.
৬০.
আমার বিষয়কর্মের খবরটা বিস্তারিত হবার পরে সুরেশদার সঙ্গে দেখা একদিন দৈবাৎ। দর্শনমাত্রই তিনি বলেছেন-তুই আমাদের কেন বললি না? আমাদের কাছে এলি না কেন তুই? আমরা তোকে দুহাজার টাকা দিতাম ঐ যুগান্তরের জন্যে।
আমি জানব কি করে যে, আপনারাও চান। শুনে তো আমি অবাক; ঘুণাক্ষরেও কেউ জানায়নি আমায়। কিন্তু আপনাদের তো আনন্দবাজারই রয়েছে, এমন একখানা কাগজের ওপর আরেকখানা দৈনিক বার করতেন নাকি আপনারা?
না। তা করতুম না। নামটা চেপে রাখতুম কেবল। ওই নামের কাগজ অন্য কাউকেও বার করতে দিতুম না।
তাতে কার কী লাভ হতো যে, তার রহস্য আমার অবিদিত থেকে যায়। অবশ্যি, আমার লাভটা ছিল সেন্ট পারসেন্ট-উপরি আরো হাজার টাকার উপায় হত। কিন্তু সেই ক্ষতির হেতু কোনো ক্ষোভ ছিল না আমার-নগদ যা পেয়েছি সেই আমার ঢের-যে-দাওটা মারতে পারতাম, কিন্তু পারিনি, ফসকে গেছে, তার প্রতি কোনো লোভ ছিল না আমার।
বরং আমার মনে হয়েছে অপরের পরিচালনায় চালু হলেও ঐতিহাসিক ওই নামটা তো বেঁচে রইল, সেইটেই যেন বড় কথা। এই সূত্রে অনেক সাংবাদিক আর অসাংবাদিক কর্মী করে খাবেন (কিংবা আমার বন্ধু স্বৰ্গত জ্যোতির্ময় রায়ের ভাষায় না খেয়ে করবেন-যাই হোক না!) তখনকার সাংবাদিকদের জীবন এখনকার মত এমন স্বচ্ছল ছিল না, ছিল সংগ্রামী : বিদেশী শাসকদের সঙ্গে অনবরত সংঘর্ষের, অনিবার্য রাজদন্ডের, ত্যাগব্রতী জীবনাদর্শের : স্বাধীনতার জন্যে যোদ্ধৃবাহিনীর প্রথম সারিতে তারা।
অগ্নিযুগের যুগান্তর অনেক ফাড়াকাটিয়ে লগ্নিযুগে এসে খাড়া হল শেষটায়–রূপান্তর লাভ করে আলাদা চেহারায়। ভেসটে ইন্টারেস্টের চক্রে পড়ে একটা ইনভেস্টমেন্ট হয়ে দাঁড়াল। এই দাস ক্যাপিটালের যুগে ক্যাপিটালের দাস না হয়ে কোন আদর্শই নিছক নিজের জোরে কখনো টেকসই হতে পারে না। সেবা ও শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, ধর্ম ও সংস্কৃতির সংস্থা সব, এমন কি নামজাদা সঘ আর আশ্রমগুলিও যত না! কায়েমী স্বার্থের সঙ্গে জড়িত হয়েই কায়েম হয় শেষ পর্যন্ত। এষাস্য পরমাগতি-অর্থের আগতিটাই পরম। অর্থ না থাকলে কোন কিছুরই যেন কোন অর্থ হয় না।
যুগান্তর তো গেল, কী করবি এবার? শুধালেন সুরেশদা।
এখানে বলা দরকার, আমার যুগান্তরে একটা লেখার জন্য রাজদ্রোহের দায়ে জেল খেটে বেরিয়ে আসার পর, ঠিক পরম্পরায় না হলেও মাঝে মাঝে আমার কাগজখানা বেরুতই। হাতে কিছু পুঁজি এলে এবং নিজের কিছু লেখা পুঞ্জীভূত হলে তার দায় থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে কাগজটা বার করে বসতাম–হুঁজুগের মুখেই অনেকটা। যুগান্তর তখন প্রায় হুজুগান্তর উঠেছিল।
যা হয় করা যাবে। আমি জানাই।–কিছু না করলে কী হয় সুরেশদা?
