হাবিলদারের টর্চের আলোয়ভেতরটা দেখে নিলাম এক নজর। দুখানা কম্বল পাশাপাশি পাতা যায় এতটাই চওড়া আর লম্বায় বোধ হয় আড়াই কম্বলটাক।
খুপরির এককোণে একটা চুপড়ির মতন রাখা, সেটা নাকি প্রাতঃকৃত্যের জন্যই, জানা গেল। রাত্ৰকৃত্যর নিমিত্তও লাগতে পারে দরকার পড়লে। কারাকক্ষের লৌহঘটিত দরজার ওপাশটায় এক বালতি জল, আর এধারে একটা ঘটিমার্কা মগ। পানাহার শৌচকমাদি কৃত্যাকৃত্যের প্রয়োজনে। লৌহদ্বারের রেলিং-এর ফাঁকতালে মগ গলিয়ে অনায়াসে জল আনা যায় দেখা গেল। একটুকরো এই মগের মুল্লুকের আমিই এখন একেশ্বর।
পাশের খর্পরে গিরিজার ঠাঁই হয়েছিল। একটু পরেই তার সাড়া পেলাম– শিব্রাম! এই শিব্রাম!
আমার ঘুম পাচ্ছিল। কোনো সাড়া দিলাম না। কিন্তু তার আগেই হাঁক পাড়ল হাবিলদার অ্যায়, চুপ রহে। বাতচিং মনা হৈ।
বেঁচে গেলাম।
গিরিজার সঙ্গে কতা বলা মানেই তর্ক লাগান। আর, তর্কে তার সঙ্গে পিরবার জো নেই। এঁড়ে তর্ক, কি যুক্তিসহ বেড়ে তর্ক, তা জানিনে, লজিক আমার পাঠ্য ছিল না। (লজিক্যাল নই কোনো কালেই তো ), কী করে বলব। তবে ওর সঙ্গে পেরে উঠি না, তা জানি। তাই সর্বদাই সতর্ক থাকি, পরমব্রহ্মের ন্যায় ওকে তর্কাতীত রাখি। নিজেও আমি তাই থাকতে চাই।
অপরেও প্রায় তাই, আমার মনে হয়েছে। বিমল বলে ওর এক কলেজী বন্ধু ছিল, হাওড়া না কোথায় থাকত যেন, ওর কাছে আসত মাঝেসাঝে। দেখতে শুনতে ভালোই ছেলেটা। কিন্তু দেখতে যত ভালো, শুনতে ততটা নয় নিশ্চয়। তার প্রাণের বন্ধু হলেও মোটেই তার গানের বন্ধু হতে পারেনি।
এক নাগাড়ে গিরিজার বাগড়ম্বর সে সইতে পারে না। ভদ্রছেলে, মুখ ফুটে কোনো আপত্তি করত না বটে, কেননা তা করতে গেলেই তো আরো আরো বাঙুনিষ্পত্তি আর বিপত্তির কারণ হবে সে জানত! তার চেয়ে তার তর্কের পাল্লা কাটিয়ে আমার খোসগল্পের মহল্লায় চলে আসত সটাং! গিরিজার ত্রিসীমা এড়িয়ে, বাসার থেকে বেরিয়ে সামনের মার্লস স্কোয়ারে গিয়ে গল্পগুজবের চক্কর মারতাম আমরা। আর, গিরিজা এমন চটত যে আমার উপর!
আজ জেলের পাহারাদারের সতর্ক প্রহরায় গিরিজার তর্ক পরিপাটি হয়ে উঠবার আগেই পরাস্ত হয়ে গেছে।
যা শত্রু পরে পরে–বলে না? সেই রকমই প্রায়।
বুট পরে গট গট করে হাঁটছিল লোকটা। থ্রিী এলাকার এমোড় থেকে ওমোড় অব্দি তার পাহারার পায়চারি চালাচ্ছিল সে। সঙ্গীন বন্দুক হাতে।
মাঝে মাঝে খুপরির গোড়ায় এসে টর্চ ফেলে তাকাচ্ছিল ভেতরে-কী করছে কয়েদীরা। চারধার নিশুতি। কোনো শব্দ নেই কোথাও। কেবল সেই সবুট পদধ্বনি; গট গট গট গট।
শব্দ কি ছিল না আর কোথাও?
