বীরেনদার আরজি মঞ্জুর হলো। পরের দিন তারিখ পড়ল আমাদের মামলার। কাঠগড়ার থেকে ফিরে এলাম আমরা আদালতের লক্-আপ-এ।
বীরেনদাও এলেন। যতক্ষণ না তাঁর ছাড়পত্র তৈরি হয়ে ছাড়া পাচ্ছেন ততক্ষণের জন্যই যদিও।
লক-আপ-এর এক ধারে আমাকে টেনে নিয়ে আড়ালে তিনি বললেন আমায়–রাগ করিসনি তো, তোকে তখন ওই স্কাউদ্ভুেল বলেছি বলে? কিছু মনে করিসনি ভাইটি।
মনে করব কেন? মনে করার কী আছে? কিছু মিছে কথা তো কওনি তুমি বীরেনদা। রাগ কিসের? ঠিক কথাই বলেছে তো! আমি যে একটা স্কাউণ্ডেল তা আমার চেয়ে বেশি আর কে জানে? কিন্তু সে কথা নয়, আমার একটা অন্য কথা ছিল তোমাকে বলার। লজ্জার কথাই সেটা, তাই এখানে আড়ালেই বলি তোমায়। কাল বাসায় ফিরে পুলিসের হাতে ধরা দেবার আগে আমি এক অপকর্ম করে ফেলেছি। ভীষণ খিদে পেয়েছিল দাদা, একটা মেঠায়ের দোকানে…শ্রীমানী বাজারের গায়ে আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দেখেছে তো? সেখানে গিয়ে গোটা বিশেক রাজভোগ বসিয়েছি, এখান থেকে বেরিয়ে তার দামটা তুমি দিয়ে দিয়ে তাদের। আর নেহাত যদি না দিতে পারো, তাহলে বোলো তাদের যে, আমি জেল থেকে খালাস পেয়েই ফিরে গিয়ে ধারটা মিটিয়ে দেব আমার।
ও ধারে যাসনে আর–তা হলেই হবে। বীরেনদা বালান আমায়–ও ধার দিয়েই হটবিনে একদম। শ্রীমানীর দিকের ফুটপাথ ছাড়া কি সারা কলকাতায় রাস্তা নেইকো আর? ধার শুখবি কি রে? কেউ কি কারো ধার শুধতে পারে কখনো? কোনো ধার কি কখনো শোধা যায়? ধার করি আমরা নিজের উদ্ধার পাবার জন্য, শোধবার জন্য না। কী বোকা রে তুই? তুই যাবি খাবার ধার মেটাতে পাগল! এ বাজারে যার যত দিকে ধার না, যত না ধার, তার তত বেশি ক্রেডিট। তা জানিস? অতো টাকার মেঠাই তুই ধারে খেয়েছিস, অমনি খেতে পেয়েছিস জেনে তোর সম্বন্ধে আমার ধারণা পালটে গেল রে! স্কাউভেল তুই ঠিকই, জানা গেল এবার যদিও সঠিক, তা হলেও তোর সম্পর্কে আমার একটু উচ্চ ধারণাই হল বলতে কি!
বীরেনদা কিন্তু একটা কথা ঠিকই বলেছিলেন-কারো ঋণই কখনো শোধ করা যায় না। আজন্ম থেকে অজান্তে, কি জ্ঞাতসারে, যতজনের কাছে ঋণী হয়েছি, তাদের ঋণ–সব ঋণ, সবার ঋই এ জীবনে সমান অপরিশোধ্য। শুধু আমার নয়, সবার পক্ষেই সেটা সত্য।
কারও ধারই কখনো শোধ করা যায় না, ধবার নয়, হাজার সুদ দিয়েও-এমন কি! ধরুন, সেই কাবুলিওয়ালার দেনাই কি আমি মেটাতে পেরেছি? আমার বন্ধু পুণ্যশ্লোক সেই বিভূতি বাঁড়ুজ্যের? যখন আমার কোনো উপায় ছিল না সেই দুঃসময়ে অর্থসাহায্যে নড়বড়ে আমাকে নিজের দুপায়ে দাঁড় করাবার যাঁরা প্রয়াস পেয়েছেন? যদিও তাঁদের সেই দুশ্চেষ্টার পরেও হাতী-ঘোড়ার কদরে ওঠা দূরে থাক, তেমনি নড়বড়ে রয়ে গেছি শেষ পর্যন্ত। তাঁদের পানা যেমন দিতে পারিনি, চিরঋণী থেকে গেছি, আদর্শের ধারও মেটানো গেল না তেমনি অনেক চেষ্টা করেও-বলব কী!
