কিন্তু সত্যি বলতে, শিশিরবাবুর দিক থেকে ততটা নয়, শরৎচন্দ্রের ব্যবহারে আমার আঁতে লেগেছিল যেমনটা। উপন্যাসের দরদী শরৎচন্দ্র জীবনের বাস্তববিন্যাসে এক নিমেষে কোথায় যে হারিয়ে গেলেন।
মনে পড়ল কবির কথা, কাব্য পড়ে যেমন ভাবো, কবি তেমন নয় গো! কিন্তু তাহলেও একী! যাঁর লেখার পত্রে, ছত্রে ছত্রে এত দরদ, টাকার দিক দিয়ে ধরতে গেলে তার এই দস্তুর!
টাকার কষ্টিপাথরে আর কষ্টের অকূল পাথারেই মানুষের যথার্থ পরিচয় বলে যে, তা মিথ্যে নয়।
কিন্তু এটাই স্বাভাবিক–আজ আমি তা বুঝতে পারি। সাধারণ মানুষ অসাধারণদের চেয়ে মানুষ হিসেবে অনেক বড় সত্যিই। এবং সবার উপরে মানুষ সত্য যে মানুষ, সে হচ্ছে এই জনসাধারণ। উপরওয়ালা মানুষরা না। যেহেতু যে মানুষ যত উচোয় উঠেছে, আরেক দিকে সে ততটা নিচেই নেমে গেছে। যে প্রাসাদ যত উদ্ধলোকে স্থিত, নিশ্চিতরূপেই তার ভিত নেমেছে তত নিচেয়-যত নিভৃতই হোক না। সমস্তরে সাধারণ মানুষ সমান স্তরের সকলের সঙ্গে সমতুল্য ব্যবহার করে মানুষের মতই, কিন্তু উচ্চলোকে অভিব্যক্তিরা (তাঁদের শিল্পে, সাহিত্যসৃষ্টিতে, যেরূপেই দেখা দিন না) সাধারণদের তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকেন। অতি-মনুষ্যরা অবশ্যই অবমনুষ্য হতে বাধ্য। না হয়ে যায় না।
প্রতিভার এটা অভিসম্পাত কিনা জানি না, তবে সপ্রতিভদের এই উৎপাত। বিশ্বাত্মবোধে বিশ্বকে আত্মসাৎ করার ভগবদ্দও ন্যায্য অধিকার তাঁদের। অন্তত তাঁরা তাই মনে করেন। এবং সেই কর্মের হেতু কোনো দুঃখ দরদ দূরে থাক, সঙ্কোচমাত্র বোধ করেন না। এইহেতু প্রতিভাধরদের থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ।
প্রতিভার অবদানই শ্রেয়, তাই আমাদের গ্রহণীয় হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিভার প্রতিভুকেও নিতে গেলে তাঁর খাঁই মেটাতে নিজের লেশমাত্রও অবশেষ থাকে না, অবশেষে নিজেও যেতে হয়। প্রতিভা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গযোগে নিয়মের পর যমের স্থান-প্রতিভা সেই যম। আশপাশের সব কিছু, সবাইকেই তিনি হজম করেন। তাই করেই বেঁচেবর্তে থাকেন, বাড়বাড়ন্ত হয় তাঁর।
গোরর চেয়ে গোরুর দুধ ভালো, তাই খেয়েই খুশি থাকতে হয়, তার ওপরেও যে গোসেবায় এগোয়, সে-হতভাগা কখনো না কখনো গোরর গুঁতো খায়ই-যদি তার নিজেরও সমান গোরুত্ব না থাকে। দুঃখের কথা, এই জ্ঞান আগের থেকে কারু হয় না। হলে পর হাড়ে হাড়ে সেই শিক্ষালাভের পর তা আর যাবার নয়। সেই শিক্ষা কখনই সে হারায় না আবার। তাবৎ প্রতিভার থেকে তার পর থেকে সে সুদূরপরাহত হয়ে থাকে। অবশ্য দূরের একটা নমস্কার রাখেই।
