ধরবার জায়গা নেই ঠিকই, কিন্তু ধরিয়েছিলাম কোনোগতিকে। পুলিসের হাতে ধরা পড়ার আগে প্রাণের দায়ে খেতে হয়েছিল আমায়। পেটে খেলেই পিঠে সয়, জানেন তো? লালবাজারে গিয়ে কী পিঠে পড়বে কে জানে-সেই পিঠে খাবার আগে গায়ে জোর করার জন্যেই এখানে এসে পেটকে সইয়েছিলাম। এই আর কি! তা দামটা…।
তা হলেও আমাদের পেত্যয় হচ্ছে না মশাই! বিশ-বিশটা রাজভোগ গিলেছেন আপনি! বেশ, খান তো বসে আমাদের সামনে আবার, দেখা যাক। এই, দে তো এনাকে বিশটা রাজভোগ এনে এখেনে। টাটকা যেগুলো আজকের-তাই দিবি।
রাজভোগর সামনে বসতে হল না, বসেই ছিলাম, রাজভোগ আমার সামনে এসে বসল।
খান তো দেখি এবার।
প্রমাণ দিতে বসে পেটের না অপমান করে বসি–ভয় হয় আমার। পেটের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়–তা জানি, কিন্তু যে পরম মিষ্ট (নরম অধরেরে কথা ধরছিনে) উল্লাসবোধে অনায়াসে খাওয়া যায়, তাই উপরোধে গিলতে হলে টেকির মতই মনে হতে থাকে। ঢক করে গেলা যায় না। যাই হোক, কুঁথিয়ে-কাঁথিয়ে তো পার করা গেল কোন রকমে।
তারপর দামের কথাটা ফের পাড়তেই-না না! এর দাম দিতে আর হবে না আপনার। এ তো আমরা খাওয়ালাম। আনন্দে খাইয়েছি আপনাকে। খেয়ে আপনি আনন্দিত হয়ে থাকলেই আমরা খুশি। এ তো বাজি ধরে খাওয়াই একরকমের। বাজি জিতেছেন, তার দরুন আরো বিশটা ওই রাজভোগ আপনার পাওনা। না না, এখানে বসে খেতে হবে না আপনার-আপনাকে খুন করতে চাইনে আমরা। বাড়ি নিয়ে ধীরে সুস্থে খুশিমতন খাবেন। এই, দে তো এনাকে একটা বড়ো হাঁড়িতে করে আরো বিশটা সরেস রাজভোগ গরম দেখে–যেটা নেমেছে আজ সকালে–এক নম্বরের।
তা এটার দাম না নিন, নাই নিলেন, কিন্তু আপনার আগেরটা– চমৎকৃত হয়ে আমি কই।
সে তো আমরা সেদিনই বাঁ দিকে খরচ লিখে রেখেছি, আমাদের লোকের মুখে শুনেই না–তখুনিই! তার কী দাম দেবেন আবার? তা ছাড়া, আপনারা হচ্ছেন খুদিরামের সগোত্র (হায় খুদিরাম, অপদার্থ শিব্রামের সঙ্গে তুল্যমূল্য হয়ে গেলে!) ফাঁসিকাঠে হাসিমুখে প্রাণ দিতে যাচ্ছেন আপনারা (হায় হায়!!) আপনাদের খাওয়াতে পারাটা তো ভাগ্যের কথাই। আপনি যখন খুশি আসবেন এখানে, যা খুশি খাবেন, তার জন্য কখনো কোনো দাম দিতে হবে না আপনাকে। এঁকে চিনে রাখো তোমরা। দেশের জন্যে অক্লেশে প্রাণ দিতে যাচ্ছেন। এরা–আমাদের প্রাতঃস্মরণীয়। আপনাদের দেখলে পুণ্যি হয়। দোকানে আপনাদের পায়ের ধুলো পড়াটাই বরাত! আসবেন আবার…আসবেন তো?… নিশ্চয় আসবেন। নমস্কার নমস্কার।
রাজভোগের হাঁড়ি হাতে, মুখ হাঁড়ি করে ফিরলাম নিজের মেসবাড়িতে। কিন্তু তারপরে আমি বীরেনদার সেই কথাটা রেখেছিলাম। ওধারের ফুটপাথ মাড়াইনি আর। ওঁদের দোকানে যাইনি আর কখনো। আদর্শ মহাজন অতবার নিশ্চয় করে বলার পরও, এমন কী তাঁর কর্মচারীদের আমায় চিনে রাখতে বললেও আমি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছি। যথার্থই তাঁরা যে এ যুগের আদর্শস্থানীয় তা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম। আহারে আহারেও। সত্যি বলতে, সেই বিনিপয়সার ভোজে কি রকম যেন বিড়ম্বিত বোধ করেছিলাম। তাঁর মুখে খুদিরামের নামোচ্চারণেই বিষম খেয়েছিলাম–আমার সেই বিষম খাওয়াটার ওপর আবার! যে খুদিরামের খুদকুঁড়াও নেই আমার, সেই তার আদর্শ ভাঙিয়ে আরেক আদর্শের ঘাড় ভেঙে এই খাওয়াটা কেমনতর লাগছিল যেন!
