তা হয়েছিল। কাগজ বিক্রির ফলে তলার থেকেও যেমন কুড়িয়েছি, মেনি ওপর থেকে পাড়বারও কোনো কসুর ছিল না আমার। দেশবন্ধু, বিধানচন্দ্র, শরৎবোস, লিবারেল পার্টির নায়ক যতীন্দ্রনাথ বসু–সবাই লিব্যারলি সাহায্য করেছেন আমায়। এমন কি, কাগজখানা, উঠে যাবার অনেকদিন বাদেও বেশ দুপয়সা দিয়ে গেছে আমাকে।
কেমনতর?
কাগজখানার নাম বেচেই মোটা টাকা উপায় করেছি একবার। তুষারকান্তি ঘোষ, অমৃতবাজার বাদেও তাঁদের সংসার থেকে একখানা বাংলা দৈনিক বার করার ইচ্ছে করেছিলেন- আমি বিবৃত করিঃ
সেই সূত্রেই আমার এই সংস্থানটা হোলো। তিনি পত্রিকাটার যুতসই একটা নাম খুঁজছিলেন। যুগান্তর নামটা সেদিক থেকে বেশ মজবুতসই মনে হোলো তাঁর। কিন্তু বাধা এল আদালতের। আগেকার প্রিন্টার পাবলিশার ছাড়ান না দিলে নয়া ডিক্লেয়ারেশন পাবার উপায় ছিল না। আর, কাগজটার শেষ প্রিন্টার, পাবলিশার, এমন কি সম্পাদকও আমিই ছিলাম একমাত্র। আমার বন্ধু ভবানী মুখোপাধ্যায়ের কাছে খবর পেয়ে, (পরে জেনেছি) তুষারবাবুর দূত আমার বাসায় আবির্ভূত হলেন একদিননগদ পাঁচশো টাকা হাতে নিয়ে। আমার ঐ নামমাত্র বিনিময়ের বাবদেই ঐ টাকাটা আগাম। পরে যেদিন আদালতে গিয়ে রেজিস্ট্রি করে যুগান্তরের নামগন্ধ ছাড়লাম (তার পরে দিগ্বিদিকে ছড়ালামও বলা যায় দৈনন্দিন! পরমৈপদী ভাবেই যদিও) সেদিনও আরো পাঁচশ এসে গেল নগদ!
বলেন কী?
এই সূত্রে তুষারবাবুর দর্শনও পেয়েছিলাম সেই কালে। তিনিও একদিন এসেছিলেন আমার বাসায় সেই উপলক্ষেই। আমি তখন বিছানায় বসে–না, প্রাতরাশ নয়, মধ্যাহ্নের আশ মেটাচ্ছি। চামচেয় করে রাবড়িচূর্ণ খাচ্ছি তখন। চার চামচ নেসপ্রে-র গুঁড়ো দুধের সঙ্গে এক চামচ চিনি মিশিয়ে যা একখান হয় না। ভীম নাগের সন্দেশকেও ছড়িয়ে যায়। জিভের থেকে টা পর্যন্ত–সেই মিষ্টির অণুপরমাণু ওতপ্রোত হয়ে ছড়িয়ে থাকে–সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বানিয়ে একদিন খেয়ে দেখবেন না?
তুষারবাবু পা দিলেন আপনার আস্তানায়?
