দরজা জানালা সব খোলা রেখেই শুই আমি–এখনও অব্দি। বাইরে গেলেও লাগাই না কখনো, তালা-চাবির বালাই ছিল না আমার। সুটকেসটাতেও কোনো চাবি দেওয়া ছিল না। সুট করে এসে কে নিয়ে গেছে কখন!
ছাপাখানার দায় মেটানোর কাগজ কেনার টাকা ছিল তার ভেতরেই–কোথায় যাই এখন? কাগজ বার করি কি করে?
এরকম অবস্থায় গন্তব্যস্থল ছিল একটাই। দেশবন্ধুর কাছে।
গেলাম তাঁর বাড়ি। গিয়ে শুনলাম তিনি কলকাতার বাইরে। কী করা যায় তা হলে?
শার্টের পকেটে ট্রাম ভাড়ার কয়েক আনার সম্বল মাত্র। কী করে এত সমস্যার সমাধান করি ভাবতে ভাবতে ফিরছিলাম। ট্রামটা যখন ওয়েলিংটন স্ট্রীটে, বৌবাজারের কাছ বরাবর আচমকা আমার মনে হল…..
মরীচিকামায়ার মত একটা ছায়াভাস দেখা দিল যেন।
অনেকের প্রকোপে একটার পর একটা করে গেরো পড়লেও সব গেরোই এক কোপে কেটে যায়, আমি দেখেছি। সপক্ষেই থাক আর বিপক্ষেই যাক, বজ্র আঁটুনির একটা ফা গেরো থাকেই, কোন ফাঁকে তা-ই তাবৎ গ্রন্থিমোচন করে দেয়।
এদিনও যেন প্রায় সেই রকমটাই হলো।
যে-আভাসটা আন্দাজে পেয়েছিলাম, ফলে গেছল সেদিন।
ট্রামে আসতে আচমকা আমার মনে হলো, সেই সেদিনকার মতন, আজও বোধ হয় আমাদের বাসা ঘেরাও হয়েছে। পুলিসে পাহারালায় ছেয়ে গেছে পাড়া-আমাদের পাকড়াতে এসেছে পুলিস।
এখন কী কর্তব্য? আমি ভাবি।
প্রথমেই পেট ভরে কিছু খেয়ে নেওয়া দরকার। কারণ থানার হাজতে কী জুটবে বরাতে, জানা নেই। খিদেও পেয়েছিল দারুণ।
কোথায় খাই?
ততক্ষণে আমার নামার জায়গা ঠনঠনের মোড় পার হয়ে ট্রামটা পরের স্টপ-এ-আদর্শ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মুখোমুখি।
তারপর আর আমায় প্রেরণা দিতে হয় না। আমি নেমে পড়ি। মিষ্টান্ন ভান্ডারের টেবিলে বসি গিয়ে।
এনতার রাজভোগের অর্ডার দিই। না, কচুরি সিঙাড়া আজেবাজে জিনিস নয় আজ। বিনিপয়সার ভোজ যেকালে, তখন আর কিছু কিনি না। শুধু রাজভোগই চাই-রাজভোগই খাই। রাজভোগেই পেট ভরাতে হবে আজ-তারপর যা থাকে বরাতে।
পেট ঠেসে খেয়ে তার পরে পকেটে হাত দিয়ে হঠাৎ-ও মা! মনিব্যাগটা গেল কোথায় আমার? ট্রামে কেউ পকেট মেরেছে নিশ্চয়।
কথাটা কেবল ডাহা মিথ্যা নয়, ডবোল মিথ্যা। মনিব্যাগ আমার একদম নেই, কখনো থাকে না, ছিল না কোনো কালেই।
পাড়ার পকেটমার বন্ধু বলেছিল আমায় একবার, টাকা না রেখে যেন পকেটে মনিব্যাগ নিয়ে না বেরোই। ওতে নাহক ওদের হয়রান করা হয়-বহুৎ মেহনতি বেফয়দায় যায়।
তবে, আমার দোস্ত বেরাদারদের হয়রানি বাঁচাতে নয়, আমার মনিব্যাগ না থাকার কারণ অন্য। কখন টাকায় থাকি না, তাই মনিব্যাগ রাখি না।
কোথায় থাকেন আপনি? ঠিকানাটা দিন। সুবিধে মন এক সময় এসে দিয়ে যাবেন এখন। তার কী হয়েছে?
