আমার মতে, অতীব নয়, সম্পূর্ণ হওয়াটাই সার্থক। সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য বড় হতে হয় না, কাউকে পেষার দরকার করে না; নিজের হওয়ার সাথে সাথে সে-ই হওয়ায়, তার আশপাশের আর সবাইকেও সে হওয়ায়।
সুন্দরই হচ্ছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সুন্দর সুষম হওয়াই সম্পূর্ণ হওয়া। ফুল যেমন তার ছোট্ট বৃন্তে, সামান্য বৃত্তেই রূপে রসে গন্ধে-Tনন্দের ছন্দে হয়ে ওঠার বৃত্তিতে পরিপূর্ণ।
আমাদের কালে সম্পূর্ণ মানুষ দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। নজরুলকেও আমরা দেখেছি। প্রেমেনকেও হয়ত বলা যায়। প্রেমেন দেখতে ভালো, আচারে আচরণে নিখুঁত, মনে আর মগজে সমান দিগজ, স্বভাবে ব্যবহারে সুমধুর। স্বভূমির ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের বৃত্তে দাঁড়িয়ে স্বকীয় আদান-প্রদানের শিল্পবৃত্তিতে সব দিক দিয়ে সে সার্থক। ছোট পরিধিতে হলেও রবীন্দ্রনাথের মতই নিজের রহস্যময় অন্তস্তল থেকে নেওয়া আর বিশ্বজনকে বিলিয়ে দিয়ে যাওয়ার পরম অবলীলায় সে অপরূপ।
এই আদান-প্রদানের বৃত্তিতেই যে কোনো মানুষ সম্পূর্ণ হতে পারে। লেখক, গায়ক, শিল্পী, যে কোনো রূপবান কলাবৎই তা হতে পারে। কিন্তু অতিমানসে কিংবা অতি মানুষত্বে উত্তীর্ণ হওয়া এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। দারুণ বিড়ম্বনা। তেমন সর্বনাশ যেন কখনো কারো না হয়, ভগবান আমাদের রক্ষে করুন!
কিন্তু জিতেন্দ্রলালের পৈঠায় দূরে থাক, তাঁর পাদমূলেও কি পৌঁছতে পেরেছিলো গিরিজা? মনে হয় না।
জিতেন্দ্রলাল যেমন মাথায় তেমনিতর মনের দিকেও বিরাট ছিলেন। বুদ্ধির দিক দিয়ে যেমন অতিমনস্বী, বিদ্যায় বাগ্মিতায় অদ্বিতীয়, মনের দিক দিয়েও তেমন অতিশয় মনুষ্য। তাঁর মনের পরিচয় পেয়েছিলাম সেইখানেই–সেই জেলখানাতেই একদিন।
সেদিন তাঁর ঘরের তকতকে মেজেয় শুয়ে আমি দৈনিক স্টেটসম্যান পড়ছিলাম, আর তিনি কোণের জানালার দিকটায় ডেকচেয়ারে ঠেস দিয়ে একান্ত মনোযোগে পড়ছেন শরৎচন্দ্রের অরক্ষণীয়া। জিতেন্দ্রলালকে জেলের থেকে দৈনিক পত্র আর তাঁর পছন্দসই বই যোগানো হতো।
হঠাৎ ঘরের মধ্যে ফোঁসফোঁসানি শুনে চমকে উঠে তাকালাম। দেখি কিনা, বই পড়তে পড়তে হাপুস নয়নে তিনি কাঁদছেন, ছেলেমানুষের মতন অঝোর কান্নায় চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে তাঁর। বই মুড়ে প্রাণভরে খানিকটা কেঁদে নিয়ে বই খুলছেন, আবার কাঁদছেন আবার মুড়ে রাখছেন–ফের আবার-বারংবারই ঐ কান্ড। তারপর তিনি আর সামলাতে পারেন না, না নিজেকে, না বইটাকে।
ঘরের অন্য কোণে ছুঁড়ে ফেলে দেন বইটাকে। খানিক বাদে চোখ মুছতে মুছতে গিয়ে তুলে আসেন বইটা, খানিক পড়ার পর কেঁদে ভাসিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন আবার। আবার তুলে আনেন। এমনিধারা চলতে থাকে তাঁর বারংবার।
পারছেন নিজেকে রুখতে, না পারছেন বই পড়া রাখতে। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে তাঁর চোখ মুখ চিবুক প্রশস্ত বুক-শরৎ-রচনার এর চেয়ে বড় প্রশস্তি আর কী হতে পারে? তার এই অশ্রুত অদ্ভুত কাহিনী তাঁর মনশ্চরিত্রের আরেক দিক প্রকাশ করে অনেককেই চমকে দেবে হয়ত। অবন্যায় ভাসমান তাঁকে দেখে অরক্ষণীয়া কন্যার ন্যায় তাঁকেও আমার নিতান্ত অরক্ষণীয় বলেই মনে হয়েছিল সেদিন।
.
