আমার নিত্য বর্তমান দশায় সে বিস্ময় বা বিরক্তিকী প্রকাশ করেছিল জানি না।
সেই কথাগুলোও সেই সঙ্গে মনে পড়ে আমার।
আজ ঘুম থেকে উঠে কী দেখলাম জানো? অন্য কথা এনে গিরিজা আমার ভাবনা মোড় ঘোরায়– আমার সেলের মধ্যে কী দেখেছি জানো?
আমিও দেখেছি–আমার সেলেও রয়েছে। প্রাতঃকৃত্যর নিমিত্ত সুরক্ষিত সেই চুপড়ির কথা বলছে তো?
ধুত্তোর চুপড়ি। দেয়ালের গায়ে কবিতার ছত্র লেখা রয়েছে দেখলাম। রক্তাক্ষরে লিখিত।
আমার দেয়ালেও লেখা আছে দেখেছি। ওইসব সেলে আগে বিপ্লবী কয়েদীরা সব থেকেছিল না? তাদের কর্ম। তাদের মনের কথা ছত্রাকারে লিখে গেছে তারাই।
সরঞ্জাম তারা পেল কোথায় আমি ভাবছি। পেনসিল কি কলম কিছু তো নিয়ে আসতে দেয় না ভেতরে।
নিজের আঙুল দিয়ে লিখেছে হে! ছুরি দিয়ে আঙুল ঠেছে …
ছুরিই বা পাবে কোথায়! ছুরি কি আনতে দেয় এখানে?
ছুরি তো দাঁতেই রয়েছে। দাঁতে আঙুল কেটেছে।
ওববাবা! শুনেই সে আঁতকায়।
তুমি আমি তা পারব না। তোমার আমার কাছেই বাবা। কিন্তু তাদের কাছে কিছুই না –নিজের আঙুল কাটা তো তুচ্ছ-যারা নাকি ফাঁসিকাঠে হাসিমুখে নিজেদের প্রাণবলি দিতে যাচ্ছে…
শুনে গিরিজা গুম! অনেকক্ষণ আর তার কোনো গুমোর দেখা গেল না। তার পরে গুমরানি শুনলাম সেই আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে।
পাবলিক প্রসিকিউটর তারক সাধুর অভিযোগক্রমে আমাদের নামে চার্জ গঠিত হলে সে বললে, আমাদের বিরুদ্ধে সিডিশনের চার্জ এনেছে জানো? একশো চবিবশ না কতো ধারায়।
পাঠশালার ধারাপাতের মতই আইনের ধারা-জ্ঞান আমার। তার মানে?
তার মানে, ঐ ধারার খপরে পড়ে ধূমকেতুর জন্য কাজীদার দুবছর হয়ে গেছে না?…
কাজীর দুবছরের জেল হয়েছে জানি, কিন্তু ধারার কোনো খবর রাখিনে…কোন ধারায়, কিসে কী হয়, কে তার ধার ধারে।
অমরেশ কাঞ্জিলালের হয়েছে পাক্কা তিন বছর-আমলাতন্ত্রের ভুড়ি ফাঁসাইয়া দাও, শুধু এই একটি লাইন লেখার জন্যই।
তাই নাকি? তা, সিডিশন যখন রাজদ্রোহই, তখন তার জন্য ওরা ফাঁসিও দিতে পারে ইচ্ছে করলে।
তারপরে কাজী আর কাঞ্জিলালের ভুড়ি ফাঁসানো মামলা বাদেও লোকমান্য তিলকের হয়েছিল ছ বছর এই সিডিশনের জন্যই, বলে সে আরো ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি আর উদাহরণমালার সামনে দাঁড়াতে উৎসাহবোধ করি না-ধরো ভাই, আমাদেরও যদি তিন বছর হয়ে যায় তাহলে?
ভাবছি তাই।
তাহলে আমি আর জেল থেকে বেরুতে পারব না সত্যি বলছি। এই হাড় কখানা জেলেই রেখে যেতে হবে আমাকে। দশ দিনের জেলেই একবার যা দশা হয়েছিল না আমার, সেই খিদিরপুর ডকে… তবে আমার মনে হয় তা বোধহয় হবে না এবার।
কী করে বুঝলে?
