মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, হ্যাঁ ঠিকই। কিন্তু ভুবন হাজার সুন্দর হলেও তার চেয়েও বড় সত্যি, মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। এই সূর্যালোকে এই পুস্পিত কাননে-সুষমায় অপর্যাপ্ত, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পরেই কবি যে ওই বলেছিলেন–জীবন্ত হৃদি মাঝে যদি ঠাই পাই-এম সত্য সেইটাই।
ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণকে দেখেছি প্রকৃতির ক্রোড়ে গিয়ে নিমগ্ন হয়ে যেতে গিয়ে তন্ময় হতেন, তন্ময় হবার জন্যই যেতেন যেন সেখানে। সেই ঘাটশিলায় আমিও গেছি, মাঝে মাঝেই যাই এখনো, তার দেখা সেইসব গাছপালা পাহাড় আমিও দেখেছি, আমারও দেখা। ফুলডুংরির থেকে ডুংরি-এর ফুল কিছুই অদেখা নেই। দেখে দেখে চোখ পচে গেছে। মুখ মরে গেছে তার রূপসুধায়, বলতে কি! কিন্তু তার মতন তাদের রূপগুণে আমি বিভোর হতে পারিনি।
বন্য প্রকৃতির লাবণ্য দেখতে মন্দ নয়, কিন্তু দেখা যায় বড় জোর পাঁচ মিনিট। তার বেশি আর নয়।
দেখে দেখে একঘেয়ে লাগে কেমন। অরুচি ধরে যায়।
কিন্তু এই কলকাতায় কখনোই তেমনটা হয় না, এখানে ক্ষণে ক্ষণেই রূপের নতুন মুখ দেখি, মুহূর্তে মুহূর্তে মুখ বদলানো যায়। কিন্তু প্রকৃতির গর্ভে সেটি হবার যো নেই, সেখানে, সেই গাছ সেই ফুল কাল যা দেখেছি আজও তাই, মিনিট পাঁচেক আগেও যেরকমটি, এখনো তদ্রূপ। তার কোনো তারতম্য নেই। ইতরবিশেষ হয় না কোনো। পাহাড় যেখানে যেমনটি ছিল সেখানেই তেমনি ভূপাকার। অবিকল সেই রূপেই-কালকে যেমনটা দেখা গেছে। হেরফের নেই কোথাও। আলাদা আলাদা জাতের ফুল থাকলেও এক জাতীয় ফুলের এক রকমই চেহারা চিরকাল। একবার দেখলেই ফুরিয়ে যায়।
গাছপালা পাহাড়পর্বত নদীনালা চিরকাল একরকমই থাকে। ক্ষণেকের জন্যে বারেক দেখলেই হোলো, দুবার দেখার কিছু নেই। কিন্তু মানুষের বেলাও কি তাই?
মানুষের মধ্যে যারা সুন্দর তাদের বেলায় কি তা বলা চলে?
প্রকৃতির চিত্রপটে এক রূপ, একই রূপ চিরকাল, কিন্তু কোনো কিশোরীর মুখপটে সেই রূপেরই বিচিত্র রূপ–এক রূপসীই নিত্য নব। মুহুর্মুহুই তিনি অপরূপ। ভিন্ন কিশোরী, ফুলের মতন প্রস্ফুটিত হলেও, বিভিন্ন রূপে বিচ্ছুরিত। অন্য কিশোরী ভিন্ন ভিন্ন রূপের বিভিন্ন রূপে দেখা দিলেও প্রত্যেকেই তারা অনন্যা। সৃষ্টির প্রাক্কাল থেকে এক জাতের ফুল এক রূপে দেখা দিলেও এতাবৎ সেই কৈশরের দুটি মুখ কখনই এক রূপে দেখা যায়নি-এক মুখে অসংখ্য রূপ অন্তহীন অফুরন্ত হয়ে দেখা দিলেও কিন্তু এখানে, এই মরুভূমিতে এসে এখন এই ফুল গাছটিকেই যেন আমার দারুণ ভালো লেগে গেল। কেন, কে জানে!