৬৯.
বহরমপুরে কারাবাসের এক মাস দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল আমাদের। এগিয়ে এলো খালাস পাবার তারিখ।
দেখে দেখে আর চেখে চেখে ফুর্তির মধ্যেই কেটেছিল দিনগুলো। দেখবার ছিল একজনই কেবল-সেই কাজী। সে-ই একমাত্র দ্রষ্টব্য। মুহূর্তে মুহূর্তে তার রঙ বদলাচ্ছে, সুর বদলাচ্ছে, মেজাজ বদলাচ্ছে। মূহুর্মুহু সে অপরূপ।
কোনো বিধিনিয়মের রুল দিয়েই তাকে ধরা যায় না, মাপা যায় না, ব্যাখ্যা করা যায় না। সেই অভিব্যক্তির আখ্যান হতে পারে, কিন্তু ব্যাখ্যান নেই। এমন পরমাশ্চর্য বুঝি এর আগে দেখা গেছল সেই নবদ্বীপেই-বাংলার আবালবৃদ্ধনিতাকে যা মাতিয়েছিল আরেকবার। অপর দৃষ্টান্ত দ্বাপরের-বৃন্দাবনের মেয়েপুরুষকে পাগল করে তুলবার সেই!
দ্রষ্টব্যই নয় কেবল কাজী, শ্রোতব্যও বলতে হয়। সুরের তালে অহরহ তার আনাগোনা। নিজেও সে যেমন মাতোয়ারা, তেমনি গানে গানে মাতিয়ে রাখত আমাদের সবাইকে। নিজের গানের চেয়েও বেশি গাইত সে রবীন্দ্রসঙ্গীত।
চোখে দেখার দিকে যেমন, চেখে দেখার দিকেও তেমনি সে। ভালোমন্দ নানান খানা, নানা খাবার চাখা-র চাখাবার সে ছাড়া কে আর? কয়েদখানার পাকিস্তানের কায়েদে আজম নজরুল। কতো রকমের রান্নার কায়দাকানুন জানা তার, তা বলবার নয়।
অবশ্যি আমাদের খানা পাকানোর থেকে তাবৎ পরিচর্যার জন্য জেলের থেকে কয়েকজন মেট মজুদ ছিল, কিন্তু তাহলেও কাজী নিজগুণেই রান্নাঘরের হাতা-খুনতিতে গিয়ে হাত লাগাতত বেশির ভাগ।
কতো দেশবিদেশের রান্নাবান্নাই না জানত সে। শেখদের হারেমের শিককাবাব; (নাকি, শেখদের কাবু করা শেখকাবাব?) থেকে শুরু করে তুর্ক মুলুকের মুৰ্গমসল্লাম (যা খেয়ে বোগদাদের আমীররা তুকীনাচন নাচতেন), আফগানি পোলাও থেকে বেলুচিস্তানের চাপাটি পেরিয়ে পেশোয়ারী প্যাটিহয়ে পাটনাই চাপ পর্যন্ত-হরেক কিসিমের মোগলাই কারিকোর্মা রোস–সেই সঙ্গে আমাদের এদেশী বিরিয়ানি আর চিরদিনের পরমান্ন নিয়ে–কতো রকমের খানদানি খানাপিনা যে!
খেয়ে খেয়ে চেহারা ফিরে গেল আমার, চেকই দেখা দিল। কখানা হাড় নিয়ে কয়েদখানার গেছলাম, অদৃষ্ট হাতে করে সেখানেই এগুলোর সঙ্গতি হবে সেই আশায়, এদিকে নানান খানায় হৃষ্ট হয়ে গায়ে গত্তি গজিয়ে সেখান থেকে বেরুলাম, বেশ পুষ্ট হয়ে।
