শিশির নাটমঞ্চে যেমন পুরনো ভাবনারই নবরূপদানে প্ৰচেষ্টিত ছিলেন, সেটাকেই ভেবেছিলেন নাটকীয় রূপান্তর, তেমনি তাঁর কালের নাট্যসাহিত্যেরও কোনো যুগান্তর সাধন করতে পারেননি। সেরূপ উদ্ভাবনায় তাঁর দিক থেকে কোনো প্রেরণাই ছিল না। সেকালের সপ্রতিভ লেখকরা প্রবুদ্ধ হলে তাদের গল্প কবিতার রচনার ন্যায় নতুন নাটক সৃষ্টিতেও আত্মনিয়োগ করতে পারতেন, কিন্তু সে বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে কোনো উৎসাহ পাননি মনে হয়। বুদ্ধদেব রাবণকে নিয়ে একটি আধুনিক নাটক লিখেছিলেন, সেটি শিশিরকুমার ঘোষণা করেও কানাঘুষার পরেও, মঞ্চস্থ করতে আদৌ উদ্যোগী হননি।
এমনকি, যে ষোড়শী নিয়ে তখন এত হৈচৈ, প্রথমে তার মধ্যেও তিনি কোনো নাট্য সম্ভাবনা দেখতে পাননি। ঘোড় নিশ্চয়ই নাটক হিসেবে কিছু যুগান্তরসাধক নয়, নাটকই নয়, উপন্যাসের নাট্যরূপ মাত্র, আগের কালে বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসগুলিও নাট্যরূপায়িত করা হয়েছিল, কিন্তু একালের অন্তর্গত এত নাটকীয়তা এবং বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও, রঙ্গমঞ্চের কোনো দিকপালের নজৰু শরৎচন্দ্রের দিকে পড়েনি কেন, তাই বিস্ময়। পরে অবিশ্যি শরৎচন্দ্রের বহু উপন্যাসেরই ট্যরূপ ফিমি রূপ ইত্যাদি পেয়েছে, কিন্তু তাঁর দেনা-পাওনা বইয়ের নাট্যরূপটাই সর্বপ্রথম-এ যুগের ভালো উপন্যাসগুলির নাট্যরূপান্তরণের সেইটাই। মুক্তধারা। সেই ধারা এখন আরো বিস্তার, আরো ব্যাপকতা, আরো সাফল্য লাভ করেছে সমরেশের অমৃতকুম্ভের সন্ধানে, আর শঙ্করের চৌরঙ্গীর (রাসবিহারী সরকার কৃত) সল নাট্যরূপায়ণে।
কিন্তু শিশিরকুমারের কালে নতুন নাটক কই? নাট্যরূপান্তর কিছু নাটক নয় নাট্যসাহিত্যের উদ্বোধক না। সেই ব্যর্থতার জন্য প্রত্যক্ষভাবে তৎকালের নিরুৎসাহিত লেখকরা দায়ী হলেও শিশিরকুমারের পরোক্ষ দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। মঞ্চরাপ লাভের সম্ভনা না থাকলে নাট্য সাহিত্য দাঁড়াতে পারে নামহীরুহ হওয়া দূরে থাক, তা অঙ্কুরিতই হতে চায় না।
শিশিরকুমার নাটকের জগতে কোনো নবযুগ না আনলেও অভিনয় বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কি এমন কিছু যুগান্তর সাধন করেছিলেন? একালের নাটক অভিনয়রীতি ও প্রযোজনার প্রেক্ষিতে তাঁর বিচার করতে চাইনে, সেভাবে তাঁর তুলনা করাটা হয়ত সঠিক হবে না, কেননা সেদিক দিয়ে দেখলে তাঁকে বেজায় খাটো দেখাবে-তাছাড়া যেহেতু একাল সময়ের বিচারে সব দিক দিয়েই তার কাল থেকে এগিয়ে-স্বভাবতই অগ্রসর হতে বাধ্য, তা না হলে একালের সার্থকতাটা কোন্খানে? কিন্তু সেই মানদন্ডের প্রমাণ পাল্লা দিয়েই কি বলা যায় না যে, শিশিরবাবুরও তেমনটাই ছিল না কি, গিরিশের কাল থেকে স্বভাবতই আর ন্যায্যতই আরো অনেক এগিয়ে আসা? সেটা তিনি পারেননি।
তাহলেও তিনি স্বকীয় ভঙ্গীর নাট-নৈপুণ্যে অনন্য, অভিনয় শক্তিতে অদ্বিতীয়, প্রয়োগ ক্ষমতায় চমকপ্রদ, ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে অসাধারণ–একথা অনস্বীকার্য। বাচ্চাতুর্যে চারপাশের শ্রোতাদের আর অভিব্যক্তির বৈশিষ্ট্যে প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। বাল্পটুতা ছিল প্রায় রবীন্দ্রনাথের মতই, যা বলতেন তাই যেন সাহিত্য হয়ে যেত।
