কী করে আনবে? কারো হাতে কিছু নেই, দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।
মালখানায় ভরে আনে যে! সে জানায়, প্রত্যেকেরই মজবুদ মালখানা রয়েছে। ওঠ-বোসের চোটে সেই লুকোনো মাল ওইসব বেরিয়ে পড়ে–দেখতে না দেখতে।
মালখানা! সে আবার কী হে? শুনে আমরা তাজ্জব।–কোথায় মালখানা! কি করে বেরুবে?
সে ইঙ্গিত ইসারায় খোলসা করার চেষ্টা পায় কিন্তু তবু আমরা সঝাতে পারি না দেখে শেষটায় বিশদে আসে। চাপা গলায় বলে–যেমন করে ঝাড়া ফিরে না বাবু?
তখন আমরা টের পাই যে, বিদ্যাসাগর মশায়ের কাছে সমাগত সেই প্রত্যাশীর দুরাবস্থার মতন এখানেও আ-কারের ঐ বাহুল্য প্রয়োগ হয়েছে। মালখানার বিকল্পে ওটা হবে আসলে, আমাদের তাবৎ খানা যে পথে নির্গত হয়ে নিরুদ্দেশ্যাত্রায় বেরয়।
কে জানে হয়ত একদিন সারগর্ভ ধাপার মাঠ পার হয়ে অমন বাঁধাকপির অমল মূর্তি ধরে আমাদের পাতে পড়ে আবার।
ছোরাছুরিও আনে বলছে? আমার কৌতূহল।–হতাহত হয় না?
না বাবু, ছোরাছুরি অমন করে আনলেও কোথাও কেটেকুটে যায় না। আনার কায়দা আছে। জানেন বাবু, একবার একজন ছেনি বাটালি উখো সব নিয়ে এসেছিল ঐ ভাবে। জেলখানার জানালার লোহার শিক কাটবার জন্যেই।…
বলো কি, গারখানার গরাদ কাটবার জন্য গোটা একটা কারখানাই! আমি হতবা।–ঐভাবে আমদানি করা? আশ্চর্য!
হ্যাঁ বাবু! একবার একজন একটা সিঁধকাঠিও এনেছিল নাকি! মাটির তলায় সুড়ং কেটে এখান থেকে বেরুবার মতলবে। সে বলে, কিন্তু ধর্মঠাকুর আছেন না? ধরা পড়ে গেল বেচারা–ঐ ওঠ-বোস করতে গিয়েই বেরিয়ে পড়ল বেবাক।
আছেই তো ধর্মঠাকুর! ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। বীরেনদার সায় তার কথায় ধরা না পড়ে যায় কখনো? পড়তেই হবে।
তিনি কলকাঠি নাড়ছেন বলেই সিধকাঠি বেরুচ্ছে। আমি বলি-কখনো কখনো বেরুচ্ছেও না আবার। তখন সেই লোকটাই বেরিয়ে যাচ্ছে জেল থেকে। অধর্মপথে যদিও! কিন্তু কী করা যাবে?
যাক গে! মেট তাকে অম্লানবদনে বেকসুর খালাস দেয়।–যেতে দিন। কিন্তু সে যা মার খেয়েছিল না বাবু! সিধকাঠি-চোরটা! তার ওপর আবার সেই চুয়াল্লিশ ডিগ্রিতে খাড়াবেড়ি-বাড়া চার মাস।
চুয়াল্লিশ ডিগ্রির চার মাসটা আমার জানার বাসনা ছিল, কিন্তু সবার তল্লাসি খতম হবার পর খানার ডাক পড়তেই তখনকার মত কৌতূহল দমন করলাম।
লৌহঘটিত প্লেটে পরিবেশিত রুট-মাংসের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম, গিয়ে আমরা।
সন্ধ্যের আগেই খাওয়া আর খাওয়ার পরেই শোয়া-জেলখানার এই রেওয়াজ।
বিচারাধীন বন্দীদের জন্যে বরাদ্দ একটা হলঘরে খাওয়ার পরে আমরা সবাই গিয়ে পাশাপাশি লম্বা হয়ে পড়লাম।
আলোগুলো সারা রাত জ্বলবে, না নিবিয়ে দেবে এরপর? বীরেনদা জানতে চান অন্ধকারে বাপু আমার ভয় করে ভারী।
আমারও।…ভূতের ভয় আমার বেজায়। বলতে দ্বিধা করি না।
ভূত নয়, আমার অন্য ভয়। বীরেনদা ফুৎকারে আমার ভয়টাকে ওড়াতে চান জেলখানায় আবার ভূত কিসের রে? সাধ করে কেউ মরতে আসে এখানে যে, মরে ভূত হবে?
