আপনার সঙ্গদোষেই বলতে কী! দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ন।
সে কী! আমি আপনাকে সঙ্গ দিতে গেলাম কখন? সেই কাবুলিওয়ালার দায়ে পড়ে একবার যা গেছলাম আপনার কাছে–তারপর আর কই? তারপর এই দেখছি তো। এখানেই এখন।
জেনেশুনে কি আর সঙ্গ দিয়েছেন। অজান্তে হয়ে গেছে। ঘুণাক্ষরেও টের পাননি আপনি। তাহলে খুলেই বলি আপনাকে…
আমার সেই যুগান্তকারী কালের কথা বললেন তিনি আমায়। তখন তিনি আমায় ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করেছিলেন কিছুদিন–কোন বিপ্লবীদল বা বিপ্লবী কোনো কারো সঙ্গে আমি বিজড়িত কিনা তার খোঁজ নিতে, সরকারী নির্দেশেই।
পেয়েছিলেন কারো খবর? আমি শুধাই।
কোথায়! ফলো করে যাচ্ছি…যাচ্ছি…ফলো করে আপনাকে। দেখলাম হঠাৎ আপনি সড়াৎ করে এক রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লেন। সন্দেহভাজন অন্য কারো সঙ্গে মিলিত হবার জন্যই নিশ্চয়। তাই মনে করে আমিও ঢুকেছি আপনার পিছু পিছু। দেখি আপনি এক কোণে বসে একমনে অর্ডার দিচ্ছেন আর খেয়ে যাচ্ছেন এক ধার থেকে। আপনার কাছাকাছি আরেক টেবিলে বসে আমাকেও খেতে হয়েছে বাধ্য হয়ে…তারপর, আপনি যেমন সেখান থেকে বেরুলেন, আমিও বেরুলাম। যেতে যেতে পাশে একটা সন্দেশের দোকান পেয়ে সেখানে আপনি সেঁধিয়েছেন দেখলাম। আমাকেও সেধুতে হল। দেখি কি, আপনি হরেক রকমের মিষ্টান্ন-সন্দেশ-রসগোল্লা-রাজভোগ সাঁটিয়ে চলেছেন, আমিও তাই চালালুম। এমনিভাবে আপনাকে শ্যাডো করে সারা কলকাতার ভালোমন্দ নানান খানার পাত্তা পাওয়া গেল, কিন্তু আপনার কোন বিপ্লবীসঙ্গীর সন্ধান মিলল না।…আর এদিকে গণ্ডেপিণ্ডে গোগ্রাসে গিলে আপনার সঙ্গদোষে আমার ভোজন বেড়ে গেল যৎপরোনাস্তি!
শুনে আমি অবাক হই-কিন্তু মশাই, আপনি যেমন খেয়েছিলেন, আমিও তেমনি খেয়েছি তো? কিন্তু কই, আপনার মতন এতটা তো আমি মোটাইনি?
আপনি খেতেন নিজের পয়সায়, বুঝেসুঝে হিসেব করে, আর আমার খাওয়াটা ছিল সরকারের ঘাড়ে-গায়ে লাগত না। আপনার চারগুণ খেয়ে বিল করে তার চতুগুণ আদায় করা যেত।…
কিন্তু, বেশিদিন তো আর ফলো করতে হয়নি আমাকে। তার পরই তো, কিছুদিনেই আমি ধরা পড়ে গেলাম…
কোথায় ধরা পড়লেন? ধরতেই পারিনি আপনাকে আমরা!
আহা, সে-ধরা নয়, আমার সঙ্গে বিপ্লব বা বিপ্লবীদের ঘুণাক্ষরেও কোনো সম্পর্ক নেই, সেটা তো আপনার অচিরেই টের পেয়ে গেলেন, তারপর তো আর আমায় ফলো করতে হয়নি আপনাকে?
তা হয়নি ঠিক। কিন্তু তাতেই যা ফলোদয় হল না–আপনার বাকভঙ্গীতেই বলি খাওয়ার ঐ বদভ্যাসটা থেকেই গেল আমার–এই আপাদমস্তকে তার প্রমাণ।
এই পর্বতপ্রমাণ? আপনি বলছেন আমার পাশাপাশি কাছাকাছি মুখোমুখি বসে এত এত খেয়েছেন, কিন্তু কই মশাই, আপনাকে তো আমি লক্ষ্য করিনি কখনো? এ কী করে হতে পারে?
