ভালো করেছি কি না জানি না। কেননা, নীহার দেবীর সর্বস্বত্ব প্রবোধবাবুর সংরক্ষিত হলেও প্রবোধবাবু স্বয়ং ছিলেন নাকি তাঁর তাঁবেই।
অবশ্যই সেই তাঁবেদারির জন্যই নয়, শচীন্দ্রনাথের অনন্য নাট্যকৃতিত্বের কারণেই দেশাত্মবোধক গৈরিক পতাকা (সরকারে বাজেয়াপ্ত) থেকে ঝড়ের রাতে (সতু সেনের আলোক-সম্পাতে যে প্রযোজনা নাট্যজগতে নতুন দিক্-নির্দেশ করেছিল) তাঁর অনেক বই প্রবোধ গুহর রঙ্গমঞ্চে হয়েছিল। কাজেই, কান টানলে যেমন মাথা আসে, পা টানলেও হয়ত তেমনি ঘাড়ের ওপর চেপে বসা যায়–নাই ধরে মাথায় ওঠা যায় যেমন কিনা।
সেই নাই ধরেই প্রবোধবাবুর হৃদয়ে একটুখানি ঠাই পেয়েছিলাম বুঝি। দুটো না-ই মিলে যেমন একটা হা-ই হয়ে যায়, তেমনি ষোড়শীলাভে বঞ্চিত তাঁর ষোড়শীর লাভে প্রবঞ্চিত আমার প্রতি হয়ত একটু সহানুভূতি জেগে থাকবে, তিনি ডেকে আগাম দক্ষিণা দিয়ে নিরুপমা দেবীর দিদি বইয়ের নাট্যরূপান্তরের বরাত দেন আমায়। বরাত দেখুন! এক জায়গায় টাকার ভাগে ভাগীদার না হয়েও আরেক জায়গায় টাকার ভাগ্য খুলে যায় কেমন করে।
টাকার ভাগ্য খুলেছিল আমারও। দিদির জন্য আগাম সেই মোটা দাদন পাওয়ার পরেও পেয়েছিলাম আমি আরো। নাট্যকারের প্রাপ্য একটা সম্মানরজনীর সম্পূর্ণ বেনিফিট তিনি দিয়েছিলেন আমাকে–যদিও দিদি তেমনটা মঞ্চসফল হয়নি। তাহলেও তিনি সান্ত্বনাচ্ছলে বলেছিলেন যে, রিভলভিং স্টেজ হলে এ-বই নাকি জমানো যেত ভালোই।
ঘূর্ণায়মান মঞ্চের সাফল্য লাভ না হলেও আমার কপালটা ঘুরে গেল আরো। তিনি আমাকে আরো বেশ কিছু পাইয়ে দেবার নিমিত্ত হলেন, তাঁর নাট্যনিকেতনের দুতিন লাখের অগ্নিবীমাটা আমাকে দিয়েই করালেন। আমাদের হেমন্তদা (স্বরাজ্য দলের অন্যতম নেতা হেমন্তকুমার সরকার ) নরউই ইনস্যুরেন্সের একজন কর্তাব্যক্তি ছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে প্রবোধবাবুর প্রস্তাবটা পাড়লাম। কমিশনবাবদে কয়েক হাজার টাকার প্রাপ্তিযোগ ঘটে গেল কয়েক দিনেই।
পৃথিবীর এটাই ধারা–এই রকমটাই ঘটে থাকে। কোথাও অবশ্যপ্রাপ্য না পাওয়া, কোথাও বা অভাবিত পাওনা অযাচিত পেয়ে যাওয়া। এইভাবে দিতে দিতে পাওয়া আর পেতে পেতে যাওয়া–এই দুনিয়ার এই ধারারই লেনদেন অবিরাম। সেই রহস্যময় সূত্র ধরেই সেদিনের বীমান্তকারী সেই আমার অসামান্য লাভের সীমান্ত ছোঁয়া!
.
৭২.
