জেল হাজতের প্রায় হপ্তা দুয়েক ধরে মোটমাট দেড় মাসের কারাবাস দন্ড! এ ক্লাসে তার ওপরে! এমন কঠোর কিছু সাজা নয়। একটু মজাই বলা যায় বরং।
যেমন যুগান্তকারী আমাদের মামলাটা, তেমনি যুগান্তকর জাজমেন্ট আর রাজ-দন্ড দেওয়া নয়া হকিম রকস্বর্গ সাহেবের।
ভারত খন্ডে সিডিশনের কেসে অভূতপূর্বই এটা। লোকমান্য তিলকের সুদীর্ঘ সেই ছ বছর মেয়াদের পর বালকগণ্য আমাদের বেলায় এই ছ হপ্তার ঠেলায় রাজদ্রোহ মামলার যেন নয়ছয় হয়ে গেল শেষটায়।
বাবা তারকনাথের পরোক্ষ কৃপাতেই সম্ভব হল যদিও, কিন্তু তাঁকে বেশ অপ্রসন্ন দেখা গেল যেন। আমরা নাচার! বিচারের গলদ, আমরা কী করব তার?
.
৬৬.
সরকারী মামলার বয়ানে বা বিচারের কোনখানো কী গলদ ছিল জানিনে, গলদেশ থেকে ভারী পাথরটা নেমে গেল আমাদের। মহাত্মা রক্ষোবর্গ বা সাধু তারকনাথ, যার দয়াতেই হোক, বেঁচে গেলাম এ যাত্রায়।
কাঠগড়ার থেকে নেমে আদালতের হাজতঘরে গিয়ে হাঁফ ছাড়ছি, একগাদা খাবার নিয়ে প্রভাতদা এসে হাজির।
প্রভাতদা, কী বলে যে আপনাকে… আমি বলতে যাই।
কিচ্ছু বলতে হবে না। তিনি বলেন–এগুলো তোমরা খাও এখন। জেল থেকে ফিরে আমার বাড়িতে এসো, নেমতন্ন রইলো তোমাদের। তারপরে আমি তোমাদের নিয়ে মিস্টার রায়ের ওখানে যাব।
আপনাকে তো বটেই, তাঁকেও আমাদের ধন্যবাদ জানাবেন। গিরিজা বলে- অজস্র অজস্র ধন্যবাদ।
আমি যেখানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাই না, গিরিজা সেখানে বেশ সড়। আদবে আচরণে টনটনে।
এর মধ্যেই আমি একখানা কাগজে ফসফস করে কয়েক লাইন ছড়িয়েছি-সেই ছত্রাকার প্রভাতদার হাতে গুঁজে দিলাম–এক পদাঘাত ওদের দুজনের প্রতিই।
সেই ক লাইন এখনো মনে রয়েছে আমার।–
কী আছে কবির/সে কী দিতে পারে?/একাকী জীবনে মরণে। আছে শুধু প্রাণ/ দেয় সে যে তাইকারো হাতে, কারো প্রণে।/যেথায় হারায়যত কথা গীতি/যেথা জেগে থাকে ভালোবাসা প্রীতি/সেথায় রহিবে তোমাদের স্মৃতি/অমর মরম-স্মরণে।
খাবার-দাবার সাবাড় করার পর গিরিজাকে বললাম- দেখলে তো মা দুর্গার মহিমা। কী বলেছিলাম তোমায়?
মহিমা না ছাই! সুইনহো থাকলে দেখিয়ে দিত এতক্ষণ। পুরো তিন বছর ঘরে ঘানি টানতে হোত-দেখতে।
সুইনহো থাকবে কেন? থাকতে পারে কখনো? আমি বলি-এই সময়ে আমরা সোপর হব বলেই না মা দুর্গা আগের থেকে ওই সুইনহোকে সরিয়ে দিয়ে আনকোরা এই সাহেবকে এনে বসিয়েছে এখেনে? পরে যখন সেটা হবার, আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে ধরা না পড়লেও, তিনি আগের থেকেই তার সব ব্যবস্থা করে রাখেন, তা জানো?
তোমায় বলেছে।
বলেছেই তো। আমার মা-ই বলেছে। বলেছে যে, তুই যদি মা দুর্গাকে ডাকিস না, জীবনে কখনো কোনো দুঃখকষ্ট পাবিনে। কদাচ তোকে বিপদ-আপদে পড়তে হবে না। কোথাও দরজায় ধাক্কা মেরে ঢুকতে হবে না তোকে। তুই যাবার আগেই দেখবি দরজা খুলে গেছে, তার পথ সব সময়ই ভোলা পাবি সামনে…
প্রমাণ?
