ভাগ্যের এমন যোগাযোগ আর হয় না!
জেলখানায় সেই সাতসকালে রুটি মাখন ডিমের প্রাতরাশের পর এতক্ষণের হা পিত্যেশে এমন খিদে পেয়েছিল যে, কহতব্য নয়।
সেদিন আনন্দধামের খিচুড়ি খেয়ে অদ্ভুত আনন্দ পেয়েছিলাম!
খিচুড়িটাও ছিল অদ্ভুত! এমন খিচুড়ি আমি আর কোথাও খাইনি, তার আগেও না, পরেও নয়। চালডালের গলাগলি গায়ে-গায়ে জড়াজড়ি যা সচরাচর খেয়েছি তার থেকে এ স্বতন্ত্র, একেবারে পৃথক। খিচুড়ির প্রত্যেক অণুপরমাণু পৃথক পৃথক। ফ্রায়েড রাইসের মতই অনেকটা, একরকমের বেশ ঝরঝরে খিচুড়ি! আর গাওয়া ঘি দিয়ে খেতে যা উপাদেয় তা বলবার না।
পরিপাটি খেয়ে চাবিকাঠি নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে কম্বলের ওপরে বেডকভার বিছিয়ে সটান হওয়া গেল লম্বা হয়ে।
একটানা একখানা ঘুমের পর বিকেলে উঠতেই দেখি, কেতাদুরস্ত এক চাপরাসী অপেক্ষা করছে আমার জন্য–সুভাষচন্দ্রের চিঠি নিয়ে। সুভাষবাবু তখন কলকাতা কর্পোরেশনের চীফ এজিকিউটিভ অফিসার।
সি-ই-ওর শীলমোহর লাঞ্ছিত সেই খামখানা খুলে জানলাম, সুভাষচন্দ্র আজ সন্ধ্যের পর তাঁর বাড়িতে দেখা করতে বলেছেন আমাকে।
গেলাম তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে যথাসময়ে।
তাঁর কাছ থেকে জানলাম যে, উপেনদা (উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) সম্প্রতি অন্তরীণ, তাঁর কাগজ সাপ্তাহিক আত্মশক্তির ভার দিয়ে গেছেন তাঁর ওপর। আর দেশবন্ধুর ইচ্ছা, আমাকেই যেন সম্পাদক করা হয়। তার ধারণা, উপেন্দ্রনাথের পত্রিকার মর্যাদা আমার হাতে ক্ষুণ্ণ হবে না, সম্পাদকরূপে আমি মোটেই অনুপযুক্ত হব না নাকি।
এই দেখুন না দেশবন্ধুর চিঠি। সুভাষচন্দ্র দেশবন্ধুর পত্রটা আমার হাতে দিলেন, পেনসিলে লেখা কয়েক ছত্রের নোট–তার একটি কথা ভুলতে পারিনি এখন। শিবরাম, এ গুড রাইটার অব বেংগলি পোজ বলে পরিচয় দিয়েছেন তিনি আমার।
তারপরে টেলিফোনেও কথা হয়েছে তাঁর সঙ্গে আমার… সুভাষ বললেন তার ওপরে : তাহলে লেগে যান আপনি কাল থেকেই? কেমন?
লেগে গেলাম। তারপরই।
.
৭০.
