শেষ নাটকও দেখা আমার শিশিরকুমারের শ্রীরঙ্গমেই। কী নাটক মনে নেই, দেখতে গেছি, পাশ হলেও সাধারণত টিকিটে নম্বর লাগিয়ে বুকিং থেকে সেটা কেটে নিতে হয়–সেদিন কিন্তু তা হয়নি। অভিনয় আরম্ভ হবার দেরি ছিল না। শিশিরবাবুর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই, তিনি ভাইদের কাকে (ঋষীবাবুকে বোধহয়, নাকি মুরারিবাবুকেই, কে জানে) বললেন, ওঁর আবার টিকিট কিসের? ওঁকে নিয়ে গিয়ে প্রথম শ্রেণীর একটা সীটে বসিয়ে দাও গে।
অডিটোরিয়ামে ঢুকে প্রথম সারির ধার ঘেঁষে একটা আসনে বসলাম গিয়ে।
খানিকবাদে এক দর্শক এলেন, তাঁর কাছে ঐ নম্বরের টিকিট। তাঁকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে পাশের সীটটায় বসলাম তখন। আরেকজনা এলেন তারপর, ওই সীটের নম্বর। তাঁকেও জায়গা ছাড়তে হোলো। সেখানেও এল আবার আরেক। তাঁকেও ছাড়লাম। তারপরও আরেকজন আবার, মার্কামারা টিকিট নিয়ে, তাঁকেও ছেড়ে দিলাম।
এইভাবে অভাবনীয় আবির্ভাবে একটার পর একটা ছাড়তে ছাড়তে লোম দ্বিতীয় সারির প্রথম নম্বরে। সেটাও পার হতে হল ঐভাবে। অমনি করে তৃতীয় সারিও পেরিয়ে গেলাম তারপরে। সরতে সরতে একেবারে শেষ সারির শেষতম আসনে গিয়ে পৌঁছলাম।
কিন্তু সেখানেও নিস্তার নেই। সারগর্ভ প্রেক্ষাগৃহের সারাৎসার সীটেরও একজন অভ্যাগত এলেন।
বাধ্য হয়ে উঠতে হোলো এবারও।
পাশে পাশে চল ভাই!–আমার পার্ষদ সবার পাশ কাটিয়ে শেষটায় শূন্যতার সীমানায় গিয়ে পৌঁছলাম।
কিন্তু মরীয়া হয়ে একটা প্রশ্ন না করে থাকতে পারলাম না এবার। শুধালাম তাঁকে-কিছু যদি মনে না করেন, আপনার টিকিটটা একটু দেখতে পারি কি?
টিকিট কোথায়? পাশ তো!
পাশ! আমি যেন আকাশ থেকে পড়ি।
পাশ তো মশাই সবারই। শিশির ভাদুড়ির থিয়েটার পয়সা দিয়ে দেখে কেউ? তাঁর বসুধৈব কুটুম্বক-দেশে দেশে চ বান্ধবা (তাঁর বকবকম শুনতে হয় আমায়) হোল অডিটোরিয়ামে টিকিট কাটেনি একজনাও। এই যে ফুল হাউস দেখছেন, এর ভেতর ফুল নেই একজনও। সবাই ওয়াইজ। শিশির ভাদুড়ির মায়াপাশেই এই ফুলহাউস, নইলে পাশ বিহনে এ থিয়েটার ফাঁকা হয়ে যেত মশাই–বুঝচেন?
বুঝলাম বইকি। আমি বলি–একজন অবশ্যি ফুল আছেন এর ভেতর। বদান্য বোকা তিনি। ঐ ভাদুড়ি মশাই-ই।
বলে আমি বেরিয়ে আসি। তারপরে আর কোনোদিনই ওমুখো হইনি।
কবিগুরুর গানের কলি মনে পড়ে–সে যে পাশে এসে বসেছিল তবু জাগিনি! সে কি তার এই জাতীয় অভিজ্ঞতার থেকেই বা নিছক কল্পনাকুশলতা?
আমি তো জাগলাম তারপরই, ওধার ঘেঁষলাম না আর, কিন্তু অত জন-বাংলা মুলুকের শত সহস্র জন তাঁর পাশে এসে বসার পরও শিশিরকুমার যথাসময়ে সজাগ হতে পারেননি। কী ঘুম তাঁর পেয়েছিল তিনিই জানেন।
তারপর জেনেছি, শিশিরবাবুর রঙ্গমঞ্চও ঐ পথেই পাশ কাটিয়ে পাশ আউট হয়ে গেছে একদিন–নিজের অবলীলায়।
তাঁর থিয়েটারি পাশা খেলায়।
৭. ফুলহাউস
৭১.
