সিডিশান তে জানি। আমি বলি-কিন্তু ওই ক্লাস-হেটরেডটা কী দাদা?
ক্লাস-হেটরেড কাকে বলে জানো না?
জানব না কেন? আমার তো দারুণ ক্লাস-হেটরেড-সেই ছোটবেলা থেকেই। কিছুতেই ক্লাসে গিয়ে বসতে ইচ্ছা করে না। প্রায়ই ইস্কুল কামাই করতাম।
সে ক্লাস-হেটরেড নয়। আমার কথায় তিনি হাসেন। কিন্তু ঐ ক্লাস-হেটরেড যে কী বস্তু, তাও তিনি বিশদ করে দেন না।
তোমাদের বরাত ভালো যে, সেই নিদারুণ ম্যাজিস্ট্রেট সুইহো সাহেব নেই এখন। ইনি আহেল-বিলিতি সাহেব, সদ্য আই-সি-এস হয়ে আসা, এখনো ফ্রেশ, আমলাতান্ত্রিক প্যাঁচে পড়ে জুডিশিয়াল মাইন্ড খোয়াননি এখনো-তারক সাধু যা বোঝাবেন তাই যে মুখটি বুজে বুঝবেন, সে পাত্র নন। এমন কি এঁর কাছে তোমরা বেকসুর খালাসও পেয়ে যেতে পারো।
ভরসা হয় না, স্যার, বলতে যায় গিরিজা। কাজীদার দু বছর আর অমরেশদার হয়েছে তিন তিন বচ্ছর…তারপরও কি ভরসা হয়।
সুইহো সাহেবের হাতে সেই হচ্ছে শেষ কেসমিস্টার কাঞ্জিলালের। তারপরেই তিনি রিটায়ার করেছেন। আর সেই রকসর্গ এসেছেন প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে। তাঁর প্রথম পলিটিক্যাল কেস তোমরা-দেখা যাক না কি হয়।
কী হবে জানাই আছে! গিরিজার কানাকানি আমাকে–জীবনকে সে বেশি মিষ্ট মনে করে না কখনই। এক নম্বরের পেসিমিস্ট।
শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর এগিয়ে এল শেষটায়। বিচারের অভিম লগ্ন এসে গেল অবশেষে।
পাবলিক প্রসিকিউটর তারকনাথ সাধু অনাথ আমাদের বিপক্ষে সওয়াল করতে দাঁড়ালেন।
কার সৌজন্যে জানি না, হাইকোর্টের এক নামজাদা ব্যারিস্টার লড়তে এসেছিলেন আমাদের জন্যে। প্রভাতদাই নিয়ে এসেছিলেন ওই বড় ব্যারিস্টারকে শেষদিনটায়।
কার জন্যে হোলো এটা জানো?
মিস্টার গাঙ্গুলির কেরামতি–আবার কার?
তাঁর তো বটেই, কিন্তু তিনি তো নিমিত্ত মাত্র। তা ছাড়াও আমি বলতে যাই : সেই মারপ্যাঁচের কথাটা তোমায় বলেছিলাম না? তুমি তো মানইে চাও না। সেই মার জন্যেই হয়েছে।
তোমার মার জন্যে হয়েছে? মা তো তোমার দেশেই এখন গো। এখানকার এ-সবের কোনো খবরই তিনি রাখেন না।
মানে, আমার মা নয়। আমার মা, তোমার মা, সবার মা সেই মা-।
থামো থামো। আমার উচ্চারণের আগেই সে সমুচ্চারিত–সেই মা দুর্গাকে মুখের বাইরে দূরীভূত করতে দেয়নি দাঁড়াও, খবর নিচ্ছি আমি। অত বড়ো ব্যারিস্টারকে লাগানো চাট্টিখানি কথা না। কার কুদরৎ জানা যাক। হাজার টাকার ধাক্কা–একদিনেই। তা জানো?
