জেলে গেলেই রাজবন্দীরা লপসীর প্যাঁচে পড়ে ভালো খাওয়ার দাবিতে প্রায়োপবেশন করে এই জানি, না খেয়ে শুকিয়ে টি-বি বানিয়ে ম্লানমুখে ফেরে এইটেই জানা, আমার বরাতে সর্বক্ষেত্রে সব ব্যাপারেই উল্টো উৎপত্তি! বেড়ে ভোজনে ওজনে বেড়ে রীতিমতন হৃষ্টপুষ্ট হয়ে বেরুনো!
ছাড়া পাবার দিন জেলখানার আপিসঘরে ডাক পড়লো। সেখানে যেতেই ছাড়পত্রের সঙ্গে দুখানা রেলোয়ে পাশ দেওয়া হল শেয়ালদা পর্যন্ত-ফাসকেলাস পাশ, ফাসকেলাস কয়েদী যখন! কারাবরণের কেরামতিতে সেই প্রথম ফাসকেলাসে চাপার সুযোগ ঘটল আমার।
তোমাদের নিজস্ব জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারো, অ্যালাউ করা আছে এই পাশে। বললেন জেলের করণিকটি।
নিজস্ব বলতে, পরনের কাপড়-জামা ছাড়া, জেলের থেকে পাওয়া কম্বল দুটো সম্বল করে নিয়ে বেরুলাম।
গিরিজা নিল না, বলল, গয়ার পাপ গয়াতেই থাক।
শেয়ালদায় নেমে ট্যাকসি ধরে গিরিজা কোথায় গেল জানি না। আমি ট্যাকসি চাপব কোন ভরসায়? তার ভাড়া গোনার কে আছে আমার কলকাতায়? কম্বল ঘাড়ে সোজা হন দিলাম ঠনঠনের দিকে।
বাসায় এসে দেখি, আমার ঘর তালাবন্ধ। শুনলাম, পুলিসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবার পরেই বাড়ির মালিক আনন্দবাবু এসে নিজের তালাচাবি মেরে দিয়ে গেছেন।
গেলাম আনন্দবাবুর কাছে।
আমাকে দেকে তিনি আনন্দিত। চা জলখাবার খাইয়ে খালেন আমাকে–এ কম্বল আপনি পেলেন কোথায়?
জেলখানায়। দিয়েছিল আমাকে।
শুনেই তিনি আঁতকে উঠেছেন–অ্যাঁ, করেছেন কী? জেলখানার জিনিস হাতিয়ে এনেছেন? গেটে আটকায়নি আপনাকে? না? আশ্চর্য! আরে মশাই, দেখছেন না জেলখানার ছাপ মারা আছে কম্বলে। এই মার্কা পুলিসের নজরে পড়লে আর রক্ষে থাকবে না। তারপরে এবার যে জেল হবে আপনার তা ওই লুচি আর পোলাওয়ের নয়, দস্তুর মতন ঘানিটানার। বুঝলেন?
তাই নাকি? তা আমি কি জানি! আমায় বলল, তোমার যা আছে সব নিয়ে যাও। নিজের বলতে ত্রিভুবনে এই কম্বল দুটোই দেখলাম। কী করব? কই, তারা কিছু বলল না তো? বাধা দিল না তো গেটে?
খেয়াল করেনি হয়ত। ফাসক্লাস পলিটিক্যাল প্রিজনার বলে ছেড়ে দিয়েছে, আপত্তি না করে। কিংবা হয়ত ওগুলো বহরমপুর জেলের ছিল না বলেই। সেখানকার জেলখানা থেকে নেওয়া হয়নি বলেই জমা দেবার কোনো প্রশ্ন ছিল না। আলিপুর জেলের থেকে বহরমপুরে রপ্তানি করার সময় শীতকাল বলে তাঁরাই দিয়ে দিয়েছিলেন তো।
শুনে আনন্দবাবু বললেন, যাকগে, এগুলোকে এখন সরিয়ে ফেলুন সবার নজরের থেকে। পাচার করে দিন এক্ষুনি।
কোথায় পাচার করবো?
