ। ধরো। বলে ড্রয়ার থেকে খান কয়েক নোট বার করে দিলেন দশ টাকার–পেট ভরে খাওগে। খেলে পরে তবে তো বেরুবে। আহারের পরেই না বাহার!
.
৭৩.
ডাক্তার রায়ের দাক্ষিণ্য ডান হাতের মুঠোয় পাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাবলাম, কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় যাওয়া যাক, পেটভরে খাওয়া যাক আজ। আমিনিয়াতেই যাই না কেন!
অবশ্যি, ক্ষুৎপীড়িতের পক্ষে ডালমুটও কিছু খুঁতখুঁত করায় মত নয়, তাই মুঠো মুঠো খাওয়া যায় মুফত পাওয়া যায় যদি-সেখানে আমিনিয়ার বিরিয়ানি তো রূপে-গুণে নিখুঁত। তবে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের থেকে আমিনিয়া অনেকখানি, পায়দল আধঘণ্টার পাল্লা, আর ট্রাম ভাড়ায় দশ টাকার নোট ভাঙবে না–এদিকে সবুর সইছে না আমার। বিধানবাবুর বাড়ির কাছাকাছি সাবীর-এই চলে গেলাম সটান। তার চপ-এর জন্য চাপল্য দেখালেও দুষ্য হবে না, উপাদেয়তায় ও কিছু তুচ্ছ নয়।
ভরপেট খেয়ে ভরদুপুরে সিনেমা দেখে সন্ধ্যের পর বাসায় ফিরে দেখি, আমার অনুপস্থিতির সুযোগে কে বা কারা এসে আমার সারা ঘর তছনছ করে গেছে। তোরঙ্গ সুটকেস ওলটপালট, বিছানা-টিছানা ওলটানো, বইটই যত গড়াগড়ি, লেখা-পত্তর ছড়াছড়ি-দস্তুরমতন রাহাজানি। হানি তেমন কিছু না হলেও এক লণ্ডভণ্ড কাণ্ডই!
কে এসেছিল মশাই, আমার ঘরে? পাশের ঘরে গিয়ে শুধাই।
তা তো জানিনে। ধূপকাঠি বেচতে এসেছিল একজন, আমরা তখন আপিসে বেরুচ্ছি। কে কিনবে ধূপকাঠি, ধূপকাঠি নিয়ে কী করব আমরা? আপনার ঘরটা ভোলা পেয়ে সে বললে, আমার আত্মীয় হন ইনি, এখনই তো আসবেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক না হয়। তারপর আমরা তো সব বেরিয়ে গেছি মশাই, কিছুই জানিনে। কেন, কী হয়েছে?
না কিছু হয়নি। জানতে চাইছিলাম এমনি।
বাসার ভৃত্য দাতারাম জানাল, সারা দুপুর আমার বিছানায় গড়িয়েছে লোকটা, তারপর কখন উঠে চলে গেছে সে তার খবর রাখে না।
কিছু নিয়ে গেছে নাকি লোকটা?
কী নেবে! কিছু থাকলে তো নেবে। কিছুই নেই আমার ঘরে। কখনই থাকে না! সেই কারণেই তালা লাগাইনে আমি। ভোলাই পড়ে থাকে আমার দরজা।
লোকটা কি আপনার কোনো আত্মীয়-টাত্মীয় নয় তা হলে? কোনো চোর ছ্যাঁচোর নাকি!
না না, চোর ছাঁচোর কেন হবে। আত্মীয়ই বটে আমার। আমি জানাই আমার সগোত্রই।
না, খোয়া কিছু যায়নি আমার, খোয়াবার কিছু ছিলও না। তবে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে লোকটার খোয়র হয়েছে যৎপরোনাস্তি। সেটা আমি বুঝতে পারি।
নিরুদ্দিষ্ট বন্ধু আমাকে এক বাণ্ডিল ধূপকাঠি উপহার দিয়ে গেছেন দেখলাম। মাথার বালিশের উপরে সযত্নে সুরক্ষিত সেই গোছাটা, তার সঙ্গে একখানা চিরকুট এবং তাতে জড়ানো একটা দশ টাকার নোট।
চিরকুটে লেখা-সারা ঘর হাঁটকে পাঁটকে হয়রান, কোথাও কিছু নেইকো, একটা পয়সাও না। বাক্স-তোরঙ্গ, সুটকেস-ফুটকেস, বিছানার তলাটা সব হাতড়ালাম–কিছুই বাদ দিইনি, নোট-ফোট দূরে থাক, কানাকড়িটাও পাওয়া গেল না। তোমার অবস্থা দেখছি আমার চেয়েও শোচনীয়। বাসার ঠাকুর পরশুরাম পাড়হির কাছে খবর নিয়ে জানা গেল, টাকা দিতে পারেনি বলে ম্যানেজারের মানায় তোমার মিল বন্ধ যাচ্ছে কদিন থেকে। খাবার জন্য বাসায় না ফিরতেও পারো এখন, শুনে দুঃখিত। খাচ্চো কী হে? কোথায় খাচ্চো? রাজেন্দ্র মল্লিকে নাকি? চলছে কি করে তোমার? তোমার লেখাপত্তর ঘেঁটেঘুঁটে জানা গেল তুমি এক লেখক, কবিও আবার তার ওপর। লম্বা লম্বা কবিতা দেখলাম–কী সর্বনাশ। এইসব ছাইপাঁশ লেখো নাকি তুমি? ছি ছি! অবশেষে তোমার একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে তোমার বিছানায় শুয়ে পড়া গেল খানিকক্ষণ, তার ভেতরই খানিক ঘুমিয়েও নিয়েছি আবার। আমিও তোমার মতই এইসব, এমনি সব রাবিশ লিখতাম এককালে। এখন আর লিখি না, এই ধূপকাঠি বেচি এখন। যা হোক, তা হলেও দিনান্তে দুপয়সার মুখ দেখতে পাই, তুমি বোধ হয় তাও পাও না। আমার অন্ন জোটে অন্তত, তোমার কি জোটে? আমি বলি কি, এইসব আগডুম বাগড়ম ছেড়ে দিয়ে সোজা বটতলায় চলে যাও, সেখানে গিয়ে দশ বারো আনা দামের একখানা অল্প মূলধনে সহজ শিল্পকর্ম শিক্ষা বইটা কিনে আনোগে। তারপর আমার মতন এই ধূপকাঠি বেচার ব্যবসা শুরু করো-আড়াই টাকার মূলধনেই ফলাও কারবার। কোনো দুঃখু থাকবে না আর। সেইজন্যেই এই দশ টাকা দিয়ে গেলাম তোমাকে। তুমি দাঁড়াতে পারলে আমি খুশি হবো। ইতি