জেল থেকে বেরিয়েই আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ঢুকেছিলাম আবার–আগের দেনাটা মেটাবার মলবেই।
কিন্তু কথাটা পাড়তেই না কর্তাব্যক্তিটি হৈ হৈ করে উঠেছেন-হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। সেই বোমার মামলার আসামী তো? যার সঙ্গে আমাদের লোক গেছল খাবারের দামটা আনতে? আরেকটু হলেই সে পুলিসের হাতে ধরা পড়ে যেত। ফাড়াকাটিয়ে খুব বেঁচে ফিরে এসেছে সেদিন! মা-কালীর কৃপা ছাড়া কী! তা, সে ব্যক্তি কি আপনি? আপনি বলছেন আপনিই সেই লোক?
হ্যাঁ, সেই কথাই বলতে এসেছি তো…।
বোমা পিস্তল সঙ্গে নিয়ে এসেছেন নাকি? পুলিস আপনার পেছনে নেই তো? পিছু নেয়নি তো পুলিশ? জানেন ঠিক? তা কী চাই আপনার বলুন? কতো চাই? চটপট বলুন মশাই! কত টাকার দরকার? গুলি গোলা ছুঁড়তে হবে না আপনাকে, এমনিতেই দেব। দেশের জন্যে কিছুই করতে পারিনে-যদি এভাবেও কিছু করা যায়। এই দ্যাখ তো ক্যাশবাক্সে কত আছে আজ?
আজ তো সকাল থেকে তেমন বিশেষ বিক্রি হয়নি বাবু। এমন কিছু টাকা পড়েনি বাক্সে… বাক্সর জিম্মাদার গাইগুই করে জানায়।
না না, টাকার কোনো দরকার নেই আমার। আপনাদের ভাঁড়ার লুঠ করতে আমি আসিনি। আপনাদের মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের আদর্শ মিষ্টান্নাদিও নয়–হাজার তা উপাদেয় হলেও। আপনাদের সেই পান্নর টাকাটা মিটিয়ে দিতেই আমি এসেছিলাম…
কিসের টাকা? তিনি এবার সত্যিই যেন হতভম্ব।
সেই মেঠায়ের দামটা মেটাতেই…সেদিন যে রাজভোগগুলো খেয়ে গেলাম না? অমনি অমনিই–জেল থেকে আজ খালাস পেয়েই তার দাম দিতে এলাম আপনাদের। এর আগে দেবার ফুরসত পাইনি তো? এখন পাওনা-গণ্ডা বুঝে নিন আপনারা।
ও! তাই নাকি? তা ভালো। স্বস্তির নিশ্বাস পড়লো তার।–ভালোতা ভালো। বসুন এই চেয়ারটায়। কটা রাজভোগ খেয়েছিলেন সেদিন?
তা গোটা বিশেক তো হবেই? আমি বিশদ করি-একেকটা ওর দাম কতো? আপনাদের ওই অতিকায় রসগোল্লাগুলোর?
বেশি নয়, চার আনা পিস্। কিন্তু বিশটা রাজভোগ আপনি খেয়েছেন–খেতে পেরেছেন, তা আমার বিশ্বাস হয় না। আপনার ওই পা দেহে অতগুলো রাজভোগ ধরবার জায়গা কোথায়? কটুকুন পেট আপনার?
সপেট আমার সর্বাঙ্গীণ সৌষ্ঠবের প্রতি তাঁর এই অপাঙ্গ দৃষ্টির কটাক্ষপাতে আমি লজ্জিত বোধ করি। নামমাত্র এই পেট নিয়েও আমি যে খাওয়ার ব্যাপারে সপটু, উল্লেখযোগ্য এক পেটুক–কী করে তাঁকে বোঝাই?
