তবে একদিক দিয়ে গান্ধী পাগলই বই কি! পাগলদের রাজা বলা যায় তাঁকে। তাঁর সংক্রামক পাগলামির ছোঁয়াচে তিনি দেশজোড়া সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুলছিলেন সন্দেহ কি! কবিগুরুর কবিতায় যে-উল্লেখ পাওয়া যায়–কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ/জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো/ প্রেমিক ওগো/পাগল ওগো/সাধক ওগো ধরায় আসো/…ঘোর বিপদ মাঝে/কোন জননীর মুখের হাসি/দেখিয়া হাসো!
এটা কাকে লক্ষ্য করে তাঁর রচনা, গান্ধীজী কি পরমহংসদেব, সঠিক জানিনে, কিন্তু দু জনের সঙ্গে বেশ খাপ খায়। পরমহংসদেবের ন্যায় গান্ধীজীও পাগলও বটেন, প্রেমিকও বটেন, সাধক তো বটেই। যেমন মানবপ্রেমিক তেমনিই অসাধ্য সাধক।
রাজবন্দীদের মধ্যে কবি ছিল, বিপ্লবী ছিল, আর প্রেমিক? কে নয়? সাধারণ অর্থে প্রেমিক না হলেও তাঁদের নিজেদের আদর্শের প্রেমে উন্মত্তই তো তাঁরা।
আমাদের ভেতর সুস্থ মস্তিষ্কের লোক ছিলেন শুধু একজন–অধ্যাপক জিতেন্দ্র লাল বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরাট ল-এ আমাদের সঙ্গে তিনি থাকতেন না, আমাদের থেকে আলাদা একটা সুসজ্জিত ঘর তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, নেতৃস্থানীয় বিরাট ব্যক্তি বলেই বোধ হয়। সেখানে নিজের বইপত্তর নিয়ে পড়াশোনায় তিনি নিমগ্ন থাকলে। আমাদের হলের এবং কোলাহলের বাইরে।
আমাদের দলের কেউ কখনো তাঁর ঘরে হামলা করতে যেত না। তেমন সাহস বা উৎসাহ ছিল না কারো। গোড়ায় গেল গিরিজা। আমাদের হলের থেকে সেই প্রথমে তাঁর মহলে। তারপর গেলাম আমি–তার ল্যাজ ধরে, নিজের কৌতূহলে।
গিরিজার কয়েকদিন পরেই আমি গিয়ে দেখি, সে বেশ জমিয়ে বসেছে সেখানে। জিতেনবাবু তার সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন।
ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন তিনি। ক্লাসে লেকচার দেওয়ার বাতিক তাঁর যাবে কোথায়? টেকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে, তিনি জেলখানায় এসেও তাঁর অধ্যাপনা শুরু করে দিয়েছেন! গিরিজার মত উপযুক্ত শিক্ষার্থী পেয়ে তাঁর উৎসাহ আর ধরছিল না।
স্কলারশিপ পাওয়া ছেলে গিরিজা ছোটবেলার থেকেই পড়াশোনায় খুব পোক্ত। নিজের ক্লাসের থেকে, বয়সের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে। স্কুলে পড়তেই সে কলেজের পড়ুয়াদের টেক্কা দিত। জিতেনবাবুকে সে যেন গোগ্রাসে গিলছিল।
মনের মত শিষ্য হলে গুরুর আনন্দ কত হয় সেদিনই প্রত্যক্ষ করেছিলাম। জিতেনবাবু যেন তাঁর সব কিছু শত মুখে তাঁকে উজাড় করে ঢেলে দিতেন। মাঝখান থেকে উপরি লাভ হত আমার–শেলি, ব্রাউনিং কীটস, শেকীয়ার প্রমুখের সারাংশ আমার পল্লবগ্রাহী নৈপুণ্যে পেয়ে যেতাম-মুখস্থ না করেও আত্মসাৎ করা যেত।
