কিন্তু আমার বিস্ময় লাগে এই ভেবে যে, বিশ্ববিদিত না হলেও যে নাকি আন্তর্জাতিক লেখকদের একজন বলেই গণ্য, তারও কি মনের কোণে কোণে মাতৃভাষায় লেখা কবেকার সামান্য কয়েক ছত্রের জন্যও মায়া জড়িয়ে থাকে! অবাক হবার কথাই বই কি!
তার কোর্টশিপের কালে গিরিজা আমাকে অধ্যাপক বড়ুয়ার বাসাতে নিয়ে গিয়েছিল একবার–(তাঁর পুরো নাম বোধ করি বেণীমাধব বড়ুয়া, বাড়ি ছিল যেন শ্রীরামপুরেই?) তার ভাবী বউকে দেখাতেই, মনে আছে। ভারী সুশ্রী মেয়েটি, মুখখানি কী মিষ্টি যে। অসমীয়া মেয়েরা স্বভাবতই যেমনটা হয়ে থাকে। সেই বাড়িতে এমন একটা কাভ সে করে বসে যাতে আমি বেশ ধাক্কা খাই। কান্ডটা এমন কিছু নয়–সাধারণের কাছে, সাধারণভাবে দেখলে এমন কিছু মারাত্মক ঠেকবে না, কিন্তু আমার মনে তার চোট দারুণ লেগেছিল। বৈঠকখানায় আমরা বসে গল্প করছিলাম, বাড়ির এক বাচ্চা ছেলে, তার ভাবী শ্যালকই হবে সম্ভব, ভারী দুরন্তপনা করছিল, ছেলেরা যেমনটা করে থাকে সচরাচর। গিরিজা করল কি, তার ঘাড় ধরে নুইয়ে সেই বিরাট তক্তপোষের তলায় ঢুকিয়ে দিল, বলল, থাকো ঐখানে বসে যতক্ষণ না আমরা এখান থেকে যাচ্ছি। আশ্চর্য, ছেলেটা সেখানেই হামাগুড়ি দিয়ে বসে রইল বিনা বাক্যব্যয়ে-বেড়ালের মতই চুপটি করে ম্যাও শব্দটি না করেই। যতক্ষণ আমরা ছিলাম তাকে আর বেরুতে দেখিনি তার পর। বাড়ির ছেলেপিলেরা গিরিজাকে বেশ ভয় খায় দেখলাম।
ব্যাপারটা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি। ছেলেটার মনে কতটা লেগেছিল জানিনে, মনের ঐশ্বর্যে তারা অফুরন্ত তাই হয়ত কিছুই তাদের মনে লাগে না। জলের গায়ে আঘাতের ন্যায় খুব মর্মভেদী ঘা-ও মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এতদিনে সে ঢের বড়ো হয়েছে, কবেই ভুলে গেছে সেদিনের কথাটা, তার পরেই হয়ত বা, কিন্তু চোট আমার মন থেকে যায়নি এখনো। সত্যি বলতে, সেই কাভের পরই গিরিজার সঙ্গে যেন আমার কাটান ছাড়ান হয়ে গেল, অন্তরের দিক থেকে অন্তত। যে-টানটুকু তার ওপর তখনো আমার ছিল তারও যেন কাটান হয়ে গেল ঐ কান্ডটাই। তার বিয়েতেও আমি যাইনি আর তার পর।
জিতেন্দ্রলাল ছিলেন মহামনী আর মহামনা। বিদ্যাসাগর গোত্রীয়। যেমন বিদ্যায় তেমনি উদারতায় আর দাক্ষিণ্যে। কেবল গিরিজাইে না, তার মন কত ছেলেকেই যে তিনি অর্থ দিয়ে, আহার্য দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছেন। আমাকেই বা কিছু কম কি? চিত্তরঞ্জনের তিরোধানের পরে অভাবে পড়ে যখনই না তাঁর কাছে গেছি, অকৃপণ দাক্ষিণ্য লাভ করেছি, এতবার এত এত যে, তা একমুখে ব্যক্ত করা যায় না।
