আট-দশ স্ট্যানজা রচনার মাত্র গোড়ার দু লাইনই মনে আছে আমার–
নহ পিতা, নহ ভাতা, নহ বন্ধু, নহ প্রতিবাসী
হে ভূপতি চৌরঙ্গী বিলাসী!
তার পরের বাকীটা কেবল আমার মন থেকেই নয়–ত্রিভুবন থেকেই হারিয়ে গেছে। যুগান্তরের কোনো কপিই আমার কাছে নেই, কারো কাছে কোথাও আছে কিনা তাও জানি না।
কিন্তু কবিতাটা আদৌ ইংরাজরাজের বিরুদ্ধে নয়। ছিল সেকালের জমিদার আর অত্যাচার অনাচারের বিরুদ্ধেই। দেড় শত বর্ষ আগে উঠেছিল ক্ষুব্ধ বাংলাতে/ ডান হাতে তেলভাভ, মসিপত্র নিয়ে বাম হাতে… সময় মাফিক ধরতে গেলে, ইংরেজ আর জমিদারগোষ্ঠীর অভ্যুদয় প্রায় সমকালে হয়ে থাকলেও ইংরেজ কাউকে এখানে তেল দিতে আসেননি, এসেছিলেন এখানকার তৈলনিষ্কাশনেই। আর, ই চৌরঙ্গীবিলাস! সাহেব সুবোদের সঙ্গে আমাদের জমিদাররাও সেখানে গা-ঘেঁষাঘেষি বাস করলেও পরস্পর একটু সুদূরপরাহত ছিলেন নাকি?
কাজেই, কবিতাটা প্রায় তরোয়ালের ন্যায় ধারালো হলেও ইংরেজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায় না। সেই দুঃসাধ্য চেষ্টার অপপ্রয়াসে তারকাবাবুকে বেগ পেতে হচ্ছিল। উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানো নেহাত সহজ কান্ড নয় তো। তৎকালীন রাষ্ট্রবিপ্লবের তপ্ত আবহাওয়ায় সমাজবিপ্লবের ধারণাও কেউ করতে পারেনি। কানপুরের বোলশেভিক কনস্পিরেসির কেস তখনও হয়েছ কিনা মনে পড়ে না ঠিক, রাশিয়ার কালান্তরকারী কার্যকলাপের সমূহ খবর তখনো এদেশে এসে পৌঁছয়নি বোধ হয়, মজফফর আহমদ প্রমুখ অগ্রপথিক কয়েকজনের মগজেই খেলা করছিল আইডিয়াটা, কাগজে-কলমে রূপ ধরে প্রকাশ পায়নি তখনো, সেইকালে শ্রেণীবিদ্বেষের এই প্রথম পদক্ষেপ আমরাই যে নিজেদের অগোচরে হঠকারিতায় করে বসেছি, নিজেরাই তা টের পাইনি। তারকনাথের ন্যায় সাধু ব্যক্তি তা আর কী করে সন্দেহ করবেন!
জোরসে তিনি রাজদ্রোহের ধারায় চালিয়ে গেছেন তাঁর মামলা।
বণিকের মানদন্ড দেখা দিল রাজদন্ড হয়ে–সেই রাজদন্তের স্বাদ যাতে কিছুটা অন্তত আমরা পাই সেহেতু উনি বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন বোধ হয়।
প্রভাতদা অবশ্যি বলেছিলেন যে এ-মামলা দাঁড়াবে না। দাঁড়াবার নয়।
কিন্তু তাঁর আশ্বাসবাক্যে আমরা তেমন ভরসা পাইনি। তার আগেই বলতে কি, আমরা একেবারে বসে পড়েছিলাম-ওয়ে পড়ার অপেক্ষায়। গিরিজা বলেছিল, তা কি কখনো হতে পারে? যেখানে আমলাতন্ত্রের ভুড়ি ফাঁসাইয়া দাও! নৈর্ব্যক্তিক ঐ এক লাইনের জন্যেই রাজদ্রোহের দরুশ অমরেশ কাঞ্জিলালের তিন বছর হয়ে যায়, সেখানে ছন্দোবদ্ধ এতগুলি মিঠেকড়া লাইনের দারুণ ভূর্বশীকরণের দায় থেকে আমাদের অব্যাহতি কোথায়।
তাই প্রভাতদার কথায় ততটা আমরা আশ্বস্ত হতে পারিনি।
তবু তাহলেও মনের কোণে কোথাও একটুখানি ভরসা যেন ছিল আমার। সেই ভরসাটার ভাগ আমি দিতে গেছলাম গিরিজাকে…..।
দুঃখ করছিল গিরিজা–সে ভেবেছিল যে, কলকাতার কোনো ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে বি. এ.পাশ করলে ল পড়বে, বিলেত যাবে, আই-সি-এস হবে–কতো কী! কিছুই আর হল না। তিন বছরের ধাক্কায় তার তাবৎ কেরীয়ার পত্রপাঠ খতম।
আমি তাকে বলতে গেছি-অত ভাবছ কেন হে! শেষ পর্যন্ত দ্যাখো না কী হয়। সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে দেখো তুমি। আমি যা প্যাঁচ একখানা কষেছি…কিছু না হয়ে যায় না, বুঝলে?