জিতেনবাবু কী স্নেহের চোখে যে দেখেছিলেন ওকে বলা যায় না। সাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজি ভাষাও সযত্নে শিখিয়েছিলেন। গিরিজা ইংরেজিতে একটু পোক্তই ছিল, যার ফলে সে অচিরেই আরো শক্ত সমর্থ হয়ে উঠল। উত্তরকালে তাঁর শিক্ষার সদুত্তর সে দিতে পেরেছে। কিছুদিন আগে যুরোপ থেকে প্রকাশিত তার ইনসাইড যুবোপ বইটিতে প্রমাণ মিলেছে তার। বইটি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে সৈয়দ মজুতবা আলীর দেশ-এ প্রকাশিত বিস্তৃত সমালোচনা–নিবন্ধে তার পরিচয় পেয়েছি।
জেল থেকে বেরিয়ে (এবং তারও কিছুদিন বাদে জিনেবাবুরও বেরুনোর পর) সে তাঁর কর্নওয়ালিশ স্ট্রীটের বাড়িতে (বিদ্যাসাগর কলেজের কাছাকাছি) থেকেছিল দিনকতক, সেখানে তাকে এবং নিজের আদরের ভাগনে গাবুকে আর দেবুকে (ভালো নাম জানিনে) সমানে তিনি পড়াতেন আমি দেখেছি।
জিতেনবাবু বিদ্যাসাগর কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক এবং প্রিন্সিপাল নাকি ভাইস প্রিন্সিপাল) ছিলেন, গিরিজা কিন্তু তাঁর কলেজে ভর্তি না হয়ে সেন্ট পলস্-এ গিয়ে ভর্তি হয়েছিল। সেখানকার হোস্টেলে ছিল–সেখানেও মাঝে মাঝে তার কাছে আমি যেতাম।
কিন্তু খুব উৎসাহ পেতাম না, সেও পেত না, বলতে কি! আমার মতন একটা মুখকে মনে হয় সে পছন্দ করত না। আর আমি? আমিও, কেন জানি না, তার পান্ডিত্যের হিংসেয় নয়, এমনিতেই কেমন যেন তাকে বরদাস্ত করতে পারতাম না। কেবল তাকে নয়, তার মতন নির্মন মনস্বীদের কবেই আমি অন্তর থেকে বরখাস্ত করে দিয়েছি।
তাছাড়া, তার কাছে গেলেই তো তর্কাতর্কি, ঝগড়াঝাঁটি–প্রবল বিতার্কিক গিরিজার প্রচন্ড ঝড়ঝাঁপটার সামনে সাধ করে কে নিজের মুখ বাড়িয়ে মার খেতে যায়?
যাই হোক, উচ্চাভিলাষী গিরিজা তার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে পেরেছিল। অধ্যাপক বড়ুয়ার জামাই হয়ে তাঁর দৌলতে বিলেত গিয়েছিল, সেখানে আরো উচ্চতর শিক্ষালাভের পর সেখানেই বসবাস শুরু করে দেয়–সেখানেও নাকি বিয়ে করেছিল সে আবার, শুনেছিলাম। এখানে যে মিষ্টি মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেলে রেখে গেছল (তাদের একটি মিষ্টিতর মেয়েও হয়েছিল শুনেছিলাম), তাদের কী হল জানি না।
তবে গিরিজা পরে বার্লিনে নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের সহায়তায় যোগ দিয়েছিল বলে শুনেছি। সেখান থেকে সুভাষচন্দ্রের সমাচার সহ একখানা চিঠি দিয়েছিল আমায় বসুমতীর ঠিকানায়। চিঠিটা ভুলক্রমে আমার বন্ধু শিল্পী শৈল চক্রবর্তীর কাছে চলে যায়, আমি পাইনি।
এর মধ্যে সে ভারতেও ফিরেছিল একবার–এই তো সেদিন। এক রাত বারোটায় অবোধ সান্ন্যালের সাথে আমার বাসায় এসে হাজির হঠাৎ। আমার ঠিকানার হদিশ বাতলাবার জন্যই প্রবোধকে সঙ্গে করে আনা, জানা গেল। কিছুক্ষণ ছিল, বিশেষ কোনো কথা হয়নি, গোলপার্কের কোথায় যেন উঠেছিল, কিন্তু আমি আর যেতে পারিনি। পরে তার একটা চিঠি পেয়েছিলাম দিল্লির থেকে–সেই কবেকার আমাদের যুগান্তরে পথিক ছদ্মনামে তার দু একটা ছোটখাট কথিকা গোছের লেখা বেরিয়েছিল তারই খোঁজ করে, সেগুলি পাওয়া যায় কিনা জানতে চেয়েছিল সে। কোথায় পাব সে যুগান্তর? গতকাল আমার নিজের যে লেখা বেরিয়েছে তারই কোন পাত্তা নেই আমার, লেখাটেখার প্রতি এতই যে অ-মায়িক প্রকৃতির–তার কাছে অতকাল আগেকার যুগান্তরের খবর থাকে?
