ওই কাকতালীয় তালিকা। তাছাড়া কী আর? . মার শেখানো তোমার ওই প্যাঁচে সব সময় কাজ হয় না ভাই। একেকবার কোনো রকমে খেটে যায় হয়তো, কিন্তু সর্বদা খাটে না। খাটবার নয়। তাহলে আর ভাবনা ছিল না। ঐ করেই তরে যেত সবাই। জীবনে স্ট্রাগল বলে কিছু আর থাকত না তাহলে।
কিন্তু আমার জীবনে স্ট্রাগল কোথায়? আমি ভাবি। জীবনের সব ঘোরপ্যাঁচ তেমন ঘোরালো হয়ে আসার আগেই মার শেখানো ঐ প্যাঁচ–সেই মারপ্যাঁচের জোরেই কাটিয়ে এসেছি তো! এই প্যাঁচওয়ার্ক–জোড়াতালির জীবন, জীবনই নয় হয়ত বা, কোনো ধকল না পুইয়ে কেবল ঐ বুড়ি ছুঁয়ে বাঁচার মন বাঁচাটাই হয়ত হয়নি আমার। তাবৎ প্রশ্নের পাশ কাটিয়ে উত্তরপত্র আমার যথাযথ হয়নি নিশ্চয়, কিন্তু তাহলেও একথা তো ঠিক, কানাকড়ির সম্বল না নিয়ে ফুটো নৌকোয় চড়ে সংসার পারাবার পার হয়ে এলাম শুধু ওর জোরেই। উত্তর না মিললেও উত্তরণে এসে মিলেছি তো ঠিকই।
জেলখানায় ফিরতেই জেলার সাহেব ডেকে জানালেন-কাল সকালে তোমাদের এখান থেকে ট্রান্সফার করা হবে। বহরমপুর জেলে যাবে তোমরা, বুঝেছ? তৈরি থেকো।
বহরমপুর জেল? সেটা তো শুনেছি একটা পাগলা গারদ। সেখানে কেন? আমি শুধাই।
এখন আর পাগলা গারদ নয়। রাজবন্দীদের জায়গা দিতে সেখান থেকে পাগলাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশিষ্ট রাজনীতিক বন্দীরাই সেখানে থাকেন এখন। যেমন কবি নজরুল ইসলাম
জেলার ভদ্রলোক শ্রদ্ধাভরে নজরুলের নামোল্লেখ করেন। এবং জেল ব্যানার্জি।
জেল ব্যানার্জিও? শুনেই গিরিজা উল্লসিত। তিনিও সেখানে আছেন নাকি? বাঃ? বেশ তো!
জেল ব্যানার্জি আবার কে হে? গিরিজাকে আমি শুধাই-জেলের মধ্যে জেল কেন আবার?
জেল নয় হে, জে. এল.। অধ্যাপক জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনননি? আশ্চর্য।
শুনব না কেন? বক্তৃতাও শুনেছি তাঁর–কতোবার! কী জোর যে বলেন উনি?
হ্যাঁ, ইংরেজি বাংলায় সমান। গিরিজার সায় পাই–যেন ঝড়ের মতই বলে যান–তাই না? বাসিদ্ধ পুরুষ ঠিক না হলেও সিদ্ধবাক্ বাগ্মী তাঁকে বলা যায় অবশ্যই। রাষ্ট্রগুরুর বাগ্মিতা শোনার সৌভাগ্য হয়নি আমার। কিন্তু তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া জে, এল, বাঁড়ুজ্যের বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল কবার। শুনেছিলাম, পরে রাউণ্ড টেবল কনফারেন্সের কালে যখন তিনি বিলেতে যান, পার্লামেন্টে ভাষণ দেবার জন্যে আমন্ত্রিত হয়ে এমন একখানা বক্তৃতা ঝাড়েন যে, তাক লেগে যায় সবাইকার। তাদের ভাষায় তাদেরকেই টেক্কা মেরে এমনভাবে ঝড়ের দাপটের মত জোরালো কেউ বলতে পারে ধারণাই ছিল না তাদের। বাকপটু বাশ্মীশ্বর সেই জিতেন্দ্রলাল।
তোমার সঙ্গে আলাপ আছে নাকি ওর।
নিশ্চয়। ওর ইংরেজিতে মুগ্ধ হয়ে আমি গায়ে পড়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছি গিয়ে। ইচ্ছে ছিল উনি যে কলেজে পড়ান সেইখানে ভর্তি হবার। বহরমপুরে গেলে তাঁর সঙ্গে ধরি জমিয়ে তার পথটা এবার খোলসা করা যাবে।
তাহলে জেলে এসেও তোমার কোনো ক্ষতি হয়নি ভাই, লাভই হয়েছে বরং। পথে এসে গেল কেমন! জেলে এলে বলেই না তোমার এই পথ খুঁজে পেলে! তোমার বেলাতেও কেমন কাকতালীয় হয়ে গেল দ্যাখো। কাকস্য পরিবেদনার কথা বলছিলে না?