কিসের প্যাঁচ?
আমার সেই মারপ্যাঁচ। মার সেই প্যাঁচেই এ যাত্রা আমরা বেঁচে যাব নির্ঘাৎ!
তোমার সেই ভুরুর মাঝখানে মন এনে মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করার? তোমার মার শেখানো সেই প্যাঁচটা তো? জানি। আগেও বলেছো তুমি আমাকে। ওতে কিছু হয় না ভাই।
ওই করে কতো বিপদ-আপদ থেকে বেঁচে গেলুম আমি কতোবার। আর তুমি বলছো হয় না। তারপরেও বলতে গেছি আমি।
থামো। তোমার ওই ভিরকুটি রাখো। সে কুটি করে : এ বড়ো কঠিন ঠাই। গুরুশিষ্যে দেখা নাই। ইংরেজের আদালত। কোনো মারপ্যাঁচ এখানে খাটে না।
বলে সে উড়িয়ে দিয়েছে আমায় এক কথায়।
মনে পড়ে, উপেনদার ঝাঁপটাতেও আমি উড়ে গেছলাম একবার। তাঁর কাছেও এই প্যাঁচ খাটাতে গিয়েছিলাম। কার যেন কী অসুখ করেছিল, বলতে গেছি-ও তো সহজেই সারানো যায় উপেনদা! কপালের এইখানটায় মন নিয়ে এসে…মা দুর্গাকে বললেই তিনি সারিয়ে দেন তক্ষুনি…
চালাকি পেয়েছিস? আমার কাছে বুজরুকি ঝাড়তে এসেছিস? বললেই মা দুর্গা সারিয়ে দেয়? বটে?
হ্যাঁ, উপেনদা। এই করে আমার অসুখ-বিসুখ সব তো সারাই আমি…আমার তেমন অসুখ হয় না তাই তো, হলেও তেমনটা ভোগায় না, অরেই সেরে যায় দুদিনে। কততবার আমার হলোতে পরীক্ষা করা।
আরে, তোর মা দুর্গা যদি এতই ওস্তাদ–এমন ব্যারাম সারাতে পারে তো নিজের ছেলের ওই ওড়টা সারাচ্ছে না কেন বল তো? ঐ গুডটা সারিয়ে দিলেই আর ঐ ভুড়িটাও–তাহলেই গণেশের চেহারাটাও কার্তিকের মনে হয়ে যায় না?
উপেনদার জবাবে আমি ধাক্কা খাই। বেশ ঘাবড়েই যাই বলতে কি!
যাঁকে নাকি স্বয়ং শ্রীঅরবিন্দ তাঁর তথাকথিত মাতৃসুলভ অতিমানসিক আস্তাবলে বাঁধতে পারেননি, কোনো মহাপুরুষ বা মহানারী-র দিবিজয়ী অশ্বমেধযজ্ঞের উপযুক্ত বলে নিজের প্রতি তার আস্থা ছিল না বলেই বোধ করি-খোদ সেই পীরের কাছে আমি গেছি মামদোবাজি করতে? তাঁর দর্গায় এক কোপেই আমার দুর্গার কোরবানি হয়ে গেল।
প্রভাতদা বলেছিলেন, ভয় খেয়ে না তোমরা। আমার এক ব্যারিস্টার বন্ধুর সঙ্গেও এ নিয়ে কনসাল্ট করেছি–কিছুতেই এই কেস টিকতে পারে না। পিওর ক্লাস-হেটরেডের কেসকে সিডিলানের ধারায় এনে খাড়া করা হয়েছে–এ মামলা কি দাঁড়াতে পারে?