প্রমাণ হাতে হাতে। জন্মাতে না জন্মাতেই প্রমাণ পেয়েছি।
মানে?
মানে চাঁচল তো একটা অজ পাড়াগই ছিল সেকালে। পঞ্চাশ কোশের ভেতর কোনো ইস্কুল-ফিস্কুল ছিল না। গেঁয়ো পন্ডিতের পাঠশালায় গিয়ে পড়েতে হতো সবাইকে। মা বলেছিল আমাকে, জানিস, তোরা আসবি বলে তোদের লেখাপড়া শেখার জন্যেই মা-দুর্গা রাজা ঠাকুরপোকে দিয়ে আমার মাস-শাশুড়ির নামে এই হাই ইস্কুল স্থাপিত করলেন চাঁচলে। আমি আসার আগেই আমার জন্যে ইস্কুল। আমিও এলাম আর…
তুমিও হলে আর ইস্কুলও হলো।
ইস্কুল হলো আর আমিও হলাম–এভাবেও বলা যায় কথাটা। তাতেও অর্থের কোন ব্যত্যয় হয় না।…।
আর তুমি একদিন এসে ফিরি করবে বলেই ওই আনন্দবাজার পত্রিকাটা হয়েছিল-তাই তুমি বলতে চাও?
না, তা আমি বলতে চাই না। সেটা আমার জন্যেও যেমন, তেমনি আরো অনেকের জন্যে-অনেক কিছুর জন্যেই। আকাশ ব্যেপে যখন বৃষ্টি ঝেপে আসে, তখন একজনের জন্যে আসে না-একজনের ক্ষেতেই পড়ে না কেবল, সবার মাঠ ভরে যায়, সবারই ফসল ফলায়। সেই ফসলে সবার ঘর ভরে, সবার সঙ্গে আমিও পাই, আমিও খাই। একসঙ্গে বাঁচি সবাই।
বুঝেছি। তার মুখে অপ্রত্যয়ের হাসি।
মা দুর্গার অর্চনামন্ত্রের গোড়াতেই রয়েছে না? সর্বমাঙ্গল্য-মঙ্গলে শিবে সর্বার্থসাধিকে…তার মানে কী? সবার মঙ্গলের সঙ্গে যেমঙ্গল সেই মঙ্গল তিনি করেন, সকলের সঙ্গে প্রত্যেকের, প্রত্যেকের সঙ্গে সবার-যুগপৎ সব প্রয়োজন তিনি মেটান, একসঙ্গে সকলের সার্থকতা-সাধন হচ্ছে তার! যেমন চাঁচলের ইস্কুলটা কেবল আমার জন্যই হয়নি, তোমার জন্যও হয়েছিল, আরো আরো সব ছেলের পড়াশুনা করে মানুষ হবার জন্যই। বলে পুনরায় আমার অনুযোগ : তিনি আমাদের জন্য চতুর্বর্গ নিয়ে বসে আছেন, আমাদের রক্ষা করতে অকুস্থলে এমন অকুসময়ে ওই রক্ষোবর্গকে এই প্রেসিডেন্ট ম্যাজিস্ট্রেট করে পাঠানো কি তাঁর এই কঠিন?
তোমার মা দুর্গার কোনো কেরামতি নয় হে, একে বলে কাকতালীয়।
কী তালীয়? কথাটার তাল আমি ধরতে পারি না।
মানে, কাকও এসে তালগাছে বসল আর তালটাও পড়ে গেল তক্ষুনি। মনে হবে যেন কাকই ফেলল তালটাকে। কিন্তু তা তো না, পরিপক্ক হয়ে সেটা পড়বার অপেক্ষাতেই ছিল, আর যেই না কাকটা এসে বসেছে…
ও। সেই কাকতালীয়? কিন্তু ওই কাকতালীয় কবার হতে পারে কারো? কতবার অমন অঘটন ঘটবার? বার বারই কি ঐ কাক এসে তাল সামলায়? বলতে গিয়ে আমি মনের মধ্যে তলিয়ে যাই, খতিয়ে দেখি, আমার এই বেতালা জীবনের আগাগোড়াই তো