আপাতত চাদরের তলায়। পেতে ফেলুন বিছানায়। আমি একটা বেড কভার দিচ্ছি, তাই দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিন। দিনকতক পুলিসের নজর থাকবে এখন আপনার ওপর, নজর রাখবে তারা। থানার থেকে এস-আই এসে খোঁজ নিয়ে যাবে মাঝে মাঝে, তখন যদি এই কম্বল দেখতে পায় একবার…
আর বলতে হল না। বেড কভারটা নিয়ে বিছিয়ে দিলাম আমার কম্বলের বিছানায়।
বাসার চৌকির ওপর কম্বলমাত্র সম্বল আমার শয্যা বেডকভার বিছানো এখনো আমার বাসায়। সেই কম্বলের চৌকিদারি এখনও করছি। অবশ্যি, আনন্দের সেই উপহার এতদিনে নেই আর তা ঠিক, কিন্তু আমার বোন পুতুলের অবদান বালিশকে শিরোধার্য করে সেই কম্বলের একখানা এখনো রয়েছে।
জেলের আরেকখানা খুইয়ে এসেছি রেলে। আমার ভ্ৰাতৃভূমি ঘাটশিলায় যাবার কালে ১১১নং কামরার বেঞ্চিতে পেড়ে আরাম করে গেছলাম। ইস্টিশনে নামার তাড়ায় সেখানকার কথা খেয়াল ছিল না। জেল কোম্পানির কম্বল রেল কোম্পানিকে দিয়ে এসেছি।
আর শীর্ষস্থানীয় সেই বালিশটা? আমার বোন পুতুল ওরফে সরস্বতী (তখন বসু, এখন মিত্র) বন্ধুর কাজ করেছিল একবার। হঠাৎ আমার বাসায় এসে বিছানায় বালিশ নেই দেখে সে অবাক।–এ কী? তোমার মাথার বালিশ নেই কেন গো?
পাব কোথায়? তাছাড়া, বালিশের আমার দরকার লাগে না। বিছানায় পড়লেই ঘুম। ঘুমটাই আসল, বালিশটা নয়…।
সে কী হয় নাকি? বালিশ পাব কোথায়, তার মানে? বিছানা যেখানে পেয়েছিলে, খুঁজলে সেই দোকানে তার বালিশটাও পেতে। পেয়ে যেতে অমনি।
হ্যাঁ, দিচ্ছে অমনি! বিছানা তো জেলখানার, কাউকে বলিসনে যেন, তাহলে আবার জেলে নিয়ে পুরবে আমায়। তারা শুধু বিছানাই দেয়, এই কম্বল। বালিশ ফালিশ দেয় না ভাই।
ঘুমুতে কি করে তাহলে? ঘুমোও কি করে শুনি?
ঘুম তো আমার হাতে। আমার হাতের পাঁচ।
বললেই হোলো! দাঁড়াও, আমি নিয়ে আসছি তোমার বালিশ। কাছেই কমলালয় স্টোরস, ট্যাকসি নিয়ে যাই আর আসব।
ওর বলাবলিতে বৈষ্ণব পদাবলীর সেই রতিলালিশ ভুজবালিস সুখআলিশ-এর কথা মনে পড়ল আমার। রতিলালিশ না থাক, ভুজবালিস তো রয়েছেই! পরহস্তগত না হোক। (পরহস্তগতির ভরসা করিনে ), নিজের হাতেরটা যাবে কোথায়?
নিজের হাতে মাথা দিয়ে ছেঁড়া কাঁথায় আয়েশে ঘুমোনো যায়–ঘুমটাই হচ্ছে আসল। ঘুমের মতন শয্যা আর হয় না। খিদের মতন সুখাদ্য নেই।
এত বেলায় বাসায় তো এখন ভাত বাড়ন্ত। খেতে পাবেন না গিয়ে। এখানেই দুটি খেয়ে যান না! গিন্নী খিচুড়ি বেঁধেছেন আজ শুনছিলাম।
খিচুড়ি! শুনেই আমি লাফিয়ে উঠেছি। যে আমি খিচুড়ি-প্রীতির প্রেরণায় জেলখানার লসিকেও খিচুড়ি-ভ্রমে খেয়ে খুসি হয়েছি–সেই আমার আজ অনিবার্য হরিমটরের দিনে (অবশ্যি মল্লিকবাড়ির জগন্নাথপ্ৰসাদ পাওয়ার সময় ছিল তখন, যেতে বাধাও ছিল না। কোনো) এই মেঘ না চাইতেই জলের মত কম্বল চুরি করে আনার পরই এই খিচুড়ি!