জেল থেকে বেরিয়ে আত্মশক্তির সাহায্যে যাতে আমি স্বপ্ৰতিষ্ঠ হতে পারি, তার এই ব্যবস্থা করে রাখা দেশবন্ধুর এই অহেতুক মেহকলার আমি কোনো তুলনা পাই না। যাঁকে সর্বক্ষণ সারা দেশের ভাবনায় সমস্যায় জর্জর হতে হচ্ছে, তাঁর অভিভাবনার এককোণে আমার ন্যায় নগণ্যদের জন্যও যে একটুখানি ঠাঁই রয়ে গেছে ভেবে অবাক হতে হয়।
যে উত্তম রহস্য সন্তানজন্মের আগেই তার জন্য মাতৃস্তন্যের বন্দোবস্ত করে রাখে তাঁর মধ্যে সেই ভগবৎ সত্তার সাক্ষাৎ পাই যেন। যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা–তাঁরই পরিচয় মিলে যায় যেন।
হেদোর পৈঠায় বসে যে ছেলেটি একদা বলেছিল আমায় যে দেশবন্ধু গঙ্গাই, মনে হয় তাই বটে। যে গঙ্গাকে রসালযাত্রায় একদা পাতালবাহিনী ভোগবতীরূপে দেখা গেছে, সেই তিনিই আরেকদিন সর্বত্যাগব্ৰতী হয়ে রসাতলের সেই ভোগবতী-কন্যাদের দেশসেবার দাতে দীক্ষা দিয়েছেন, তারা দলে দলে এসেছে রাজপথ ধরে স্বরাজ ভান্ডারে প্রাণের চেয়ে প্রিয় অলঙ্কার দানের অভিযানে, কে না জানে? পতিতাদের একদা আকর্ষণ করেছিলেন বুদ্ধদেব, যিশুখৃষ্ট, তারপরে পরমহংসদেব আর এই সেদিন আমাদের দেশবন্ধু। পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গা–এঁরা সবাই।
গঙ্গাই বটে। যে গঙ্গা মনের মণিপদ্মাসনে আত্মস্থতার গভীরতায়, গাম্ভীর্যে, বিস্তারে, বিরাটের অব্যয় অভিব্যক্তি, সেই তিনিই পদ্মার মতই আবার অথৈ, উত্তাল, অকূলের কূলভাঙ্গা বিপুল ভাঙাগড়ার খেলা–তিনিই ফের মহাভারতের হৃদয়প্লাবী ভাগীরথীর মৃতসঞ্জীবনী। প্রাণপ্রবাহের অজস্রতা। কাব্যলোকের সুরধুনীরূপে সাগরসঙ্গমের মোহানায় গিয়ে যিনি আত্মহারা, তিনিই আবার গঙ্গোত্রীর পথে অলখঝোরা পেরিয়ে ভুবনেশ্বর নগাধিরাজের জটাজুটে অলকনন্দা। মহেশ্বর শিরশ্চ্যুত জাহ্নবীর এই রূপের পঞ্চপ্রদীপে সেই মহাদেবের মহারতি!
ভাবলাম একবার, তাঁর কাছে গিয়ে আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসি। যাইনি, জানি তো তিনি তার অপেক্ষা রাখেননি। তাছাড়া কৃতজ্ঞতার ভাষাও আমার জানা নেই। কাউকে কোনো দিনই তা জানাতে পারিনি। তুচ্ছ মুখের কথায় প্রাণের ঋণ পরিশোধ করা যায় তা আমি মনে করিনে, চিরকালই তা অপরিশোধ্য থেকে যায়। তাছাড়া প্রায় ভালোবাসার মতই ঐ কৃতজ্ঞতাও বাইরের স্তরে নয়, অন্তরের অনুভবে।
এক মনের অনুভূতি অগোচরে সহজেই অপর মনে গিয়ে পৌঁছয়–এক কূলের ঢেউ আপনার থেকেই অন্য কূলে গিয়ে লাগে। নিজগুণেই তিনি টের পেয়েছেন, সন্দেহ নেই।
আত্মশক্তির সাধনায় লাগা গেল তারপর। এমন কিছু অসাধ্যসাধন শক্ত কাজ ছিল না। ডবলক্রাউন চার পেজী সাইজের আট পাতার কাগজ–কিংবা ষোলো পাতারই হবে হয়ত, মনে পড়ে না। যুগান্তরের মতন তার আগাপাশতলার সবটাই লিখতে হত না আমায়, আত্মশক্তির লেখকগোষ্ঠী ছিল, উপেনদাই গড়ে দিয়ে গেছলেন। তাঁদের লেখা পাওয়া যেত নিয়মিত। সেসব লেখা দেখেশুনে দেওয়ার কিছু ছিল না–প্রতিষ্ঠিত লেখক তাঁরা। নবীন লেখকদের লেখাও, লেখার মত হলে ছাপাবার আমার কোনো অন্যথা হত না। আগে ছাপতাম।
পরিচালনার কোনো দায় আমার ছিল না। চন্দননগর গোঁদলপাড়ার প্রাক্তন বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কর্মাধ্যক্ষ, সেসব দিক তিনিই সামলাতেন। যুগান্তরের যেমন আগাগোড়া সব লেখার থেকে শুরু করে সম্পাদনা, প্রুফ দেখা এবং প্রেসে চাপানোর আগে তার মেক-আপ-এ সহযোগিতা করা পর্যন্ত সব কিছুর সামাল দিতে হয়েছে আমায়, এমনকি তার পরেও ডাকের কাগজের মোড়কে গ্রাহকদের নাম ঠিকানা লেখাও বাদ ছিল না, ডাকঘরে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসা তো ছিলই–সেসব ঝামেলা পোহাতে হয়নি এখানে।
