চিরকালই তা এক রহস্য।
দুটি কূল থাকলেই হেলো, সেই দুয়ের আনুকূল্যেই টানাপোড়েনে সে বয়ে চলে, টানের চোটে কোথায় কাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কে জানে!
দুটি কূলই তার যথেষ্ট–সেই দু হাতেই তার জলতরঙ্গের তাল বাজায়-ঢেউয়ে ঢেউয়ে উত্তাল হয়ে বাজে বুঝি। তার মাঝে পড়ে তৃতীয় কোনো প্রতিকূল এসে যদি বাধা দিতে যায় তা যেন সেই টানকে আরো জোরদার করে দেয়। বেজার করে যায়। তিনকোণা ধাক্কায় তখন তা ফুলে ফুলে কূলে কূলে কানায় কানায় ছাপিয়ে ওঠে, দিগ্বিদিক ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
কানায় কানায় ছাপায় যে, সত্যিই! চোখারাও কিছু পার পায় না। ভালোবাসা এমনই অদ্ভুত! তো যেমন বোকাদের চৌকস করে তেমনি আবার চোখাদের ধরে বোকা বানায়। গোড়াতেই কানা করে তারপরে কিনা কানায় কানায় ছাপিয়ে যায়।
গিরিজা চোখা ছেলে, তার নজর পড়তে দেরি হয়নি। সে বললে, তোমাদের দুটিতে মিলেছে ভাল! দুজনেই তোমরা ফুল তো-যদিও আলাদা বানানে। ওটা ফুলগাছ আর তুমি একটি গেছো ফুল।
সে কথা সত্যি! নিজেকে কোনোদিনই আমি চৌকস বলে ভাবতে পারিনে। যখনই যে টানের মাথায় পড়েছি অবলীলায় ভেসে গেছি, চোখ কান খোলা রাখতে পারিনি। টান যদি অন্ধ না করে দেয়, চোখে কানে দেখতে না দেয় যদি, তবে আর সে টান কিসের!
তবে এহেন গেছো প্রেম আমার জীবনে এই প্রথম নয়। এর আগে আরো দুটো ফুলগাছ এসেছিল আমার জীবনে-টেনেছিল মূলসুন্ধু, মনে পড়ে আমার। সেই অনুষঙ্গেই এই গাছটিকে আমার ভালো লেগেছিল কি না কে জানে!
সেই কৈশোর-স্মৃতিই যেন ভেসে উঠল আচম্বিতে।
রোজ বিকেলে পকেটে পাটালি আর চিড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম বেড়াতে, রিনি আর আমি–সেই যুই গাছটার তলা দিয়ে, কুকুরদীঘির ধার ঘেঁষে, মেঠো ক্ষেতের আলপথ ধরে চলে যেতাম মহানন্দার কিনারায়। সেখানে একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর বসে সরু চিড়ের সঙ্গে খেজুর গুড়ের পাটালির শ্রাদ্ধ করতাম দুজনায়।
একেকদিন রিনি এলিয়ে পড়ত কোলের ওপর। আমার উপকূলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে চিড়ে গুড় চাখত আর আলোয় আলো আকাশের দিকে চোখ তুলে রাখত। গোধূলি বেলার রঙের খেলায় শূন্যের মহাসাগরে বুঝি বান ডাকত তখন। কোনো কথাটি না কয়ে চুপ করে। পড়ে থাকত সে।
অস্তমান সূর্যের মুখোমুখি বক্ষ্যমান চাঁদকে সুমুখে নিয়ে–(রিনির সঙ্গে তুলনা দিয়ে, আমি বলব, মস্ত মান দেওয়া হোলো চাঁদটাকে!) আমি তখন…তখন কি আমি…খেজুর গুড়ের সঙ্গে চাঁদের গুঁড়ো মিশিয়ে চন্দ্রপুলির আস্বাদ পেয়েছি।
সেকালের সেই পাথরটাকে–(উস্কাবেগে কক্ষভ্রষ্ট চন্দ্ৰশিলাই ছিলো নাকি সেটা!) এখনো। আমি ভুলতে পারিনি। আর সেই যুঁই গাছটাকেও নয়। কী মিষ্টি গন্ধ বিলোতত সে চার ধারে–কতো ফুল তার ছড়ানো থাকত তলায়। যুই বিছানো সেই ঘাসের বিছানায়, তার ছায়ায় কতো রবিবার, ভ্যাকেশনের কতত দুপুর হাতে হাত দিয়ে আমরা বসে থেকেছি দুজনে যে!