কিন্তু ভেবে দেখলে, এ দুনিয়ায় কিছুই মানুষের ইচ্ছায় আদৌ হয় না। কী রাজভোগ, কী রাজদন্ডভোগ-কোনোটাই কখনো ইচ্ছে করলেই মেলে না। পরের রাজভোগের কথা রাখুন, নিজের রানীভোগ কিংবা হয়রানিভোগ, এমন কি তাও নিজের ইচ্ছেমতন হবার নয়।
সেদিন বীরেনদাকে ফৌজদারি কোর্টের মুক্তাঙ্গনে ফেলে রেখেই জেলে ফিরলাম আমরা।
আদালত ভাঙার পর কয়েদ-গাড়িতে আমাদের ওঠার সময় কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সাশ্রুনেত্র হবার সহস্র চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে নিরুপায় শেষটায় হাসিমুখেই বিদায় দিলেন
আমাদের। বিনাবাক্যব্যয়ে উভয় পক্ষের সেই বিদায়।
ফিরে এলাম জেলে। সেটা সেন্ট্রাল জেল কি প্রেসিডেন্সি, আজও আমি ঠিক জানিনে। তখন হয়ত জেনেছি, মনে নেই এখন আর। এইমাত্র বলতে পারি, যেই জেলে সেই সুবিখ্যাত চুয়াল্লিশ ডিগ্রীর অন্ধকূপগুলি বিরাজিত, এ হচ্ছে সে-ই জেল!
সকালেই বীরেনদার আবেদনে ব্যবস্থা হয়ে রয়েছিল, সেই মতন সন্ধ্যেয় খাওয়া খতম হবার পর আজ আর আনডারট্রায়ালদের সেই জেনারেল পিজরাপোলে যেতে হল না, সোজাসুজি চুয়াল্লিশ ডিগ্রীর দুই সেলে দুজনে গিয়ে মজুদ হলাম আমি আর গিরিজা।
যার বর্ণনা, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-আমাদের উপেনদার নির্বাসিতের আত্মকথায় পড়েছিলাম, খুদিরাম প্রমুখদের সতীর্থস্থল না হয়েও, অনুগামী সহযাত্রী না হলেও, বাংলার বাঙালীর সেই তীর্থস্থলে যাবার-তার ধূলায় গিয়ে গড়াবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের।
.
৬৩.
ফৌজদারি কোর্টের ফেরত সন্ধ্যের মুখে জেলে ফিরেই খানার সম্মুখে। আর, খাবার পাট চুকিয়েই আরেক লৌহকপাটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।
পিঁজরেগুলি বেঁটেখাটো, একটা নয়, সারি সারি লৌহকপাট-চুয়াল্লিশ ডিগ্রির। পরের পর সাজানো। পূব আর দক্ষিণমুখো বাইশটা করে ছোট ছোট ঘর কোণ ঘেষে রাইট অ্যাগলে কাট-করা দুসারিতে। ফাঁসির আসামীদের থাকার জন্য ডেমড় কুঠরি– জেলের নিয়মভঙ্গকারীদের রাখার জন্য সলিটারি সেল-যার নাম নাকি ঠাভিগারদ। সেই টর্চার সেলের একটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
