তবে রবীন্দ্রনাথকে না আনলেও শরৎচন্দ্রকে রঙ্গমঞ্চে প্রথম আহরণের মাহাত্ম তাঁর। যদিও সেটা অনেক গড়িমসির পরেই। এবং এক রকম, ঐ প্রবোধবাবুকে টেক্কা দিতে গিয়েই।
আমি যখন গোড়ায় দেনা-পাওনার নাট্যরূপের খসড়া নিয়ে তাঁর কাছে যাই, তিনি দেখেশুনে ভেরি ক্লেভারলি ডান্ বলে আমাকে তা ফেরত দিয়েছিলেন। আমি তখন কী করি, টাকার দরকার, আমার বন্ধু জগৎ ভট্টাচার্যকে তা ছাপতে দিই। সরলা দেবী সম্পাদিত ভারতী মাসিকপত্রের তিনি তখন সহযোগী সম্পাদক, শরৎচন্দ্রের অনুমতি নিয়ে তাঁর নামেই সেটা তিনি ভারতীর শারদীয় আর সর্বশেষ সংখ্যায় বার করেন–দক্ষিণার সিংহভাগ স্বভাবতই শরৎবাবুকে দিয়ে নামমাত্র কিছু নাট্যরূপ দাতারূপে নিজের নাম হারানো সত্ত্বেও ) পেয়েই আমি বর্তে যাই, বলাই বাহুল্য। এবং ভারতীতে প্রকাশ লাভের পরই প্রবোধবাবু সে বই মঞ্চস্থ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। খবরটা পাবামাত্রই শিশিরকুমার পাণিত্রাসে তাঁর কাছে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বইয়ের অভিনয় স্বত্ব আগেভাগেই হাতিয়ে নিয়ে আসেন। তাহলেও, কাজটা এমন কিছু নিন্দনীয় হয়েছে আমার মনে হয় না। নাথিং আনফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার… ইত্যাদি ইত্যাদি বলে না?
এবং লাভের কথাটা ধরতে গেলে, এরকম কাজ করতেই হয়। আর সেদিকটা খতিয়ে দেখে বলা যায়, ষোড়শীই তাঁর প্রযোজনা-কৃতিত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে লাভজনক অধ্যায়। তাঁর অভিনয়কীর্তিতে সবচেয়ে কীর্তিত।
রবিতীর্থের পরিক্রমায় প্রবোধ গুহর অনুগমন করলেও শিশিরকুমারের নিজের পরাক্রম কিছু কম ছিল না। প্রবোধচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেও তাঁর পদক্ষেপ ছিল স্বভাবতই অন্য রকমের। প্রয়োগ প্রযোজনা আর অভিনয়রীতির স্বকীয়তায় তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না।
তা ছাড়া, তিনি সর্বদাই ছিলেন পাদপ্রদীপের সম্মুখে, আর প্রবোধবাবু নেপথ্যে। তাই প্রবোধবাবুর কৃতিত্ব তাঁর অন্তরঙ্গদেরই জানা কেবল, যেকালে শিশিরকুমারের কীর্তি সর্বজনপরিদৃষ্ট।
বিখ্যাত নাট্যতাত্ত্বিক ও সমালোচক চন্দ্রশেখর ওরফে মনুজেন্দ্র ভঞ্জ মশাইয়ের সঙ্গে সেদিনকার অকস্মাৎ সাক্ষাৎকারে টের পেলাম যে, সেকালের আমার নাট্যকাহিনী রচনার ভেতর বিস্তর গলদ-বহুং ইতরবিশেষ ঘটে গেছে। এই বিশেষ ইতরতার জন্য নিজের দায় মেনে নিয়েও আমি বলতে চাই যে, আমার অগাধ বিস্মৃতিশক্তিই এহেতু দায়ী। মেমারি বর্ধমানের হলেও আমার মেমারিরা কোন কালেই বর্ধমান নয়, বরং দিনকের দিন ক্ষীয়মান, ম্রিয়মাণ। তার প্রমাণ এই রচনায় যত্রতত্র।