ছিল। দক্ষিণা হাওয়া দিয়েছিল বাইরে, প্রায় ঝত্নে মতই বইছিল যেন। ঝড়ের মান গাছপালায়। তার সরসরানি মড়মড়ানি শাখায় শাখায় পাতায় পাতায়। সারা রাত।
ঘুমিয়ে পড়ছি, ঘুম ভাঙছে, ঘুমুচ্ছি ফের, জাগছি আবার। আর রাতভোর শুনছি সেই মর্মরধ্বনি।
বাইরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু খুপরিটার ভেতরে কি এক ফোঁটাও হাওয়া আসতে নেই? পথ ভুলে একটুখানি হাওয়াও কি আসতে পারে না এদিকে? ঘরের মধ্যে গরমের এমন বিচ্ছিরি ভ্যাপসা যে কী বলব! বলতে গেলে আরো ঘামতে হয়।
মা বলতেন মিছে নয়, প্রমাণ পেলাম তার এখন। ভগবানের যা কিছু দান, তা পেতে হলে অপরকে দিয়ে তবে পেতে হয়, বলতেন মা। তার কাছ থেকে পাওয়া তখন তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া যায় তাইইে।
রূপগুণ অর্থ সামর্থ্যের মতন জল-হাওয়াও বিধাতার দান বইতো নয়। যাবার পথ তার খোলা না রাখলে আসার পথ খোলা থাকে না। তার আসা হয় না, আমাদের আশা ব্যর্থ হয়।
এই যে, দারুণ বাতাস দিয়েছে বাইরে, মাঝে মাঝে তার এক-আধটা ঝাঁপটা লাগছে এসে গায়ে। কিন্তু আমার ওপর দিয়ে তা বয়ে যেতে পারছে না–কেবল আমার অচলায়তনের এদিকটা উন্মুক্ত নয় বলেই তো? দক্ষিণা হাওয়ার দাক্ষিণ্য লাভে আমি প্রবঞ্চিত তাই।
সকালে খুপরির তালা খোলার পর আমাদের দুজনকে নিয়ে দশ নম্বর ওয়ার্ডে ছেড়ে দেওয়া হল।
প্রশস্ত প্রাঙ্গণ বেবাক ফাঁকা, একবারে চৌবাচ্চা ভর্তি জল। নাওয়া-টাওয়ার ভারী সুবিধে হবে এখানে। গিরিজাকে দেখাই।
দাশসাহেব এই দশ নম্বর ওয়ার্জে থাকতেন, সেনগুপ্ত সাহেবকেও রাখা হয়েছিল এখানেই। জানালো মেট। দাশসাহেব এই চৌবাচ্চাতেই নাইতেন। কোণের ওই ফুলগাছটা উনিই। লাগিয়েছিলেন।
তাই নাকি?
এই ফুলগাছের ধার দিয়েই সেই ভাগীরথীর ধারা বয়ে গেছে একদিন! জেনে রোমাঞ্চিত হই। ফুলগাছটাকে আমি একটু আদর করলাম কাছে গিয়ে।
ঢং দ্যাখো না! গিরিজার বাঁকা হাসি দেখা গেল।
ঢং কিসের? এখানে আর কাকে পাচ্ছি বলো? খাব কাকে? সাফাই গাই যেন-তাই ওর ওপর দিয়েই একটুখানি মিটিয়ে নেয়া গেল ভাই!
যথার্থই! আদর করার আর একটা পাত্র না পেলে চলে না যেন কারো কারো। এই কিশোর পল্লবটি আমার প্রিয়জন না হলেও প্রয়োজন এখন। সত্যি বলতে, আমার বন্ধু বিভূতিভূষণের ন্যায় প্রকৃতির প্রতি আমার কোনো দুর্বলতা নেই। কোনোদিনই ছিল না। প্রকৃতি তো পটভূমি মাত্র, তার ওপরেও আরও কিছুর যেন অপেক্ষা থাকে, সেই পরিবেশে পরীর মতন বেশ এমন কিছু, তেমন কেউ। বন্য প্রকৃতির পরেও অন্য প্রকৃতি-সেই অপার মাধুরীর ওপরে অপর কোনো মাধুর্য। তা না হলেও, আলোর মধ্যেও সবটাই কেমন যেন আলুনি।