তেমনি পেয়েছি আরেকজনের কাছেও। তিনিও সেকালের এক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। মডারেট পাটির এক মুখ্য নেতা অ্যাটর্নিদের অগ্রগণ্য যতীন্দ্রনাথ বসু। তাঁর হৃদয়বত্তারও তুলনা হয় না। আবালবৃদ্ধবনিতা যে-কোন প্রার্থীকেই তিনি বিমুখ করতেন না। মুক্তহস্তে দিনে, এমন কি তাঁর বিপক্ষীয় কেউ এসে তাঁর আনুকূল্য চাইলে কখনো নাকি বঞ্চিত হয়ে ফেরেননি। এ কথা আমাকে বলেছিলেন স্বয়ং হেমন্তকুমার সরকার, তৎকালে স্বরাজ্যদলের, তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার থেকেই। এই ধরনের মানুষ একালে আর দেখাই যায় না বলতে গেলে।
কৃতজ্ঞতার পরিচয়ে আমার প্রথম প্রবন্ধের বই আজ এবং আগামীকাল যতীন্দ্রনাথের নামে উৎস্বর্গ করেছিলাম আর কালানুক লালফিতা বইটি অধ্যাপক জিতেন্দ্রলালকে উৎসর্গীকৃত।
দুটো বইয়ের কোনটাই এখন আর পাওয়া যায় না। তার পর আর তা পুনর্মুদ্রিত হয়নি, কালস্রোতে বিলীন। আমার সেকালের প্রায় সব বইয়ের এই দশা-কালোত্তীর্ণ হতে পারেনি কোনটাই! উত্তরকালের উদ্দেশে রচিত না বলেই বোধ হয়।
জিতেন্দ্রলাল গিরিজাকে আদর করে পথিক বলে ডাকতেনযুগান্তরের কথিকা-রচয়িতার ছদ্মনামটি ধরে বারংবার সেই সম্বোধনেই কি না কে জানে, তার মনে সুদূর যাত্রার দুরাকাঙ্ক্ষা জেগেছিল, এবং নিজের উদ্দেশ্যপথে অনেক দূর এগিয়েও ছিল সে। যে সুভাষচন্দ্র আমাকে আত্মশক্তিতে ডাকার পরই বিশৃঙ্খল বলে বিষবৎ বিসর্জন করেছিলেন, সেই সুভাষের বিশ্বস্ত দায়িত্ববান পার্শ্বচররূপে জার্মানীতে কাজ করা নেহাত কম কথা নয়। আমি তো তা ভাবতেই পারিনে।
জিতেন্দ্রলালের আদর্শে নিজেকে অতিমানুষরূপে গড়ে তুলতে উঠে পড়ে লেগেছিল গিরিজা। পড়াশুনা, ধ্যানধারণা, আচার-আচরণে অবিকল তাঁর মতই। জিতেন্দ্রলাল যেমন মহামনস্বী ছিলেন, তেমনি ছিলেন এক অতিমানুষ। বাগ্মিতায়, দেশপ্রেমে, দয়া-দাক্ষিণ্যে, তাঁর মতনটি হওয়া খুব সহজ ছিল না। তাহলেও তাঁর মাপেরটি না হলেও, ছোটখাট একটা অতিমানুষ হতে সে সচেষ্ট ছিল বোধ হয়।
হয়েছিল কি? হতে পেরেছিল কি? হয়ে থাকলেও তাতে তার কী লাভ হয়েছিল আমি জানিনে। অতিমানুষ হওয়ার অত্যাকাঙ্ক্ষা কোনোদিন আমাকে পায়নি, আমার ধাতেই নেই, সে-পথের লাভক্ষতির খতিয়ান আমি দিতে পারব না।
অতিমানুষ আর অতি মানস, সত্যি বলতে, দুই-ই আমার ধরণার বাইরে। আমার মনে হয় কেউ যদি কোনো একটা পেশায় এক মনে একটানা লেগে থাকে তাহলে এককালে হয়ত সে অতীব মানুষ না হয়েও ঐ অতিমানুষের পর্যায় পরিচিত হতে পারে। কিন্তু একমাত্র পেশায় একপেশে হয়ে যাওয়ায়, ভালোটা কোথায়? হিটলারের ন্যায় অতিমানবিক পেশায় নিজের অক্টোপাশে নিজেই জড়ীভূত হয়ে আশেপাশের সবাইকে সমপেষণ ছাড়া আর কী? ছোটখাট পরিধিতে নাতিখর্ব কি খর্বাকার হিটলার হয়ে সবাই মিলে সমান নিস্পিষ্ট হওয়া বইতো নয়। সেটা কি বাঞ্ছনীয়?