ষোড়শী নিয়ে লড়ালড়ি চিরদিনের সেই সুন্দ-উপসুন্দর আমল থেকেই। আর দেনাপাওনার জেরও কখনই মেটে না। আর সেই সব মিলিয়ে সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন অসুন্দর।
জানি; কিন্তু জানলেও মন মানতে চায় না। এমন কি, কোনো ভাবমূর্তি নিছক মনগড়া হলেও তা ভাঙলে মনে লাগে, না লেগে পারে না। নিতান্ত পৌত্তলিকতা যদিও, অন্তর্গত সেই পুতুল (বা প্রতিমাই) ভেঙে পড়লে মনের খানিকটা নিয়েই পড়ে বুঝি।
আমার মর্মের পীঠস্থান থেকে শরৎচন্দ্রের মর্মর মূর্তির ঋলন সেদিন আমার মনে বেশি লেগেছিল–লাভালাভের নীট হিসেবের থেকেও। তাঁর সেই ভঙ্গুর দশাই তখন আমার কাছে মর্মান্তিক।
ভাবমূর্তি উপে গিয়ে কী ভাবমূর্তিই না দেখেছিলাম তাঁর সেদিন!
ষোড়শীর বেনিফিট নাইটে আমারও কিছু প্রাপ্যগন্ডা থাকবে আশ্বাস পেয়েছিলাম শিশিরবাবুর।
অভিনয় শেষে গ্রীনরুমে গিয়ে জানলাম, (শিশিরবাবু স্বমুখেই) সেদিনকার বিক্রির সব। টাকা একটা থলেয় ভরে রাখা হয়েছিল, সেই থলিটা নিয়ে শরৎচন্দ্র চলে গেছেন খানিক আগেই।
শিশিরবাবু আমার অংশত দাবীর কথাটা তাঁকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নাকি তা দাবিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন-শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে করেনি কিছু না। তার ছেলে নেই পুলে নেই, ঘর নেই সংসার নেই–টাকার তার কীসের দরকার।
এই বলে থলে নিয়ে ট্যাকসি ডাকিয়ে এতক্ষণে হয়ত হাওড়া স্টেশনে।
তবুও শিশিরকুমার বলতে গেছলেন–ক্ষমাঘেন্না করেও কিছু অন্তত দিন ওকে শরৎদা!
তার জবাবে তিনি এই বলেছেন, আমার বেনিফিট নাইটের বখরা ওকে দিতে যাব কেন? এ রাত্তিরে টিকিট বিক্রি হয়েছে আমার নামে, আমার জন্য টাকা দিয়ে দেখতে এসেছে সবাই। এর ভেতর সে আসছে কোথা থেকে?
আমি আর কিছু কইতে পারি না। সত্যি! আমার টাকার দরকার কী! মেসের টাকা বাকী, এর ওর তার কাছে ধার, এটা ওটা সেটার দরকার–কিন্তু তা নিয়ে উচ্চবাচ্যর কী প্রয়োজন! আমার অভাবের চাকী এখানে ঘুরিয়ে কী লাভ? তা শুধু আমাকে পিষ্ট করার জন্যই, অপরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের নিমিত্ত নয়। আমার নিজের চরকায় আর কেউ তেল দিতে আসবে কিসের গরজে?
আমি চুপ করে থাকি। শিশিরবাবু তাঁর এক ভাইকে বলেন–দ্যাখ তো কিছু পড়ে আছে কিনা কোথাও।
ক্যাশবাক্সে যা ছিলো, সবই তো দেওয়া হয়ে গেছে শরৎদাকে। টিকিটঘরে একটা পয়সাও পড়ে নেই আর।
আমার চেক বইটা আন।
চেক বই এলে আমাকে শুধান, ক্রস চেক দেবো?
ভাঙাবো কোথায়? আমার কি কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কোথাও!
একটা পে টু সেলফ লিখে দাওনা দাদা, তাঁর ভাই বাতলায়।
একশকুড়ি টাকার একখানা সেল চেক কেটে দেন তিনি তৎক্ষণাৎ। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে এই টাকাটাই পড়ে আছে দেখছি।
এর বেশি আর কিছু বললেন না। যা পাই যথা লাভ জ্ঞান করে আমিও বাক্যব্যয় বাহুল্য বোধ করি।
সেই একশকুড়িই আমার কাছে এক কাঁড়ি। তখনকার মতন দুঃখ প্রশমনের পক্ষে অনেক টাকা। এই সেলফ হেলপেই চলে যাবে এখন দিনকতক।