কিন্তু এত বিদ্যা, এত বুদ্ধি নিয়েও তিনি আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারেননি, মিটিয়ে যেতে পারেননি তাঁর নিজের আকাঙকাও। শেষটায় তিনি চেয়েছিলেন বিরাট এক জাতীয় রঙ্গশালা–সে কি যুগোপযোগী নব নাটকীয় পালার পার্বণের জন্যেই? না কি তাঁর শ্রীরঙ্গমক্ষেত্রে যে রঙ্গটা ঘটেছিল, সেই কলকাতার নাগরিকদের মতই তাঁর পাশ-এ চারপাশের সারা ভারতের সবাইকে ঘুরপাক খাওয়াবার মতলবেই? কে জানে।
নাট্যজগতে যুগান্তর করা দূরে থাক, আশ্চর্য, রবীন্দ্রনাথকে বাংলার রঙ্গমঞ্চে আনার প্রথম কৃতিত্বও তাঁর নয়। সে কীর্তি স্টারের অধ্যক্ষ প্রবোধচন্দ্র গুহের। এই এক ভদ্রলোক (অবিস্মরণীয় বলেই এখন বোধকরি বিস্মৃত) ঢক্কানিনাদের নেপথ্যে থেকে সেকালের রঙ্গমঞ্চে সম্ভাবিত এবং সম্ভবপর তাবৎ পরিবর্তন সাধন করে গেছেন।
গোড়ায় তিনি বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের ঐতিহ্য অনুসরণে কর্ণাজুন আর ইরানের রানী নিয়ে পত্তন করলেও (সেগুলিও কিছু কম চমকপ্রদ উপস্থাপনা ছিল না বলতে হয়), রবীন্দ্রনাথের চিরকুমারসভাকে সবার সামনে অপরূপ রূপে উপস্থিত করেছিলেন তিনিই। এবং সেইখানেই না থেমে, তার পরেও তাঁর শোধবোধ ইত্যাদি ধরে আরো বই করেও শেষ পর্যন্ত তার গৃহপ্রবেশ অবধি এগিয়ে গেছেন, এটা কম কথা নয়। পরমাশ্চর্য প্রযোজনা হয়েছিল তাঁর গৃহপ্রবেশ।
তারপরে শিশিরকুমারও রবীন্দ্রনাথকে নিজের মঞ্চে নিয়ে এসেছেন–ঐ চিরকুমারসভা দিয়েই।
স্টারের পরে হলেও তা ঠিক সেই রকমটি হয়নি নিশ্চয়ই। শিশিরবাবুর চিরকুমারসভা তাঁর স্বকীয় প্রযোজনারীতির সমূহ বৈশিষ্ট্য নিয়েই সার্থক সৃষ্টি হয়েছিল। প্ৰবোধবাবুর পদাঙ্ক অনুসরণে হলেও তার পদক্ষেপ অবশ্যই স্বতন্ত্র আর সার্থক। এবং তাই হবার কথাই।
তবুও শিশিরকুমার আর স্টার দুজায়গায় অভিনয় দেখে আমি সে যুগের দুই দিল অভিনেতার তুলনা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। শিশির আর অহীন্দ্রর। শিশিরকুমারের চন্দ্র যেকালে তার ব্যক্তিগত অভিনয়ের ঔজ্জ্বল্যে ষোলকলায় বিকশিত, প্রায় চাঁদপানাই, অহীন চৌধুরীর চন্দ্র সেখানে চরিত্রগত অভিনয়ে, অভিনেয় চরিত্রের মধ্যে আপন ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ নিমজ্জনে নিখুঁত। শিশিরকুমারের যে-কোনো অভিনয়েই তাঁকে কখনো ভোলা যায়, ভুলবার উপায় নেই, তারই চিত্তচমৎকারী কারুকান্ড দেখছি মনে হয় সর্বদাই–কিন্তু অহীন্দ্রের অভিনয়ে, অহীনবাবুকে মনেই পড়ে না একদম–কিন্তু অহীন্দ্রের। এখন, কারটা বেশী বাহাদুরী তা আমি বলতে পারব না, তবে দুজনের অভিনয়ধারার এইখানেই পার্থক্য। আমার নিজের ধারনায় অহীন্দ্রকেই মহত্তর মনে হয়েছে। ( এ বিষয়ে আমার সঙ্গে অপরে একমত না হতেও পারেন এবং তা হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যাঁরা শিশিরবাবুর ব্যক্তিগত বন্ধু, ব্যক্তিত্বে বিমোহিত, তাঁর অভিনয়ের অভিব্যক্তিত্ব স্বভাবতই তাঁদের অভিভূত করবে, বলাই বাহুল্য )।