আদর্শের এক ভদ্রলোক বললেন। জ্বলোকের আদর্শ বলতে হয়।
কাছেই থাকি তো। ঠনঠনের কাছাকাছি। আপনারা একজনকে দিন না আমার সঙ্গে তার হাতে দিয়ে দেব দামটা।
একজন আমার সঙ্গে সঙ্গে এল।
বাড়ির কাছাকাছি আসতে, যা ভেবেছি, সারা গলিটা লালে লাল-পাহারাওলাদের লাল পাগরি জেলায়।
রাস্তায় আসতেই যার আঁচ পেয়েছিলাম, ভালো করে না আচাতেই তার ছোঁয়া লাগল। কিন্তু পুলিসের মতন এমন ওয়েলকাম সেদিন আমার কাছে আর কিছু ছিল না। পুলিস কোন সময়ই সমস্যা নয়, সমস্যার সমাধানও কখনো আবার!
দোরগোড়ায় পৌঁছতেই এক ইনপেকটার এসে আমার নাম শুধালেন। শোনা মাত্রই বললেন-আপনি অ্যারেষ্টেড।
তবুও, তার পরেও যেটা বক্তব্য থাকে, বলতে কসুর করি না-ওয়ারেন্ট কই?
এই যে। দেখুন না।
আদালতের ওয়ারেন্ট। সাদা কথায়, এর পর আর কথা চলে না। সামনে খাড়া করা কয়েদ-গাড়িতে গিয়ে উঠতে হয়।
উঠে দেখি, আমি ধৃত হবার আগেই গিরিজা আর বীরেনদা সেখানে উদ্ধৃত হয়েছেন।
ফিরে তাকাই, আদর্শের লোকটি ত্রিসীমানায় নেই।
পুলিসের কান্ড দেখেই না সে উধাও হয়ে গেছে কখন।
আমার মত আসামীকে খাওয়াবার দায়ে পাছে পুলিসে তাকেও পাকড়ায়, সেই ভয়েই হয়ত সে উড়ে দৌড়?
আদর্শের এমন খদ্দের, এহেন আদর্শ খদ্দের হয়ত এর আগে সে আর দ্যাখেনি।
৬. কয়েদগাড়ি
৬১.
বাসার থেকে কয়েদগাড়ি চেপে সটান লালবাজার। বড় থানায় বেশিক্ষণ কিন্তু দাঁড়াতে হয়নি, খানিক বাদে আর সব আসামীর সাথে ব্যাংশাল কোর্টে আমাদের চালান করে দিয়েছে সরাসরি।
আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে খাড়া হচ্ছে, পরের দিনে হাজির হবার নির্দেশ দিয়ে জেলের হাজতে রাখার হুকুম দিয়েছেন হাকিম।
পুলিসের হেফাজতে নয় আর, সোজাসুজি জেলের হাজতে। হাঁপ ছাড়লেন বীরেনদা-বাচা গেল বাপ! থানার জিম্মায় রাখলে আর রক্ষে ছিল না ভাই! পুলিসে যা পেটায়, জানিস?
কী করে জানব? থানার কার্যকলাপ জানা ছিল না আমাদের।
থানার পাশাপাশি বাড়িতে থাকলে জানা যায়। মারের চোটে সারা রাত এমন চেঁচায় বেচারারা যে কান পাতা যায় না, চোখের পাতা বোজা দায়। নেহাত বাচ্চা আসামীদেরও রেহাই দেয় না ওরা।
কেন বীরেনদা?
কবুল করানোর জন্যেই করে। ওদের কবুলতি ধরে আরো সব আসামীদের পাকড়াতে পারে তখন। ওই করেই ওরা সব কেসের হিল্লে করে, থোমোশন হয়ে থাকে ওদের, বুঝেছিস?
কাঠগড়ার ফেরত, ফৌজদারি আদালতের লক-আপ-এ বসে এই সব বার্তা, কি বার্তালা ঝাড়ছিলেন বীরেনদা। পেটি কেস থেকে চুরি ডাকাতি খুন অবধি সব কেসই ওদের কাছে পেটাই কেস-পেটবার মামলা। পলিটিক্যাল আসামী হলে তো কথাই নেই, যদিও সেক্ষেত্রে কখনো-সখনো দোরোখা পেটাপেটিই আবার! জানা গেল ওঁর কথায়।