পৃথিবীতে চিরদিনই দুধরনের মানুষ আছে, থাকবেও। এক দল দিয়ে ফতুর–বিদ্যাসাগর, দেশবন্ধুগোত্রীয়; আরেক দল নিতে চতুর। তাদেরই হরণ পূরণে অদানে প্রদানে লতি দুনিয়া। এর খেলা চালু রাখতে সবারই দরকার। এটা শুধু জীবনযাপনেরই মূল কথা নয়, এর ভেতর দিয়েই অন্তরালের খেলোয়াড় চিরদিনের সেই লীলাময়ের মোলাকাত।
সেই যিনি বহু বাসনার প্রাণপণ চাওয়ার থেকে বঞ্চিত করে সারা জীবন বাঁচান আমাদের বঞ্চনার ছাইয়ের গাদা থেকে পরম সোনার সঞ্চয় উদ্ধার করেন বারংবার। থাবড়া মেরে ব্যথা দিয়ে ভুল পথের থেকে মুখ ঘুরিয়ে ঠিকপথে নিয়ে আসেন শেষত। নিজের বৃত্তিপথের অমৃত উত্তরণে আনেন। ভগবান যা করেন ভালোর জন্যই, মিথ্যে নয়। শেষ পর্যন্ত বেশই হয়।
রঙ্গলোকের নেপথ্য থেকে অমন মার খেয়ে বার হতে না পারলে কী দশা যে হতো আজ আমার! ঠিক পথে এসেছি কিনা জানিনে, তবে বিপথগতি বিপদমতির ফাড়াকাটিয়ে বেঁচে গেছি। নীহারিকালোকে বিপদগ্রস্ত আর মহানায়কদের কবলে পর্যদস্ত হতে হয়নি আমায়।
তাহলেও বেশ কিছুদিন খুব টানাটানিতেই কেটেছিল আমার। মরুভূমির বুকে সেই শিশির সম্পাত কবেই উবে গেছে, কোনো প্রবোধলাভও করিনি আর তারপর। আত্মশক্তির চাকরিটাও ছিল না–টানাটানি হবার কথাই। লম্বা লম্বা কবিতা লিখি, গল্পও ফাঁদি, সেসব ভারতবর্ষ, কল্লোল, উত্তরা ইত্যাদি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশও পায়, কিন্তু তার ফাঁদে টাকাটা সিকেটাও ধরা পড়ে না।
কোথায় যাই? কার কাছে গিয়ে প্রার্থনা জানাই? দেশবন্ধুও বেঁচে নেই তখন। আমার জানাশোনার মধ্যে কেউই নেই বলতে গেলে। ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, বিধান রায়ের কাছেই যাই না কেন? কিন্তু কী ছুতোয় যাব? বয়েস হয়েছে, কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক, বেকার থাকার কোনো অর্থ হয় না-বেকার থাকাতেও অর্থ নেই তা বুঝি। ছোট ছেলেটি আর নই তো, কারো কাছে অমনি কিছু চাইতে গেলে সঙ্কোচ হয়।
বিধান রায়ের অনেক প্রতিপত্তি প্রভাব শুনেছি। ইচ্ছে করলে তিনি যে-কোনো একটা কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। অনেককে দিয়েছেন বলে শোনা ছিল।
ভাবলাম, অসুখের ছুতো করে তো অনায়াসেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায়। সেইভাবেই যাই না হয়, গিয়ে আলাপ জমাইগে। তারপর ভাব একটু জমলে চাকরিবাকরির কথা পাড়া যাবে। কোন্ অসুখের ছুতো করে যাব, ভাবি তাই।
তিনি নাকি চেহারা দেখেই রোগের মালুম পানশোনা ছিল। রোগীরও মালুম পান তবে নিশ্চয়। বোগের স্থলে যদি আমাকেই একটি বোগ বলে ঠাওরান তাহলে?
এমন একটা রোগ বানিয়ে যেতে হবে, যেটা কোনো ডাক্তারেরই ধরার সাধ্য নেই। তেমন। একটা ছুতো নিয়েই যেতে হবে। তবে, ঐ মাথা ধরার মত কিছু নয়–যা নাকি একটা সারিডনেই সারবার। ক্রনিক ধরনের কিছু বানিয়ে যেতে হবে।