শিশিরকুমারের সেদিনকার সেই ফুলহাউস থেকে বেরিয়ে তার পরে আর ওনার হাউস ফুল বা ফুল্লতর করার দায় নিয়ে যাইনি কখনো ওপথে।
রঙ্গমঞ্চের দিকে টানও কমে গেছল অনেকটাই–প্রেক্ষাগৃহগুলির প্রতি উপেক্ষায় নয়, সম্পাদকীটা বেহাত হয়ে অযাচিত আমন্ত্রণ আসত না, আর, সেখানে গিয়ে পাশ চাইবার উৎসাহও লোপ পেয়েছিল। এবং আত্মশক্তি গিয়ে টাকা দিয়ে টিকিট কিনে থিয়েটার দেখার মতন আত্মসামর্থ্যও ছিল না আমার।
তাছাড়া, সেইকালে সিনেমার আকর্ষণ ছিলো আরো জোরালো। তখনই তো চার্লি চ্যাপলিন, জ্যাকি কুগান, ডালাস ফেয়ার ব্যান্স, মেরি পিকফোর্ড, গ্রেটা গার্বে, রুডলফ ভ্যালেনটিনো, লরেল হার্ডি প্রভৃতিকে নিয়ে ছায়াছবির আসর জমজমাট।
এদিকে কানন দেবী, দুর্গাদাস, ডি-জির পালাপার্বণ। আর, সিনেমার আকর্ষণ আমার চিরকালের। চার আনার টিকিটে সেই টানেই ভেসে গেলাম।
তাই বলে সেকালের থিয়েটারের নাটক আর নটনায়কদের আমি খাটো করতে চাইনে। শিশিরকুমার অবশ্যই অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই; সেকালের প্রেক্ষিতে বিচার করলে অনেক দিক থেকেই তাঁকে অনন্য মনে হবে। প্রেক্ষামঞ্চেরও তিনি বহুৎ পরিবর্তন এনেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন শিল্পকলায়, সঙ্গীতকলায়, চিত্রকলায়, সাহিত্যে ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্যদের তাঁর বন্ধু এবং সহায়করূপে পেয়েও সবরকমের আনুকূল্য সত্বেও তাঁর কাছে তাঁর যুগের যে দাবী ছিল তা তিনি মেটাতে পারেননি। হতে পারে সে সম্পর্কে হয়ত তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না, কিংবা সেকালে তিনি যা দিয়েছিলেন, দিতে পেরেছেন, তার বেশি দেওয়া তখন সম্ভবও ছিল না বোধ হয়।
গিরিশচন্দ্র আমাদের নাট্যজগতে যে রচনা আরম্ভ করে গিয়েছিলেন সেই ধারাটাই বজায় রেখে তারই অনুসরণ করে কিছু বাড়িয়ে-টাড়িয়ে সেই বাক্যই কমা-সেমিকোলন, কোলন এবং কোথাও কিঞ্চিৎ জ্ঞাশের পর তিনি দাড়ি টেনে সমাপ্ত করে গেলেন। সেইখানেই তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন, এগোতে পারেননি আর।
গৈরিশী যুগের উফল পরিসমাপ্তি বলেই তাকে আমার মনে হয়। নাট্যমঞ্চের ও অভিনয়ের নিজস্ব কিছু কিছু ধারণা নিয়েও এবং তাঁর যথাসম্ভব মঞ্চরূপ দিয়েও, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও আসলে তিনি গৈরিশী ধারারই সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
গৈরিশী প্রয়োগকল্পনা বা অভিনয়রীতির কিছু অবশ্যি আমি দেখিনি, দেখার সুযোগও পাইনি তা সত্যি, কিন্তু তাঁর আদর্শ বংশধর–বাবার আদর্শ আর বংশ দুইই যাঁর ধর্তব্য ছিল–সেই দানীবাবুর অভিনয়ে তার প্রতিচ্ছবি কিছু দেখেছি তো, তার থেকে শিশিরবাবুর বৈশিষ্ট্য ততখানি পৃথক নয়। দুই ধারাই তো ব্যক্তিমুখ্য আর অভিব্যক্তি-সর্বস্ব। অন্তত আমার সেই রকম মনে হয়েছে।
