ওই পেটনের জন্যেই ওদের বেটন দেওয়া–তাই বুঝি বীরেনদা?
আমি বাতলাই : তাই হবে বোধহয়।
সেই হেতুই ওরা বেতন পায়, বোধ হয়–কী কও?
আবার কী?
বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা বলে না? পুলিসে ছুঁলেও তাই। তবে বাঘের ঘা তার নখদন্তের আঁচড় কামড়ে, আর পুলিসের ঘা-টা হচ্ছে ওই বেটন-পেটার। জানো বীরেনদা, আমাকেও একটা গোরা পুলিস শুট করেছিল একবার?
তাই নাকি? শুনে তিনি হাঁ।–কোথায় লেগেছিল গুলিটা?
কোথাও না। তার চোটে আমি প্রিজন ভ্যানে সেঁধিয়ে গেলাম।
যাঃ! গুল মারার আর জায়গা পাসনি তুই। গুলির চোটে প্রিজন ভ্যানে সেঁধিয়ে গেলি! বললেই হোলো? কোথায় লেগেছিল গুলিটা?
গুলি নয়, বুট। আমি বলি-যেখানে লাগবার ঠিক সেইখানটিতেই।
বুট দিয়ে সুট করেছিল লোকটা? তা, বেশ করেছিল। ভালোই করেছিল। তোর মতন হতচ্ছাড়ার উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট তাই।
আমি তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারি না-তোমাকে করলে আরো বেশ হতো। সেও পায়ে আরাম পেতো আরো।
আমি গোরা পুলিশের ত্রিসীমানায় যাই না। তিনি জানান। প্রাণ থাকতে নয়।
আমিই যাই নাকি? সাধ করে কেউ যায় কখনো? গোরা পুলিস আর ঘোড়া পুলিস দুইই সমান দাদা! ঘোড়ার চাট খেলে যেমন, পুলিস সার্জেনের মার খেলেও তাই।। হাড়গোড় আর আস্ত থাকে না, ডাক্তার সার্জনের কাছে যেতে হয় তখন।
আদালত ভাঙ্গার পর আর সবার সঙ্গে আমাদের তিনজনকেও কয়েদগাড়িতে ভোলা হল। সন্ধ্যের আগেই আমরা জেলখানায় গিয়ে পৌঁছলাম।
জেলখানায় আর জেলের খানায়-প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
সকাল থেকে বীরেনদাদের পেটে কিছু পড়েনি, চুই চুই করছিল পেট। আর আমি, যদিও সকালে আমার এলাকার এক মিষ্টান্ন ভান্ডারে ঋণং কৃত্বা দরাজ ভোগের চোষ্য করে চার্বাকনীতির আদর্শ-স্থাপনা করে এসেছিলাম, অ হলেও সে সব এতক্ষণে কখন হজম হয়ে আমার অন্তরাত্মাও, যা কিনা হৃদিস্থিতেন হৃষিকেশের ঠিক তলদেশেই, অনন্তনাগের মতই ফণা বিস্তার করেছেন। তাঁর ছোবলে আমি অস্থির!
