ঐ যে সৌম্যদর্শন যুবকটি ওধারে দেখছ না? উনি চারণকবি বিজয়লাল। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়। চেনো নিশ্চয়ই?
হ্যাঁ, নাম শোনা আছে। কবিতাও পড়েছি ওনার। আমার যুগান্তরেও এক-আধবার লিখে থাকবেন মনে হয়।
আর তোমার খাটের পাশেই যাঁর খাট। উনি হচ্ছেন বিপ্লবনায়ক শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস। আমাদের পূর্ণদা। ওঁকে তো জানোই।
জানি বই কি। তোমার কবিতার থেকেই জেনেছি। সেই–এসো গো ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর! লম্বাপানা কাঠখোট্টা ঐ ভদ্রলোক…উনিই!
দধীচির হাড় দিয়ে তৈরি। ইংরেজের মাথার বজ্রাঘাত।…আলাপ নেই তোমাদের? বলো কি? জানতে না ওঁকে এর আগে?
একদম না। দেখিওনি কখনো।
সে কী হে! একটা বিপ্লবী কাগজের সম্পাদক তুমি, অথচ, অনুশীলন পাটি, যুগান্তর পাটির নাম শোনোনি? আশ্চৰ্য্য! কাজী তো হতবাক।
যুগান্তরের আবার পার্টি কিসের? একজনই তো জানি যুগান্তরের–এই আমি। আমিই পাটি–এক এবং অদ্বিতীয়। আমার আবার পার্টি কোথায়?
আহা, যুগান্তর পার্টি, অনুশীলন পাটি–নামকরা সব বিপ্লবীদের দল-শ্রী অরবিন্দের গড়ে যাওয়া–জানো না? সেইসব দলের নায়ক তো এঁরাইএই পূর্ণ দাস, পুলিন দাস, যাদুগোপাল, কিরণদা, অমরদা, বিপিনদা…
বিপিনদাকে জানি। বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি তো? ফরবৈস ম্যানসনে থাকতে পরিচয় হয়েছিল। ওপর ওপর ভাসা ভাসা আলাপ-এমনিই। বিপ্লবমূলক কিছু নয়।আর ঐ যাদুগোপালবাবুকেও জানি বেশ। রাঁচিতে যখন থাকতুম আমরা, বর্ধমান গ্রাউণ্ডের পাশের হোস্টেলে, আমাদের পাশের বাংলো বাড়িতেই থাকতেন উনি, অন্তরীণ হয়ে সেখানেই ডাক্তারি করতেন। আমার মার হাঁপানির ব্যারাম, সেই সূত্রে মার চিকিৎসার ব্যাপারে আলাপ আমার। খুব বড় ডাক্তার বলবো ভাই। অদ্ভুত চিকিৎসা। মা ওঁর এক দাগ দাবাইয়েই আরাম! বিধান রায়ের চেয়ে কোনো অংশে নূন নন।
যাদুদা রাঁচিতে থাকেন, জানি। যোগাযোগ আছে আমাদের।
এখন আর কোনো যোগাযোগ নেই আমার সঙ্গে। তবে তার চেয়ে তাঁর আলমারিদের সঙ্গেই বেশি সৌহার্দ্য হয়েছিল আমার।
আলমারিদের সঙ্গে, তার মানে?
মানে, বইয়ের আলমারি গো! ডাক্তারির যতো ভারী ভারী বইয়ের। আমার খুব গরের বই পড়ার বাতিক তো, সেই ধরণের বই চাইতে গেছি, তিনি তার আলমারিগুলো দেখিয়ে দিলেন–আমার যতো বই সব ঐ। ইচ্ছে করলে নিয়ে পড়তে পারো। যথাস্থানে রেখে দিয়ে আবার। পাশের এই শেলফটাও ঘেঁটে দেখতে পারো। খানকয়েক বাংলা বই আছে এর ভেতর। তিনি বলার পর তাঁর জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতসারে আমার শেলফুহেলফ শুরু হয়ে গেল। তাঁর ডাক্তারি বই যতো ছিল না, পড়ে পড়ে ফাঁক করলাম–বুঝি আর নাই বুঝি। ডাক্তারির এই পল্লবিত বিদ্যে আমার সেই থেকেই–সেখান থেকেই।!