প্রভাতদার কাছ থেকে জেনে এসে বললে সে-তোমার প্রফুদা, সুরেশদাদের কাভ। আনন্দবাজারের কর্তারাই ওনাকে আমাদের পক্ষ সমর্থনের জন্য লাগিয়েছেন।
ওই হোলো। এক কথাই। মা কি নিজের হাতে এসে সব করে দেবেন নাকি? অর দশ হাত দশ দিকে বিস্তৃত নয়? দশজনের মধ্যে ছড়ানো না? তারই একটা হাত ওই আনন্দবাজার। ওঁদের দিয়েই উনি এক হাত খেলেছেন এখানে।
হয়েছে। থামো এবার। সরকারী উকীল কী বলছেন শোনা যাক
তারক সাধু মশাই দাঁড়িয়েছেন সরকার পক্ষের সওয়ালে। আমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণের অভাব ছিল না, যথাসাধ্য যুক্তিগ্রাহ্যভাবে একে একে মজুদ করেছিলেন সেগুলো। ই কবিতাটার কোথায় কোথায় এম রাজদ্রোহ ঘটে গেছে, বেছে বেছে দেখাচ্ছিলেন পরম্পরায়, কিন্তু তাঁর অমন অধ্যবসায়ে মনেপ্রাণে যেন সায় দিতে পারছিলেন না সাহেব। বারংবার ঘাড় নড়ছিল তাঁর-বাট আফটার অল ইট ইজ এ প্যারডিনট টু বি টেক সিরিয়সলি। এ থিং টু লাফ অ্যাওয়ে! ইজ ইট?
আমাদের তরফের ব্যারিস্টার আর. রায় মুখ টিপে হাসছিলেন হাকিমের কথায়।
কিন্তু তারক সাধু সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। নানান আইন-কানুন, নথিপত্রে, ধারা উপরা এনে খাড়া করছিলেন ধারাবাহিক। কিন্তু কিছুতেই কিছু দাঁড়াচ্ছিল না তার। নাট-বোল্টর কোথায় যেন কী গরমিল ছিল, গড়বড় হয় যাচ্ছিল সব।
স্কোয়ার লেগে গোল বল্ট লাগাবার মতই গোলমাল বাঁধছিল কেবল।
আসলে তত আমাদের কেসটা রাজদ্রোহের ছিল না ঠিক। সমাজবিপ্লব বা শ্রেণী সংঘর্ষের বলা যায় হয়ত। আমরা যে দেশের কুকুর ধরে আদর করেছি, বিদেশের ঠাকুরদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ না করে–এরকম একটা ফ্যাশানবিরুদ্ধ অসময়োচিত নীতিবিগর্হিত কাজ আমাদের বয়সের কেউ তৎকালে করতে পারে, আমাদের কাছ থেকে এতটা অসাধুতা স্বভাবতই সাধুমশাই প্রত্যাশা করতে পারেননি-ধারণাও ছিল না তাঁর। তাঁর কোনো দোষ ছিল না। সওয়ালেরও কোনো কসুর ছিল না, কিন্তু অমন চৌকস লোক হয়েও নাট-বোল্টর গলতিকে যথাযথ খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না কেমন। আদালতের কাঠগড়ায় এর আগে অবহেলায় আমার মন শত শত আসামীর মুভপাতের পরেও এবারে যেন তাঁর আটকে গেল কোথায়! হাঁড়িকাঠে আমাদের মাথাটাকে যুতসই করে বাগাইে পারলেন না কিছুতেই। কোনমতেই আমাদের কবন্ধ করা গেল না।
দুর্ভাবনায় তাকে ঘর্মাক্ত হতে দেখলাম।
ফৌজদারির নাটমঞ্চে এতকালের এত নাটের গুরু হয়েও নাট-বোর খেলাপিতে তাঁর নাট্যলীলা জমল না তেমন।
আমাদের তরফে রোলাভ রোডে রোহিণী রায়, বার-অ্যালর হলকর্ষণ শুরু হোলো অরপর। সাধু মশায়ের এত করে চষা জমির বীজ অঙ্কুরিত হবার আগেই কেটে ফসল ঘরে তোলা তো পরের কথা) তছনছ হয়ে গেল সব।
তবে অতখানি সরকারী আরজির পর বেকসুর খালাস তো দেওয়া যায় না, তাই অপ্রমাণিত উক্ত সিডিশনের দায়ে একমাস করে জেল হল আমাদের।