পরদিন সকালে লপসিখানা খেয়েই জেলখানার থেকে বেরুলাম। একশো এগারো নম্বরের এক ছ্যাকরা ঘোড়ার গাড়ি চেপে দুজন পাহারাওলার জিম্মায় বহরমপুরের উদ্দেশে শেয়ালদা রওনা হলাম আমরা। লপসির প্রাতরাশের পর সেখানে গিয়ে পড়লাম একেবারে মুর্গির কারি আর বিরিয়ানি পোলাওয়ের ওপর। এক গোরুতর পরিস্থিতিতে গিয়ে পড়লাম বলতে কি!
আমাদের দেখেই কাজীর সোল্লাস অভ্যর্থনা–লে হালুয়া! দে গোরুর গা ধুইয়ে।
অতুলনীয়-অতুলনীয়।
.
৬৭.
গোড়াতেই কাজীর কাছে ওই গোরুত্ব লাভ করে সহজেই সেখানে আমরা স্বাগত হলাম। প্রাচীন এবং নবীন প্রসিদ্ধ দেশ্বতী আর বিপ্লব-পথিকদের সঙ্গে অর্বাচীন আমরা অবলীলায় মিশে গেলাম। চিনি যেমন জলের সঙ্গে মিশে যায়, চেনাচিনির অপেক্ষা রাখে না, চিহ্ন থাকে না, অেনি অসারবৎ আমাদের নিছক জলাঞ্জলিও মিশ খেয়ে সরবতের একাত্ম হয়ে গেল।
প্রকাণ্ড একটা হলঘরে অনেকগুলো লোহার খাট পড়েছিল পাশাপাশি। তারই দুটোর ওপর জেলের আপিস থেকে পাওয়া আমাদের দুখানা করে কম্বল বিস্তৃত হল। খট্টাঙ্গের সেই কম্বলবিস্তারে সাষ্টাঙ্গে আমি সবিস্তার হতে যাচ্ছি, বাধা দিল কাজী।
আরে, এখনই শোরে কি হে?
তার মানে? খাওয়ার পরেই শোয়া–এই তো জানি। খাই আর শুই-কাজ তো এই
এখন আমাদের গান, আবৃত্তি, হৈ-হল্লা কত কী হবে…
হোক না! তার শ্রোতাও চাই তো? আমিই সেই শ্রোতা। শুয়ে শুয়ে শুনব এখন। আমি তো আর গায়ক ও আবৃত্তিকারের পার্ট নিতে পারব না ভাই!
দাঁড়াও, এদের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই আগে, এসো।
এখান থেকেই চিনিয়ে দাও না। দূরের থেকেই চিনে রাখা ভালো হত। কিছু মনে কোরো না ভাই, আমি কীরকম বেখাপ্পা। কারো সঙ্গে মিশতে পারি না সহজে। খাপ খাওয়াতে পারি না তেমনটা।
কবিগুরুর কথাগুলো মনে পড়ে যায়–কুসুম সুকুমার কপোলতলকী শোভা পায় প্রেমলাজে গো/ যাহার ঢলঢল নয়ন শতদল/তারেই আঁখিজল সাজে গো/ভালোবাসিলে ভালো যারে বাসিতে হয়/সে যেন পারে ভালবাসিতেমধুর হাসি তার/দিক সে উপহার/মাধুরী ফোটে যার হাসিতে। ঠিক তেমনি ছেলেদের বেলাতেও, মনে হয় আমার। মিষ্ট স্বভাবের মিশ্রির মন যারা, যেমন কি না কাজী, তারাই সহজে সবার সঙ্গে মিশ্রিত হতে পারে। সবারই তারা আকাঙ্ক্ষীয়। হীনম্মন্যতাই হয়ত তার হেতু হবে, আমি নিজেকে ঠিক তা মনে করতে পারি না। মিশতে ভড়কাই তাই।