একেক সময় মনে হয় সেই গাঁয়ে গিয়ে দেখে আসি তাদের–সেই গাছ আর পাথরটাকে। এখনো কি তারা সেইখানে আছে, তেমনটিই রয়েছে? বেঁচে বর্তে আছে এখনো? তেমনিই কি পাপড়ির সঙ্গে যুই ফুলের গন্ধ ছড়াচ্ছে গাছটা? সেই পাথরটায় কোন চাঁদমুখ নিজের সিংহাসন পাতে এখন?
সেদিন জেলের ফুলগাছটিকে দেখে ফেলে-আসা সেই গাছটিকে মনে পড়েছিল আমার। যেমন এখন এই লেখার সময় সেই গাছটাই আমার মনে ফিরে দেখা দিয়েছে আবার।
এখনো মাঝে মাঝে যেতে ইচ্ছে করে বইকি! স্বজন বন্ধু কারো জন্যে নয়, কে আর আমার আছে সেখানে। সেকালের বন্ধুদের প্রায় সকলেরই তো একে একে মহাপ্রয়াণের খবর পেয়েছি, আমার পরিচিত কেউ বোধহয় আর বেঁচে নেই কোথাও…আমার সময়ের সেই গাছ পাথরই কি রয়েছে আর?
আর থাকলেই বা তার দাম কী আর? এক-এর অভাবে শূন্যের কি মূল্য দাঁড়ায়? রিনির বিহনে সে গাছ কি আর সেই গাছ? সেই পাথর আর সেই সিংহাসন নয়; বিবর্ণ, পাণ্ডুর, ধুসর শিলালিপির মতই নিতান্তই এক পাভুরাজার টিপি!
এক চলে গেলে শূন্যের কী থাকে আর? মহাশুন্য ছাড়া আর কী? সংখ্যাহীন শূন্যযোগে তার কিছু দাম কি আর বাড়ে? পাশের একক গিয়ে সেই গাছ-পাথরের মতই আমিও আজ একাকী। চারপাশের শূন্য নিয়ে, আকাশের মত ফাঁকায় পড়ে আজ আমি একান্তই একাকী-নিতান্তই শূন্যাকার।
কিন্তু আমার কালের কেউ নেই, আমার বয়সের গাছ-পাথরও না, অথচ আমি রয়েছি, ভাবতে গেলে বিস্ময় লাগে বইকি। কততকাল ধরে বাঁচছি…বাঁছিই.বেঁচেই যাচ্ছি, মরবার নামটিও নেই। বাঁচতে বাঁচতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।
অবাক হবার কথাই। এমনকি প্রেমেনও অবাক হয়েছিল এক সময়…সেই কালেই। অনেককাল ধরে আমাকে একরকমটি দেখে এবং কোনো বৈলক্ষণ্য না দেখে সে একবার বলেছিল আমায়–তুমি বাবা জীউ!
বাবাজীউ? বাবাজীউ মানে তো জামাই! আমি বলেছি-কারো বাবাজীউ কি হতে পারলাম ভাই আর?
আহা, সে বাবাজীউ না গো। সেই জীউ! জীউদের বাবা-সেই ওয়ান্ডারিং জীউ অনন্তকাল ধরে সে নাকি পৃথিবী জুড়ে…পায়চারি করছে, করেই চলেছে-তুমিই সেই মহেঞ্জোদারোর সময়ে তুমি ছিলে, রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপের আমলেও–সেই সিপাহী বিদ্রোহে সময়। আবার এখন আমাদের সামনেও তুমি রয়েছে। আমরা মরে যাব, আমাদের নাতি-নাতনিরাও–সবাই মরে ভূত হবে। তুমি কিন্তু বাবা টিকে থাকবে ঠিক চিরকাল এইরকমটিই।