সত্যি, কিছু যে করতেই হবে তার কী মানে আছে? কোনো কিছু না করেও অনেক কিছু হয়ে যায় আমি দেখেছি। আমার জন্যে পরের যতই দুশ্চিন্তা থাক না, আমার নিজের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কোনোদিনই নয়। অনিশ্চয়তার মধ্যেই চিরদিনের নিশ্চিত আশ্রয় ছিল যেন আমার।
তুই আমাদের আনন্দবাজারে চলে আয় না? আমরা একটা সাপ্তাহিকও বার করব ভেবেছি। তোর তো কলমের জোর আছে বেশ। সুরেশদা বলেন।
অনুবাদের হাতও মন্দ নয়। প্রফুল্লদা সায় দেন তাঁর কথায় : সংবাদ-অনুবাদও কানন যায় ওঁকে দিয়ে।…
যুগান্তকর বাণিজ্যের কালে তুষারবাবুর কাছ থেকেও অনুরূপ আহ্বান এসেছিল। দৈনিক পত্রটার সম্পাদকরূপে আমরা বিবেকানন্দবাবুকে ঠিক করেছি। আনন্দবাজার ছেড়ে দিয়ে তিনি আসছেন। আপনিও আসুন না কেন তার সহকারী হয়ে?… বলেছিলেন তিনি।
কিন্তু দুজায়গাতেই আমি ঘাড় নেড়েছিলাম। স্থায়িত্বের পথে দায়িত্বের পথে এগুবার কোথায় যেন বাধা ছিল আমার। অন্তরগত অনীহায় কোনো ভার বহনের ধার ঘেঁষে যেতে চাইনি কোনোদিনই।
আহা, যদি যেনে, কতো সুখে থাকতেন না আজ। স্ত্রী-পুত্র পরিবার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর, বাড়ি গাড়ি মোটর সোফা-সেট নিয়ে সুখের সংসারে বিরাজ করতেন কেমন!
সুখের সংসার! আমি সেটা মনে করি না। আসলে সুখ হচ্ছে মনের। বিষপানে নীলকণ্ঠের সুখ। বিষয় বিশষে জর্জরিত হয়ে সংসারীর। বিবিধ আধিব্যাধি পীড়িত হয়ে পরের সহানুভূতি লাভে কেউ সুখী, নিরবচ্ছিন্ন শান্তির নির্ঞ্ঝাট স্ব-ভাবে সুখ কারো। নিজের লাভ খতিয়ে হিসেবী মানুষ সুখ পায়, পরের ক্ষতি করে আনন্দ হয় কারো আবার!
সুখের নানান রকম ফের। কিছু হওয়ার, হয়ে ওঠার মধ্যে যেমন সুখ, অনেক কিছু না হওয়ার, না হতে পাওয়ার ভেতরেও আরাম আছে তেমনি। যেমন বেচে থাকার প্রশস্তি, তেমনি বেঁচে যাওয়ার স্বস্তি। মোটের উপর স্বচ্ছন্দ থাকাটাই আমার মতে সুখের।
কারো দুঃখ-সুখের ভাগী না হয়ে শুধু নিজের সামান্য সুখ-দুঃখ নিয়ে একলা থাকার আপনার এই একেলবেঁড়েমির জন্যে দোষ না দিয়ে পারিনে-তবুও জনাব সাহেবের আপসোস–তা হলেও আমি বলব, সিকিউরিটি-বোধের যে একটা স্বস্তি তা আপনি জীবনে পাননি, জানেননি কখনো। মাসকাবারে নির্দিষ্ট একটা তারিখে বাঁধা মাইনেটা পাবার যা আরাম…।
হ্যাঁ, তাও পেয়েছি। তাও জানি। তবে কমাসের বেশি সে-সোয়াস্তি এ-বরাতে জোটেনি। উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তরীণ যাবার কালে তাঁর সাপ্তাহিক আত্মশক্তির দায় সুভাষচন্দ্রের ঘাড়ে চাপিয়ে যান। সুভাষ তখন কর্পোরেশনের চীফ একজিকিউটিভ অফিসার। (আমার ক্রনিক বিস্মৃতিশক্তির জন্য ঘটনার পারম্পর্যে আমার কাহিনী হয়ত ক্রনলজিক্যালি সঠিক হচ্ছে না, যখন যেটা মনে পড়ছে লিখছি, যেভাবে আসছে প্রকাশ পাচ্ছে…তা হলেও যদূর আমার মনে পড়ে, তিনিই তখন এই পৌর সংস্থার কর্ণধার ) দেশবন্ধুর কথায় সুভাষন্দ্র আমাকেই আত্মশক্তির সম্পাদক নিয়োগ করেন–মাসিক একশ টাকায়।