আস্তাকুড়ও বলা যায়। দেখেছেন তো সেই ঘরজোড়া জঞ্জাল? সেই আস্তাকুড়ে আস্ত এই কুড়ের সামনাসামনি বসলেন আমার বিছানায়। বিছানা ছাড়া বসার কোনো জায়গা তো নেই ঘরে, দেখেননি কি? বসেই তাঁর জিজ্ঞাসা–কী খাচ্ছেন? আজ্ঞে রাবড়িচূর্ণ। গুঁড়ো দুধ চিনি একাধারে মিশিয়ে-খাবেন একটু? তিনি মাথা নাড়লেন। রাজী হলেন না চাখতে। প্রায় হিমালয়তুল্য ব্যক্তিত্ব বলেই হয়ত তাঁর তুষার গলাতে পারিনি। তুষারবাবুর গলা দিয়ে তলাতে পারিনি ঐ জিনিস। খাননি তিনি।
কী বলে তাঁকে ওই অখাদ্য অফার করলেন বলুন তো? আমিও তাই ভাবি এখন। ভেবে অবাক হই। অবশ্যি, ইতুদের কাছে রাবড়িচূর্ণের যে ব্যাখ্যা দিয়েছি, তার কাছে সে ব্যাখ্যান দিতে সাহসী হইনি।–বুঝলি না ইতু? সের পাঁচেক রাবড়ি কিনে আনি, পাঁচখানা থালায় ছড়িয়ে বরাদে শুকোতে দিই–ঠিক আমসত্ত্বর মতই। তারপর সেই রাবড়ি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেলে হামানদিস্তায় তাই গুঁড়ো করে না, বোতলে ভরে রেখেছি। ইচ্ছে হলেই খাই, খাওয়াই। তারা অবিশ্বাস ভরে শুনলেও খেয়ে কিন্তু হতবাক! সত্যি শিব্রামদা, রাবড়ির মতই টেস্ট তো বটে! এমন কি তার চেয়েও খাসা। আমার ভাগনে-ভাগনি, পাড়ার ছেলেমেয়েদের যেই না খেয়েছে তারই দৃঢ় প্রত্যয়, ওই পদ্ধতিতে প্রস্তুত ওটা আসল রাবড়িচূর্ণই।
কিন্তু ঐ রাবড়িচূর্ণ তুষারবাবুকে…তাঁকে ছেলেমানুষের মতই বিবেচনা করে. আপনার স্পর্ধা তো কম নয় মশাই!
কী জানি, ওঁকে দেখে কেমন যেন আমার ছেলেমানুষ বলেই বোধ হয়েছিল–শিশুর মত সহজ সরল মনে হয় না তাঁকে?, শিশুসুলভ একটা আমেজ যেন তাঁর মেজাজের সঙ্গে মাখানো। প্রথম দর্শনের সেই ধারণা তার পরেও তেমনটা টলেনি আমার। সুধীরবাবু বেঁচে থাকতে মৌচাকের আসরে মাঝে মাঝেই তিনি আসতেন তো, অচিন্ত্য, ভবানী, প্রবোধ, প্রেমেন, অনেকেই যেত যেমন, আর তাঁর মুখে কত গল্পও সেখানে বসে শোনা। এমন রসিয়ে গল্প করতে পারেন উনি। তাঁর তুল্য মজলিসী আরেকজনকেই সেই আড্ডায় দেখেছি, প্রবাসীর সম্পাদক কেদার চাটুজ্যেকে। তুষারবাবুর সেই সব বিচিত্র কাহিনীই পরে আরও বিচিত্র কাহিনী হয়ে বই আকারে বেরিয়েছে এখন। আসলে তুষারবাবুর সে-সব বই কিশোরপাঠ্যই। তাছাড়া, তাছাড়া
তাছাড়া?
তাছাড়া, সেই প্রথম দর্শনের দিনই আমাকে জানিয়েছিলেন যে, আমার ছেলেদের লেখার তিনি নিয়মিত পাঠক। আমার ওই সব লেখাই ভালো লাগে তার। আমার অনেক ছোটদের বই তিনি কিনেছেনও নাকি। এমন কি, মৌচাকের পৃষ্টায় আমার সব প্রথমের-ঘোভার বেগুনি খাওয়ার গল্পটাও–তিনি হুবহু শুনিয়ে দিলেন আমাকে। আরো জানালেন যে তিনি ওই ছোটদের বই পড়তেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। স্বাভাবিক কৈশোরের একটা সৌরভ তাঁর দেহমনে যেন উচ্ছ্বসিত, তাই তাঁকে বালক জ্ঞান করে দ্রুপ আচরণ করা স্বভাবতই সহজ হয়েছিল আমার পক্ষে। তাহলেও, আপনি যা বললেন না, এখন সেটা ভাবতে গেলে বিস্ময় লাগে বইকি। মাহাত্ম শিশিরকুমারের বংশধর, তুষারবাবুর নিজের মহাত্মও কিছু কম নয়, তাঁকে ওই রাবড়িচূর্ণের আতিথ্যে আপ্যায়িত করতে যাওয়া স্পর্ধার চূড়ান্তই বটে। কিন্তু আমার স্বভাবসিদ্ধ যে হঠকারিতায় অগ্নিযুগের যুগান্তরকে আমার ভগ্নিযুগে আমদানি করেছিলাম, ওটাও সেই যুগান্তকারী হঠকারিতারই আর এক নিদর্শন। হঠতর যত কারুকার্য আমার জীবনে প্রতি পদেই–প্রতি পদেই।