জেলখানায় কেউ মরে না বাবু, কী যে কন? আমার পাশের ধরাশায়ী জানায় : যারা ফাঁসি যায় তার তো মরবার পর ভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এখানেই। দেখাও দেয় নাকি মাঝে মধ্যে, কে আর তাদের জন্য গয়ায় পিণ্ডি দিতে গেছে বলুন!
বাগে পেলে আমাদেরই পিণ্ডি চটকাবে, আমাদেরকে পিণ্ডি করে চটকাবে এখন।
দ্যুৎ! তোর খালি ভূতের কথা। ভূতের আবার ভয়টা কী? আমি বলি ভূত নয়, অন্য ভয়…
কিন্তু অন্য ভয়টা যে কী হতে পারে আমি ঠাওর পাই না, তিনিও ফাঁস করেন না, আমরাও আঁচ পাই না। এখানে চুরি ডাকাতি রাহাজানি ছিনতাই হবার কিছু নেই। তবে অন্ধকারের সুযোগে অকারণ কে কেউ যদি আদর করে করে গলা টিপে ধরে তো বলা যায় না।
হ্যাঁ, আছে বইকি বাবু অন্য ভয়… আমার পার্শবর্তী কয় : ওই বাবুর…ওনার পাশের লোকটিই তো ভয়ঙ্কর…
মুশকো চেহারার ঐ লোকটা? আমি তাকিয়ে দেখি। একটু কাঠখোট্টা গোছের বটে, কিন্তু ভয়ের তো কিছু দেখি না।
জানেন বাবু, কী কারণে ওর ফাটক হয়েছে? পাকড়েছে কেন ওকে পুলিস? জানেন?
সাংস্কৃতিক বিশেষ্য অশ্বের সহিত ইংরেজি ক্রিয়াপদের এক ফকুড়ি লাগিয়ে এমন সবিশেষ করে সে বলে যে, সেই অকথ্যভাষা সভ্যসমাজে মুখে আনা যায় না। অনুচ্চার্য সেই অকথ্য শুনেই না আক্কেল গুড়ুম!
ইঙ্গবঙ্গীয় এই ফ্ল্যাংগোয়েজের সঙ্গেও পরিচয় আমার এই প্রথম। শুনে আমি স্তম্ভিত।
বীরেনদা কিন্তু আতঙ্কিত-না বাবা, আমি এপাশে শুচ্ছিনে। প্রাণ থাকতে এর পাশে নয়। তুই এধারে আয়, আমি ওদিকে যাই বরং।
ভয় খাচ্ছ কেন বীরেনদা, হলেও অশ্ব কখনই নয়, হতেই পারে না। অশ্বিনী নিশ্চয়। তাই না হে?
যাই হোক না, আমি ওর মধ্যে নেই ভাই।
তুমি তো অশ্বিনী নও, তোমার–আবার ভয় কিসের? এমনকি, তোমার নামটাও অশ্বিনী না। এমন বীরোচিত নাম নিয়ে ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমের অধিকারী হয়েও পরের আক্রমণের ভয় তোমার?
অশ্বই হোক, আর অশ্বিনীই হোক, আমি ওসব রিসূকের মধ্যে যাব না বাবা! বীরেনদা নিজের গোঁ ছাড়েন না-এমন বিপজ্জনক লোকের পাশে আমি…না.না! কখনই না। প্রাণ থাকতে নয়। তাঁর সেই এক কথা।
যাচ্চলে! গিরিজা বলে। সেও এক কথায় সারে।
না বাবু অশ্বিনী নয়, অশ্নই, আমি হলফ করে বলছি। ওর কেসের কাগজে লেখা রয়েছে আমি দেখেছি… সেই লোকটিও নিজের কথায় অনড়।
