নির্ঝঞ্ঝাট নির্ভাবনায় সে কমাস কেটেছিল আমার সত্যি। বরাদ্দ মাইনের বাঁধা চাকরি আমার জীবনে সেই প্রথম আর সেই শেষ।
চন্দননগর গোঁদলপাড়ার প্রাক্তন বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অফিসের দেখা-শোনা করতেন–কর্মকর্তার যা কিছু করণীয় তা তাঁর। প্রুফ দেখা থেকে কাগজ ছাপিয়ে বার করার তাবৎ দায় তাঁর ওপর।
সেদিকে আমার দেখার কিছু ছিল না, আমার দায়িত্ব ছিল লেখার। ডবল ক্রাউন সাইজের আট পাতা (কি ষোল পাতার, ঠিক স্মরণে নেই আমার ) প্রায় সবটাই লিখে ভরতে হতো আমাকেই। বাইরের থেকে যা দু-চারটে লেখা আসত, দেখেশুনে দেওয়া হত, কিন্তু বাকিটা সবই, স্বনামে, বেনামে, ছক্ষনামে বিবিধ ফীচারে লিখে ভরাট করতাম আমি।
এখনকার কালে যেমন, সর্বোপরি একজন সম্পাদকের তাঁবে থাকলেও পত্রিকার বিভিন্ন বিভাগ স্বতন্ত্র লেখকের তদারকে তখনকার দিনে ঠিক এমনটি ছিল না। সব পত্রিকার বেলায় অন্তত নয়।
কোনো কোনো সাপ্তাহিকের পিছনে একটা লেখকগোষ্ঠী থাকলেও, যেমন বিজলীর ছিল, আমার সম্পাদিত কাগজ সর্বদাই তার ব্যতিক্রম। লেখকদের কাছে যাতায়াত, নড়াচড়ার নিরুৎসাহ আমার চিরদিন, তাই আমার কাগজে বাধ্য হয়ে আমিই সর্বময়–আমারই একচ্ছত্র বিধাতার ন্যায় সর্বভূতে বিরাজ করতে গিয়ে সব ভূতের বোঝা-একা আমাকেই বইতে হয়েছে–সব লেখকের লেখার দায় নিজের কাছ থেকেই আদায় করতাম।
এখন, স্বভাবত আমার মজ্জাগত হলেও লেখারা আমার একটু যেন লজ্জাবতী লতার মতই-স্পর্শকাতরতায় সঙ্কুচিত। অপরের সামনে বেরুতে চায় না কিছুতেই। কেউ আমার কাছে থাকলে লেখা হয় না, ত্রিসীমানার আনাচে-কানাচে ঘুরলে-ফিরলে দেখা দেয় না লেখারা। গোলমালের মধ্যে তো নয়ই।
এদিকে চেরি প্রেসের ওপর তলায় বসে তলার আওয়াজে কলমের কাজে মন দেওয়া মুশকিল। মনের অনুবর্তী না হলে কাগজ ভর্তির মালমসলা পাব কোথাথেকে?
নিজের ঘরটিতে বিছানার আরামে শুয়ে বসে গড়িয়ে শিব্রামের যততা লেখা। লেখবার মত মন কোনদিনই আমার হয় না–কোনদিনই নেই তা–যদি না তা মনের মত লেখা হয়। কিন্তু আমার এই অক্ষমতার কথা কি কেউ বুঝবে? বিশেষ করে যাঁরা সর্বক্ষম, সর্বদাম, সব অবস্থাম লিখিয়ে? সর্বপরিবেশক্ষম তাঁদের মতন বেশ লিখিয়ে আমি নই তো-বেশি লিখিয়ে হয়ত হলেও।
যাই হোক, আমার অক্ষমতাজনিত এই ত্রুটি, অফিসবিধিবিরুদ্ধ এই গাফিলতির কথা কেউ হয়ত সুভাষবাবুর কাছে লাগিয়ে থাকবেন। আমি নিয়মিত অফিসে যাই না, দশটা-পাঁচটা কাঠের চেয়ারে ঠায় বসে থাকিনে, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনটিতে প্রেসে দেবার পূর্বক্ষণে আমার সব লেখা গছিয়ে দিয়ে আসি, তারপর সে হপ্তায় আর আমার পাত্তা মেলে না, সেই মাসকাবারে ঠিক তারিখটিতে মাইনে নিতে হাজির হই।
বিধিবদ্ধ কোনো আপিসের আইনে এমনধারা চলে না, একথা আমি মানব। কিন্তু লেখারাও কোনো আইন মেনে চলে না–সে কথাও তো সত্যি? বিশেষ করে আমার লেখারা কোনো ধারারই ধার ধারে না যারা!