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, মনুজবাবু চন্দ্রশেখর ছদ্মনামে তাঁর সাপ্তাহিক নাট্য আলোচনা আমার সম্পাদিত আত্মশক্তিতেই শুরু করেছিলেন, আমি ভুলে গেছলাম, তিনি আমায় মনে করিয়ে দিলেন সেদিন। তারপরে আমি সে-পত্রিকা ছেড়ে এলেও তিনি তাঁর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন শেষপর্যন্ত। এখন তিনি হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় ঐ বিভাগীয় সম্পাদক। তিনি আত্মশক্তিতে শুরু করেছিলেন, সে খবর ভুললেও তিনি যে বাংলা নাট্যালোচনায় যুগ-প্রবর্তনার মূল, সে কথা তো ভুলবার নয়। তাঁর রচনাগুলি ক্লাসিক পর্যায়ের ছিল সে কথা বলইে হয়।
তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম, জানবার পর মনে পড়ল যে, শিশিরবাবুর নাট্যমন্দির গোড়ায় ছিল মনোমোহন থিয়েটারে–যার ওপর দিয়ে এখন চিত্তরঞ্জন এভিনিউ বেরিয়ে গেছে। চিত্তরঞ্জন এভিনিউ আর বিডন স্ট্রীটের ত্রিবেণীসঙ্গম থেকে তিনি চলে আসেন শ্যামবাজারে–যেখানে এখন উত্তরা আর শ্রী সিনেমা। শহরের উত্তরাঞ্চলে এই শ্ৰী-ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর শ্রীরঙ্গম। ষোড়শীর অভিনয় হয়েছিল এখানেই।
এখন যেখানে বিশ্বরূপা, সেখানে এসেছিলেন প্রবোধ গুহই স্টার মঞ্চের থেকে বিযুক্ত হবার পর। বিশ্বরূপার স্থলে তেলের কল না কী যেন ছিল তখন, জায়গাটা নিয়ে ভেঙে গড়ে প্রবোধবাবু তাঁর নাট্যনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। সময়টার সমস্তটা না হলেও কিছু কিঞ্চিৎ মনে পড়ছে এখন আমার খুব ক্ষীণভাবে যদিও–এমন কি, নাট্যনিকেতনের গ্রীনরুম পর্যন্ত–যেখানে একদা প্রসিদ্ধ নাট্যকার আমাদের শচীনদাকে একান্তভাবে নীহারবালার পদসেবায় নিযুক্ত দেখেছিলাম।
একান্তভাবে হলেও কোনো কান্তভাবে নয়, গোড়াতেই বলে রাখি। শচীনদা নিষ্কলুষ দেবতুল্য চরিত্রের, সেদিক দিয়ে কটাক্ষপাত করার কিছু নেই, তবে কিনা একটুখানি স্নেহপ্রবণ, এই যা। নীহারদেবী শয্যাশায়ী হলেও তিনি তাঁর পাশে বসে, দেবী চৌধুরাণীর ব্রজেশ্বর সেকালে যে কর্মে উদ্যোগী হয়েছিল (বঙ্কিম দৃষ্টিতে তাকালে) শচীনদাও তাতেই ব্যাপৃত-হয়ত কিছু অপত্যস্নেহ থাকলেও, অকথ্য কিছু অপকর্ম নয়।
আচমকা আমায় দেখে শচীনদা অপ্রতিভের মত বললেন, নীহারের পা কামড়াচ্ছে কি না…!
নীহারবালা একটুখানি মুচকি হাসলেন মাত্র। কিছু বললেন না।
কৈফিয়ত, দেবার কিছু ছিল না, চিরকুমার সভার সঙ্গীতবন্যায় সারা দেশ ভাসিয়ে (তিনিই বোধ হয় প্রথম রবীন্দ্র-গায়িকা) কবিগুরুর স্নেহধন্যা সুরকন্যা তন্বী নীহারবালা তখন অপার্থিব মহিমায় লোকচক্ষে অলোকসামান্যা। এমন কি, আমার নিজেরই ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর অপর পা-টা হাতাবার।
কিন্তু বুকের পাটা ছিল না তেমন, কানাঘুষায় জানা ছিল যে, নীহার দেবীর শুধু পা-ই না, আপাদমস্তক সবটাই প্রবোধবাবুর কপিরাইট যেখানে, অনধিকার হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে কপিরাইট তছরূপের দায়ে পড়তে হয় পাছে, তাই সামনে অমন সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্তের অনুপ্রেরণা সত্ত্বেও প্রলোভন সংবরণ করেছিলাম।
