আর মাসকাবারে ককরে সেই একশো টাকা নিয়মিত। যে কমাস আমার বরাতে ছিল সে সময়টা স্বচ্ছন্দ নির্ভাবনায় কেটেছে। আদাজল খেয়ে লাগতে হয়নি, রাবড়ি বা মটন চপের সঙ্গে লাগসই হয়ে আরামে কাজ চালিয়ে গেছি।
তবে বেশিদিন এই স্বাচ্ছন্দ্যের সুখ আমার কপালে সয়নি। আমার ভেতরে বোধকরি এক ঘূণী আছ, সেই যে, ধূনী হাওয়ায় ঘুরিয়ে দিলো সূর্য তারাকে, সেই ঘূর্ণীই সূর্যতারার সঙ্গে কপাল সমেত আমাকেও ঘুরিয়েছে বারংবার।
আত্মশক্তি আমি নিজেই ছাড়লাম একথা বলা যায় না, কোন কিছু আপনার থেকে ছাড়ার ক্ষমতা বা অহঙ্কার আমার নেই, মায়াবদ্ধ জীব, সহজেই সব কিছু আর সবার প্রতি আসক্ত হই, ছেড়ে যাবার শক্তি রাখি না। ছাড়লাম না বলে ছাড়িত হলাম বলাটাই ঠিক।
আর, সেটা হয়েই থাকে–পৃথিবীর সবক্ষেত্রে জীবনের পথ চলায় স্বভাবতই তা হয়ে যায়, তা নিয়ে কোনো অভিযোগ চলে না। আমারও কোনো অভিযোগ নেই। জাগতিক নিয়মে এরকমটা হবেই সর্বদাই, না হয়ে যায় না।
আমার পরে আত্মশক্তি কর্ণধার হয়েছিলেন বিজলী-সম্পাদক স্বনামধন্য নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত, তাঁর পরে সরোজকুমার রায়চৌধুরী, গোপাললাল সান্যাল। গোপালবাবু আর সরোজ সুভাষচন্দ্রের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। আমার সম্পাদিত আত্মশক্তিতে, যতদূর মনে করি, সবরাজের প্রথমকার লেখা সব বেরিয়েছে।
তারপরে ফরোয়ার্ড পাবলিশিং-এর হাতে গিয়ে আত্মশক্তি নবশক্তি-র নবকলেবর লাভ করে। তখন তার সম্পাদক হন একদা বিপ্লবী তারানাথ রায়। তাঁর সময়ে নবশক্তির আকর্ষণ আর মহিমা অনেক বেড়ে যায়। এর পৃষ্ঠাতেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম একাঙ্ক নাটক বুদ্ধদেব বসুর একটি মেয়ের জন্য প্রকাশ পায়। তারপরের হপ্তায় অচিন্ত্যর নতুন তারা আর বোধকরি তার দু-এক সপ্তাহ বাদেই একাঙ্কিকায় আমার সম্পূর্ণ নাটক যখন তারা কথা বলবে।
প্রথম একাঙ্কিকা লেখার গৌরব বুদ্ধদেব কি মন্মথ রায়ের, পজিপুথি তারিখ মিলিয়ে আমি সঠিক বলতে পারব না। মন্মথ রায়ও এইকালেই একাঙ্কিকা লিখতেন, কল্লোলে এবং অন্যত্র। এই ক্লাসের কে ফাস্ট বয় তা গবেষকরা বিচার করে বলবেন।
প্রেমেন্দ্র মিত্র সমসাময়িক জাগরণী পত্রিকায় আমার ঐ একাঙ্কিকার আলোচনা করেছিলেন। সেটা আমার নাটিকার প্রশস্তি হলেও কাজটাকে আমি প্রশস্ত বলতে পারি না। প্রেমেন সেকালে আমার প্রতি একটু পক্ষপাতদুষ্ট ছিল মনে হয়। তার প্রথম বই পুতুল ও প্রতিমা উৎসর্গ করেছিল আমায়। তার আর সব বন্ধুর তুলনায় আমার অনেক অযোগ্যতা থাকলেও, অভিযোগ করার কিছু নেই, কেননা স্নেহ ভালোবাসা সর্বকালে সর্বত্রই নিতান্ত অযোগ্যর প্রতিই বর্ষিত হয়ে থাকে।