আজকে মাংসের দিন। আজ সন্ধ্যেয় রুটি মাংস দেবে। জানিয়েছিল এক কয়েদী। শোনার পর আমাদের আর তর সইছিল না।
কিন্তু দেয়ার ইজ মেনি এ স্লিপ বিটুইন দা কাপ অ্যানড দা লিপ। আদালতের পাঠানো ক্লিপগুলির সঙ্গে জেলখানার নথি মিলিয়ে নেবার ছিল, হাজতের কয়েদীদের সনাক্তকরণের পালা ছিল তার পর। আরো ছিল কত কী।
সেই সব অবশ্যকরণীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল পরম্পরায়। মাসিকপত্রের ধারাবাহিকের ন্যায় ক্রমশঃ প্রকাশ্য হতে লাগল।
আমাদের সবাইকে সারবন্দী দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল তার পর।
জেলর সাহেব এলেন। আসতেই হাঁক পাড়লো হেডওয়ার্ডার; সরকার সালাম্।
শশব্যস্ত সেলাম ঠুকল সবাই। আমরা চুপচাপ। সেলাম-টেলাম কিচ্ছু নেই আমাদের।
তাই দেখে সঙ্গী আসামীদের কারো কারো চোখ একটু ট্যারা হলেও জেলার সাহেব কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করলেন না। সিপাহী কি ওয়ার্ডারদেরও কেউ দৃপাত করল না সেদিকে। পলিটিক্যাল আসামীদের স্বভাবসুলভ বেয়াদবিতে তারা এতদিনে রপ্ত হয়ে গেছে মনে হয়।
কখন খেতে দেবে হে? আমার পাশে দাঁড়ানো মেটের কাছে আমি ফিসফিসিয়ে জানতে চাই-খাবার দেরিকতো আর? এখন খানা কি বাবু? তল্লাসি হোক আগে। তবে না? সে বলেছে।
খানাতল্লাসীর কথা জানা ছিল, কিন্তু খানা আর তল্লাসি আলাদা আলাদা–তা জানতাম না। খানার আগেও আবার এক তল্লাসি আছে এই প্রথম জানলাম। পৃথক পৃথকরূপে তাদের প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতাও হল এই প্রথম। যদিও এই জ্ঞানলাভের সবটাই পরস্মৈপদী পরের ওপর পরখ হতে দেখেই তৃপ্ত হতে হয়েছিল আমাদের।
একেকজনকে একেবারে বিবস্ত্র করে তালাস করা হচ্ছিল। কী তালাস, কিসের তালাস কে জানে?
আমাদের পালাও আসছে বীরেনদা। রেডি হও।
শুনে তিনি সশঙ্কিত-কী সর্বনাশ!
দেরি আছে তার। আমরা সব শেষে দাঁড়িয়েছি না? ভরসা দিই তাকে–মিনিট পনের দেরি আছে বোধহয়।
তিনি মোটেই আশ্বস্ত হন না কিন্তু-কী মুশকিল দ্যাখ তো! তোদের পাল্লায় পড়ে এডিটার হতে গিয়ে কী ফ্যাসাদে পড়া গেল এখন।
তোমার আবার ফ্যাসাদ কী বীরেনদা? তোমার চেহারাটা তো এমন কিছু খারাপ নয়। সুপুরুষই বলা যায় তোমায়…নিজের প্রদর্শনী খুলতে তোমার আবার লজ্জাটা কিসের!
ধুত্তোর সুপুরুষ! প্রদর্শনীর নিকুচি করেছে। বীরেনদার গজগজানি।
মানে, বলছিলাম কি, তোমাকে দিগম্বর করলে দৃশ্যটা এমন কিছু অদর্শনীয় হবে না। খালি গা হতে আমারই লজ্জা, এই হাড় কখানা বার করার মতন বিশ্রী কিছু আছে আর? আর গিরিজা? ও বেপরোয়া। ও তো লাফাতে লাফাতে খালি গা হবে, চাই কি হবার পরেও হয়ত লাফায় ও?
সেটা কি একটা বিসদৃশ হবে না? বীরেনদা জিজ্ঞাসু হবার পরেও যদি লাফায় ও?
হলে তখন দেখা যাবে। আমি বলি-গিরিজাদের লম্ফঝম্প দেখা যাবে তখন। দেখবার পর বুঝব।
কিন্তু আমার পাশের মেটটি বলল, না বাবু, আপনাদের লাঙ্গা হতে হবে না, লাঙ্গা করবে না আপনাদের। কয়েদীদের পোশাকও পরতে হবে না আপনাদের। আপনারা গান্ধীজীর চ্যালা কিনা!
মহাত্মা গান্ধীর মাহাত্ম্য-মহিমায় মনে মনে তাঁকে ধন্যবাদ জানাই।–বটে? বাঃ, ভালো তো তাহলে…কিন্তু, আচ্ছা, ওদের অমনধারা ওঠ-বোস করাচ্ছে কেন গো? নাকি ওরা নিজেরাই ওই ব্যায়াম করছে-খাবার আগে খিদেটা চাঙ্গা করার জন্যে?
জানেন বাবু, ওরা কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে গাঁজা আফিং চরস সব নিয়ে আসে, এমনকি পয়সাকড়িও, কেউ কেউ ছুরি-ছোরাও আনে আবার!