অতএব এমন অবস্থায় যা হবার তাই হলো। একদা আত্মশক্তি কার্যালয়ে উপস্থিত হতেই নরেনবাবু সীল-করা কর্পোরেশনের মার্কা মারা একটা লেফাফা আমার হাতে তুলে দিলেন। তার মধ্যে ছিল তিনখানা একশ টাকার নোট আর ছোট্ট একটা চিরকূট; তাতে লেখা-আপনাকে আমাদের আর দরকার নেই। সুভাষ।
বাস্! হয়ে গেল। এক কথায় খতম।
সঠিক বলতে, সে সময়ে আমার মনে একটু ক্ষোভ হয়েছিল সত্যিই। সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে হয়ত একটু অভিমানও হয়ে থাকবে বা (তার পরে আর কখনো তাঁর সমীপস্থ হইনি। কিন্তু আজ সমস্তটা খতিয়ে দেখে মনে হয় না–আমার প্রতি কোনো অবিচার হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র দারুল ডিসিপ্লিনবাদী, চিরদিনই তাঁর এই শৃঙ্খলাবোধ যেমন নিজের বেলায় তেমনি সবার ব্যাপারেই। স্বভাবতই আপিস বিধিবিরুদ্ধ আমার এই ব্যবহার তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না।
তবুও আমার দিকের কথাটা না শুনে পরের কথায় কান দিয়ে তাঁর এই একতরফা ডিক্রি-ডিসমিস আমার একটু যেন কেমনতর ঠেকেছিল সে সময়। তাঁর কাছে ডেকে আমার গাফিলতির কৈফিয়ত তো তিনি চাইতে পারতেন। নিজের সাফাইয়ে আমারও কিছু বলবার থাকতে পারে তো। আপিসে গরহাজির থেকেও তাঁর আত্মশক্তির কাজ তো আমি বাজিয়ে গিয়েছি ঠিকই। আপিসে বসেই লিখি আর ঘরে শুয়েই লিখি-সম্পাদনা কি লেখার কাজে তো কোনো কসুর ছিল না আমার।
তবে চাকরিটা গিয়ে প্রথমটায় একটু মুষড়ে পড়লেও, কহেন কবি কালিদাস-এর কথায় খানিক সান্ত্বনা পাই শেষ পর্যন্ত। সেই যে–নেই তাই খাচ্ছ নইলে কোথায় পেতে। কহেন কবি কালিদাস পথে যেতে যেতে! চাকরিটা এমন করে গেল বলেই না এই বড়ো বড়ো তিনখানা জলছবি হাতের মুঠোয় এলো! জলের মতন উড়িয়ে এখন ফুর্তি করা যাবে দিনকতক!…
সুভাষবাবু একটু কানপাতলা ছিলেন লোকে বলে। জনাব সাহেবের জবান : পরের মুখে ঝাল খাওয়ার অভ্যেস ছিল নাকি তাঁর।
সে কথা আমি বলি না। তবে রাজারা কর্ণেন পশ্যতি বলে একটা আপ্তবাক্য আছে, সেই রাজোচিত মর্যাদা ছিল তাঁর নিশ্চয়।
সে কথা থাক্। আপনি যুগান্তরের গোড়ার কথাটা বললেন, কিন্তু কি করে খতম হল বলেননি তো?
এমন কিছু ঘটা করে নয়। ফুললো আর মরলো-র মন একেবারে হঠাৎ। বেশ চলছিল কাগজ, আমদানিও হচ্ছিল মন্দ না, কিন্তু সেই প্রফুল্লতার মুখেই আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল অকস্মাৎ। একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি ঘরের ভেতর আমার সুটকেসটা নেই। জামাকাপড় খাতাপত্তর টুকিটাকি এটা-ওটা রাখতে মাঝারি সাইজের একটা সুটকেস কিনেছিলাম। কিন্তু বিষয়সম্পত্তি সবার সয় না। যুগান্তরের পুঁজিপাটা টাকাকড়ি অল্পবিস্তর তার ভেতরেই থাকত সব। একেবারে লোপাট।