তারানাথ রায়ের পরে নবশক্তির সম্পাদক হন অকালে লোকাতরিত শক্তিধর লেখক অদ্বৈতমল্ল বর্মণ–তাঁর বিখ্যাত বই তিতাস একটা নদীর নাম তাঁর সম্পাদিত কাগজেই ধারাবাহিক বেরয়। তাঁর প্রতিভা প্রায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগোত্রীয়ই বলা যায়। যদিও তা পূর্ণ বিকাশলাভের সুযোগ পায়নি। এই সম্পর্কে এটাও হয়ত উল্লেখ করা চলে, জানিনে ঠিক, তৎকালে ক্যাপটেন নরেন দত্তর তত্ত্বাবধানাধীন নবশক্তির সম্পাদনায় তাঁদের প্রচারসচিব প্রেমেন মিত্রেরও সম্ভবত কিছু সহায়তা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু প্রেমেন বেশীদিন ছিলেন না, কাজে ঢুকেই তিনি পরিস্থিতি টের পেয়েছিলেন এবং বলেও ছিলেন আমাকে যে, ঠিক বুঝতে পারছি না ভাই। দায়িত্ব থাকলেও এখানে কাজের স্থায়িত্বর কোনো সম্ভাবনা দেখছিনে। আমি তাকে বলেছিলাম, বেঙ্গল ইমিউনিটি না? সারা বাংলার সবাই এ সংস্থায় ক্ষণকালের সঙ্গ দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান করবে–বেংগলের দিকে হচ্ছ তোমরা, আর ইমিউনিটির দিকে একজন মাত্রই–ঐ ক্যাপটেন দত্ত।
যাই হোক, অল্পদিনের হলেও, আত্মশক্তির সম্পাদনা সূত্রে সামান্য আমিও কলকাতার মান্যগণ্যদের মধ্যে যৎকিঞ্চিৎ পরিচিত হবার সুযোগ পেয়ে ধন্য হয়েছি। দেশের কৃতি পুরুষরাই কেবল নয়, কলকাতায় সাংস্কৃতিক দিকটারও পরিচয় পেয়েছিলাম সেই সময়। আত্মশক্তির দৌলতে শহরের রঙ্গমঞ্চগুলির আমন্ত্রনপত্র পাওয়া যেত–প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় রজনীতেই। তা ছাড়াও যখন-তখন চাওয়া মাত্র যটা ইচ্ছা পাশ মিলত যে-কোনো রঙ্গমঞ্চে।
প্রথম আমন্ত্রণী পাই শিশিরকুমারের। তাঁর অ্যালফ্রেড রঙ্গমঞ্চে-একালে যেখানে গ্রেস সিনেমা-বসলীলার উদ্বোধন-রজনীতে। সেখানেই সুনীতি চাটুজ্যে থেকে ভারতী গোষ্ঠীর মণিলাল গাঙ্গুলি, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী,হমেন্দ্রকুমার রায় সবারই দেখা পাই। কারো কারো সঙ্গে এক আধটু আলাপও হয়েছিল আমার। নজরুল, নৃপেন চাটুজ্যেকেও সেখানে দেখি। কল্লোলের আরো কাউকে কাউকেও।
তারপর স্টার, মিনার্ভা, মনোমোহন (যাকে ভেঙেচুরে দিয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউর রাস্তা বেরিয়ে গেছে) থিয়েটার–সব কটারই। স্টারের কর্ণার্জুন, ইরাণের রাণী থেকে রবীন্দ্রনাথের শোধবোধ, চিরকুমার সভা, গৃহপ্রবেশ, মিনার্ভায় মিসরকুমারী, কিন্নরী, আলিবাবা, ভূপেন বাঁড়ুজ্যের যত প্রহসন, ক্ষীরোদপ্রসাদের নাটকাদিও, মনোমোহনে কী কী দেখেছি এখন মনে পড়ে না, শিশিরবাবুর নানা নামান্তরে নানান রঙ্গমঞ্চের সংখ্যাহীন প্রযোজনা–সেই সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির হলে বসে রবীন্দ্রনাথের নাট্যবিচিত্রা।