খাবার সময় কোনদিকে আপনার লক্ষ্য থাকত না কী! কোনো লোকের দিকেই আপনি তাকাতেন না, যা একটু আপনার নেকনজর তা দেখেছি ঐ মেয়েদের দিকেই। দেখেছি একেক সময় আপনিই আবার ফলো করে চলেছেন…
আমি? আমি আবার কার ফলো করলাম?
কোনো তরুণীর। কলেজের পড়ুয়া-টডুয়া হবে হয়তো। যাচ্ছেন যাচ্ছেন, মেয়েটিও যাচ্ছে, আপনার আগে আগে–ফিরে ফিরে তাকাচ্ছেও মাঝে মাঝে! ভাবলাম পেয়েছি অ্যাদ্দিনে, বিপ্লবীদলের কোনো মেয়েটেয়ে বোধহয়–এদের গোপন ডেরার সন্ধান মিলবে এবার। তারপর যেতে যেতে মিলিয়ে গেল মেয়েটা। আর আপনি চিত্রপুত্তলিকার মতন দাঁড়িয়ে।…
আণ্ডার গ্রাউণ্ডে চলে গেল নাকি? বিপ্লবী ছেলেমেয়েরা সব আণ্ডারগ্রাউণ্ড হয়ে যায় বলে শুনেছি।
কে জানে। কি করে যে চকিতে চোখের ওপর উপে গেল একটি মেয়ে-ভাবাই যায় না। তবে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম, আমার এখনও মনে রয়েছে বেশ, ঘুরে দাঁড়িয়ে পায়ের চপ্পল খুলে উঁচু করে তুলে আপনাকে দেখিয়েছিল।
সে মেয়েটি ভুলবার নয়।
মুখের মতন জবাব দিয়েছিল বলেই বোধহয়?
কী যে কন! আমার মুখের চেয়ে তার জুতোর দাম ঢের বেশি।
তা হতে পারে। তখনকার চপ্পলের বাজারদর আমার ঠিক জানা নেই। তবে হ্যাঁ, স্মরণীয় বটে ব্যাপারটা।
আমারো তাকে মনে আছে। যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে তেমন যুতসই মনে হয় নি, লু বেশ মজবুতসই ছিল মেয়েটা। কী শক্ত সমর্থ দেহ, কীরকম চওড়া তার কবজি–ঠিক আমার বোন ইতুর মতন। তাকে কজ্জা করা কারো পক্ষেই তেমন সহজ হবে না, তন্বী বহ্নি যাকে বলে। তাহলেও, কতো মেয়েই তো ঐ পদযাত্রায় আমার যাত্রাপথে এসে গেছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ চকিত চাহনিতে তাকিয়ে একটুখানি হেসেও গেছে হয়ত বা, তারা সবাই আমার স্মৃতির মিছিল থেকে ভেসে গেছে কোথায়! কিন্তু সেই মেয়েটিকে আজও আমি ভুলতে পারিনি। স-চপ্পল সেই চপলাকে এখনো আমার মনে রয়েছে!
.
৬৮.
কবি, বিপ্লবপথিক আর প্রেমিক একদিক দিয়ে সতীর্থই–তাদের ওই পাগলামিতেই। সেদিক দিয়ে ধরলে পাগলামির তীর্থক্ষেত্র এই বহরমপুরের একদা খ্যাত পাগলা-গারদের এক গোয়ালে সগোত্রদের সবাইকার ঠাঁই করে দিয়ে সরকার বাহাদুর বেশ রসবোধের পরিচয় দিয়েছিলেন।
রসকষ দুই ছিলো ইংরেজের। সেকালের দৈনিক ইংলিশম্যান পত্রিকার এক কোণায় পাগলামির আড়ত-এর উল্লেখ থাকত। তাদের সেই কলাষ্টার নাম ছিল ক্র্যাংকস্ কর্নার–তাতে গান্ধীজীর খবরাখবর থাকত সব।
বিশ্ববরেণ্য মহাত্মার এই ক্র্যাংক বলে পরিচয় দেওয়াটা মোটেই রসালো নয়, বরং কটু কষায় রসের বলা যায়।