বোঝা যায়। আঁচ পাওয়া যায় একআধটু। তবে না আঁচালে তো বিশ্বাস নেই। আইনের আচরণ না দেখা পর্যন্ত কিছু বলা যায় না–সে কথাও ঠিক।
এমন সময় জজসাহেব জিজ্ঞেস করলেন আমাদের আত্মপক্ষ সমর্থনে তোমরা কোনো উকীল দেবে না? উকীল দিতে চাও তোমরা?
গিরিজা তার কী যে জবাব দেয় মনে নেই আমার, আমি কিন্তু সাফ জানাই-কোথায় পাব সার উকীল? উকীল লাগাতে তো টাকা লাগে। টাকা কোথায় আমাদের?
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে একটু কথা কয়ে তারক সাধু মশাই তখন আমাদের শুধালেন– তোমাদের আত্মীয়স্বজনদের খবর দিতে পারো। তাঁরা এসে তার ব্যবস্থা করবেন। এক হপ্তা, দু-হপ্তা, কি তিন হপ্তার সময় নাও তোমরা–তৈরি হবার জন্য, বুঝলে?
এখানে কেউ চেনাজানা নেই আমাদের। আত্মীয়স্বজন কেউ না।
সামনে বসে থাকা অ্যাডভোকেটের সারির থেকে একজন তখন দাঁড়িয়ে উঠে জানালেন, তিনিই আমাদের ডিফেন্ড করবেন স্বেচ্ছায়।
মিস্টার পি গাঙ্গুলি, অ্যাডভোকেট, উইল ডিফেন্ড দেম, ইওর অনার। প্রভাত গাঙ্গুলি মশাই তোমাদের পক্ষ সমর্থন করবেন, বুঝেছ? স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রাজী হয়েছেন; তোমাদের কোনো ফী দিতে হবে না ওঁকে।
আমার কেমন চেনা চেনা ঠেকল ভদ্রলোককে। ভারতীর আসরে ওঁকে দেখেছিলাম যেন একবার। ভেবেছিলাম কোনো লেখক হবেন, কিংবা সম্পাদকগোষ্ঠীরই কেউ। এখন দেখা যাচ্ছে উনি উকীলও বটেন।
পরে জেনেছিলাম, সুরেশদা, প্রফুল্লদা, মাখন সেন মশাইরা ওঁকে লাগিয়েছিলেন আমাদের সমর্থনে। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল প্রভাতদার।
অবশ্যি তাঁদের সঙ্গে সেই এককালের যোগাযোগ ছিল আমারও
সেই যখন কিনা আমি আনন্দবাজারের হকারি করতাম। কিন্তু সে সম্পর্ক ছিল একেবারে তলার দিকের-ওপর ওপর।
আর, প্রভাতদা ছিলেন একেবারে ওপর তলার–ওঁদের ভেতরেরই একজন। এ খবরটা আমি জেনেছিলাম পরেই।
আমাদের মন রাজদ্রোহঘটিত সেকালের অনেক মামলায় এভাবে আসামীর রক্ষণে অকৃপণ উদারতায় এগিয়ে এসেছেন আনন্দবাজার। অলক্ষ্যে থেকে তাদের পক্ষ সমর্থন করেছেন ঐ পত্রিকাগোষ্ঠী, এ খবর জেনেছিলাম আমি আরো পরে।
ঐ প্রভাতদার মুখেই জানা আমার। তাঁর সঙ্গে আরো ঘনিষ্ট হবার পর।
.
৬৫.
আসলে আমাদের মামলাটা তেমন সাদাসিধে ছিল না। কিন্তু তারকনাথ সাধুর মতন ধুরন্ধর সরকারী উকীলও তার বিশেষ ঠাহর পাননি। সিডিশনের অভিযোগে আমাদের সোপর করেছিলেন, কিন্তু রাজদ্রোহের কেস এটা ছিল না আদপেই।
পত্রিকায় প্রকাশিত যে কবিতাটার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেটা মূলত রবীন্দ্রনাথের বহুবিখ্যাত এক কবিতার প্যারডি। তাঁর উর্বশী কবিতাটার ব্যঙ্গানুকৃতিতে ভূর্বশী।