ভালোবেসে ফেললাম, এতবড় মিথ্যে কথা আমি বলতে চাই না, বিভুতির সেই অনুভূতি, কিংবা অনুভূতির সেই বিভূতি আমার নেই, তবে এখানকার এখনকার এই নিঃসঙ্গ দশায় গাছটিকে মিষ্টিত লাগছিল বেশ। তার প্রেমে ঠিক না পড়লেও! তার ডালপালায় ফুল পাতায় আদর করলাম অনেক অনেক। ঘুরে-ফিরে। বারংবার। সে কি জেলখানা বলেই, আমি এখন একেবারে নিঃসঙ্গ বলেই কি? আমার এই অকারণ ভালো লাগাটা, প্রকৃতি প্রবণতা–আমার প্রকৃতিদুর্লভ এহেন আচরণ তা কি এখানকার এই নির্জন অরণ্যবাসের জন্যেই? কিন্তু বিভূতিবাবুর বেলায়…?
বিভূতিবাবু কি ধরাধামকে কারাগার জ্ঞান করতেন? অতঃকরণে কি তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন?
.
৬৪.
এই লুব্ধ প্রকৃতির হলেও প্রকৃতিলুব্ধ আমি কখনই নয়। প্রকৃতির লীলাখেলা কি রূপ যৌবন কোনদিন আমায় বিচলিত করেনি। যে মহাবোধির সংক্ৰণে আব্রহ্মশুম্ভ বিশ্বচরাচরের সহিত একাত্মবোধে প্রাকৃতিক সহানুভূতি জাগরূক হয়, আর তাত মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে গাছপালা নদীনালা পাহাড় পর্বতের অপার্থিব অভিব্যক্তি ব্যক্ত হতে থাকে, অনুভুতির সেই বিভূতি (কিংবা, বিভূতির সেই অনুভূতি) আমার লেশমাত্র নেই। তাই অতিশয় প্রাকৃতিক (এবং কিছুটা অতিপ্রাকৃতিকও বোধহয়) বিভূতিভূষণ বনভুমির লাবণ্য দেখে যেখানে তন্নিষ্ঠ আত্মহারা হয়ে যান, সেখানে আমি একটুখানিও ঘনিষ্ঠ হতে পারিনে।
জানি গাছপালারা আমাদের অনাত্মীয় নয়, বাঁদররা আমাদের পূর্বপুরুষ। একই পাদপ পিতার শাখার থেকে আমাদের উভয়ের উত্তরণ-কিন্তু আদ্যিকালের এই ঐহিক সম্বন্ধ থাকলেও এবং বৃক্ষলতাগুল্মের সঙ্গে শারীরবৃত্তে ( আর বৃত্তিতেও) আমাদের অভিন্নতা আচার্য বসুর আবিষ্কারের পরে সপ্রমাণ হয়ে দৈহিক সম্পর্কে আমরা সন্নিকট হলেও, কেন জানি না, তাদের সঙ্গে কোনো স্নৈহিক সম্বন্ধ স্থাপন করা বুঝি চলে না। প্রাণের অচ্ছেদ্য বন্ধন সত্ত্বেও হৃদয়ের আদানপ্রদান বাধা পায়। গাছপালাকে যেন কিছুতেই ভালোবাসা যায় না।
তবুও জেলখানার এই ফুলগাছটিকে আমার এমন ভালো লেগে গেল কেন যে হঠাৎ! প্রাকৃতিক পটভুমির বাইরে, পরিবেশও যেখানে ঠিক প্রাকৃতিক নয়, প্রকৃত তো নয়ই, সব কিছুই একটু অপ্রকৃতিস্থ, আমার স্বভাবের এই অকারণ অন্যথা দেখা গেল। ফুলগাছটির কী মাধুরী ছিল কে জানে, প্রথম দর্শনেই আমাকে যেন অভিভূত করেছিল! কিন্তু কেন যে, তার কোনো মাথামুণ্ডু আমি খুঁজে পাইনি, তখনও না, এমনকি এখনও নয়। অবশ্যি টানের কোনো মানে হয় না জানি। কেন যে হয়, কখন হয়, কার জন্যে হয়, কী কারণে হয়ে থাকে বা হবেই যে, তা কেউ বলতে পারে না। বেশির ভাগ অপদার্থদের দিকেই তার ঝোঁক আমি দেখেছি।