শুনে কাজী হাসতে থাকে। যাদুদার সত্যিকার পরিচয় তুমি পাওনি। কী করে পাবে? ওঁরা ধরা না দিলে কি ধরা যায় ওঁদের? সাধু মহাত্মাদের মতই প্রায়। যাক্ গে, যেতে দাও। আমার অবাক লাগছে, কোনো বিপ্লবী দলের সঙ্গে তোমার যোগাযোগ নেই…
দলাদলি আমি সর্বদাই ডরাই–সব সময়ে এড়িয়ে চলি তাই। দল বাঁধলে, দলে ভিড়লে নিজেকেও সেই দলে বাঁধা পড়তে হয়। দলে বাঁধা পড়ে ঐরাবতও মুক্ত হয়ে পড়ে, তা জানো? হাতী যে হাতী, সেও দল বাঁধলে কি দ-য়ে মজলো-হাড়গোড় ভাঙা দ হয়ে গেল। আমি মুক্ত বিহঙ্গের মতই থাকতে চাই।
কোনো বিপ্লবী বা বিপ্লবীদের সঙ্গে সংযোগ নেই, অথচ তোমার কাগজটা বিপ্লবের–ঐ যুগান্তর?
যুগান্তর না বলে হুজুগান্তর বলো বরং! তোমার ধূমকেতু দেখে, তোমার দেখাদেখি আরো সবাই কাগজ বার করেছে দেখে, সেই হুজুগে আমিও ঐ-আমারও ধুমধাম!
আমার সঙ্গে কোনো বিপ্লব বা বিপ্লবীর সংযোগ নেই দেখে, কেন নেই, বলে কাজী যেমন সপ্রশ্ন আর হতভম্ব হয়েছিল, সেইরকমের এক বিমূঢ় জিজ্ঞাসা ছিল বোধ হয় তখনকার সরকারেরও। সে খবর পেয়েছিলাম আমি অনেকদিন পরে মৌচাকের আসরে বসে আমার লেখক-বন্ধু পঞ্চানন ঘোষালের কাছে।
মৌচাক সম্পাদক সুধীর সরকারের জীবদ্দশায় তার ব্যক্তিত্বের টানে গুণীজ্ঞানীদের অনেকেই আসতেন সেখানে। তুষারকান্তি ঘোষ, কেদার বন্দ্যোপাধ্যায়, চারু রায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী,, সৌরীন্দ্রমোহন, আমাদের হেমেনদা, সবাই যেতেন–সুধীরবাবুর ন্যায় তাঁদের অনেকেই এখন ইহলোকে নেই। তুষারবাবু অবশ্যি এখনো আসেন মাঝে মাঝে, কোনো কোনো শুক্রবারে হঠাৎ তাঁকে দেখতে পাই। যেমন দেখতে পাই অচিন্ত্য, প্রেমেন, ভবানী মুখোপাধ্যায়, প্রিয় গুহ আর বিশু মুখোপাধ্যায়কে। কবি হরপ্রসাদ মিত্র, লেখক ডাক্তার নির্মল সরকার, সুশীল রায়ও আসেন কখনো-সখনো। প্রিয়বাবু প্রমুখ আর সবাই কখনো কদাচ, কিন্তু বিশুবাবু আর সুপ্রিয় সরকার সেখানে সর্বদাই।
তখন তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার হয়ে রিটায়ার করেছিলেন। তাই সরকারী গোপন কথা ফাঁস করার তখন আর কোনো বাধা ছিল না তাঁর। পুলিশ কমিশনার হয়ে রিটায়ার করার অ্যামবিশন তাঁর পূর্ণ হল না বুঝি আমার জন্যই-ইদানীং তাঁর কলেবরের ঐ অপর্যাপ্ততার দরুণই নাকি!
কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল কথাটা।
কী মুটিয়েছেন যে মশাই! আমি তো এক মোটা, আর আমাদের হর্ষবর্ধনকেও দেখেছি মোটামুটি-কিন্তু আপনি আমাদের দুজনকেই টেক্কা মেরেছেন। হৃষ্টপুষ্টতায় আপনি অদ্বিতীয়! সেই কবে বৌবাজারের ও. সি-রূপে আপনাকে দেখেছিলাম, কী শ্রী! কেমন ছিমছাম সুঠাম! আর এই দেখছি। এ কী হয়েছেন এখন! খেয়ে না খেয়ে কি এমন করেই মোটাতে হয়।
