বীরেন্দ্রকুমার সেন থাকতেন, আগেই বলেছি। তার মা বিরজাসুন্দরী দেবীও মাঝে মাঝে এসে থেকেছেন ছেলের কাছে–সেই সূত্রে নজরুলেরও যাতাযাত ছিল। বীরেনদার বোনের সঙ্গেই পরে নজরুলের বিয়ে হয়েছিল। সে তো এখন ইতিহাস–সবার জানার কথা। ছান্দসিক প্রবোধ সেনও একবার এসেছিলেন মনে হয়, দুএকদিন থেকেছিলেন আমাদের বাসায়। রবীন্দ্রনাথের ছন্দের উপরে প্রবন্ধ লিখে তখনই উনি বেশ নাম করেছেন। গিরিজা ছিল তাঁর বন্ধু, তার আমন্ত্রণেই তিনি এসেছিলেন। দুজনের ভেতর লম্বা লম্বা চিঠিপত্রের আদান-প্রদান চলত। সেগুলি চিঠি কি গল্প কি বিতর্কমূলক গবেষণা আমি জানি না। প্রবোধবাবু যুগান্তরে লিখেছিলেন কিনা মনে পড়ে না। তখনই তাঁর লেখার বেশ কদর হয়েছিল, প্রবাসীতে লিখে টাকা পেতেন তখনই। তাই আমাদের কাগজে বেগার লিখতে যাবেন বলে মনে হয় না।
নজরুলের ধূমকেতু কি তখনকার কাগজ না? কেমন চলত ধূমকেতু?
দারুণ। বিশ পঁচিশ হাজার কপি বিকিয়ে যেত বাজারে পড়তে না পড়তেই। সময়ের মতন কাগজটাও ছিল গরম। সে সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ঐ ধূমকেতু-সবার চেয়ে বেশি চাহিদা ছিল তার। তাছাড়া, বারীনদা নলিনীদাদের বিজলী, উপেনদার আত্মশক্তি, আর শঙ্খ বলেও একটা যেন কাগজ বেরুত তখন, কাদের জানি না। সমসাময়িক সাপ্তাহিক সব। সাপ্তাহিক পত্রের যেন জোয়ার এসেছিল সে-সময়টায়।
সেই জোয়ারেই আপনারা গা ভাসিয়েছিলেন সবাই?
আমার বেলায় অনেকটা তাই, আপনি বলতে পারেন। নজরুলের বেলা তা নয়, ওর একটা মিশন ছিল না? বিপ্লবার্তা ঘোষণার? সে যেমন কবি তেমনি এক যুগন্ধর নেতাও যে আবার। আর, বিজলী ছিল এক অভিজাত পত্রিকা। বীরবল, পন্ডিচেরির নলিনী গুপ্ত, সুরেশ চক্রবর্তী প্রমুখ জাতলিখিয়েরা লিখতেন তাতে। নলিনীদার দারশ খাতির ছিল সাহিত্য সমাজে–এমন চমৎকার হাসির গান গাইতেন তিনি, আবার বানাতেও পারতেন তিনি। দাঠাকুরের (শরৎ পন্ডিতমশাই কলকাতার ভুলে ভরা গানখানা তাঁর গলার থেকে তো চালু হয়ে যায়। রবীন্দ্রজয়ভীর কালে অমল হোমকে নিয়ে তার রচিত গানটাও বাজার মাত করেছিল। চমৎকার গানখানা, কিন্তু তার এক লাইনও আমার মনে নেই-যা আমার বিস্মৃতিশক্তি না।
ধূমকেতুর সঙ্গে আপনার যুগান্তরের তফাতটা ছিল কোথায়?
নজরুলের লেখায় খোলাখুলি রাজদ্রোহের কথা থাকত। বিপ্লবের প্রেরণায় ভরা। তবে কবি তো সে, উপমা-ইঙ্গিতের আড়ালে তার বক্তব্যটা প্রকাশ পেত স্বভাবতই। আইনের প্যাঁচে তার নাগাল পাওয়া সহজ ছিল না। যেমন ধরুন না–ধূমকেতুতে বেরুনো দুঃশাসনের রক্ত চাই বলে বিখ্যাত কবিতাটা। বন্দুরে বন্য হিংস্র বীরদুঃশাসনের চাই রুধির/চাই রুধির রক্ত চাইঘোষো দিকে দিকে এই কথাইদুঃশাসনের রক্ত চাই/দুঃশাসনের রক্ত চাই/ওরে, এ যে সেই দুঃশাসন/দিলো শত বীরে নির্বাসন/কচি শিশু বেঁধে বেত্রাঘাত/করেছে রে এই ক্রুর স্যাঙা/মা বোনেদের হরেছে লাজদিনের আলোকে এই পিশাচ/বুক ফেটে চোখে জল আসে/তারে ক্ষমা করা ভীরুতা সেহিংসাশী মোরা মাংসাশী/ভন্ডামি ভালো বাসাবাসি। এমনি পড়লে মনে হবে যে মহাভারতের উল্লেখ-কাহিনী, কিন্তু আসল অর্থটা কী, পাঠকের তা বোঝার কিছু বাকী থাকবে না। বাংলার উদ্ধত যৌবন তখন কাজীর কবিতায় উন্মত্ত হয়েছিল। কিন্তু এহেন অর্থের দ্বিত্ব থাকা সত্ত্বেও সরকারের দ্বিধা বেশিদিন থাকেনি। আইনের পাকে অচিরেই পড়তে হয়েছিল নজরুলকে। জেল হয়েছিল দুবছরের জন্য। কারাবরণের আগে আদালতে তার আত্মসমর্থনে যে কবুলতি সে দেয়, সেই রাজবন্দীর জবানবন্দী অবিস্মরণীয় এক দলিল।
আপনার যুগান্তরের প্রেরণাটা কী ছিল?
রাজদ্রোহ নয় ঠিক। সমাজদ্রোহ বলা হয়ত যায়। আমাদের কালের সমাজ-ব্যবস্থায় যে সব অবিচার অনাচার অত্যাচার মনে প্রচন্ড নাড়া দিত, তার বিরুদ্ধেই আমি কলম ধরেছিলাম। ইংরাজের শাসন আমায় তেমন পীড়িত করেনি, যাকে বলে Social injustice সেই সব–যেমন অবাহ্মণদের ওপরে বামুনদের অত্যাচার, প্রজাদের ওপরে জমিদারের শোষণপেষণ–এই সবেই আমি বেশি অভিভূত হয়েছিলাম। সমাজবাদের ধুমধাড়াক্কা তখনো তেমনটা পড়েনি, সোভিয়েট মুল্লুকে সমাজতন্ত্র পত্তনের নামগন্ধ বাতাসে ভাসছিল, ঘুনাক্ষরের বার্তায় আসছিল–শুধু তারই সুদূর হাতছানি কাউকে কাউকে যেন কেমন উন্মনা করছে সে সময়। যার আবহে মনে হয়, প্রেমেন লিখেছিল, আমি কবি যত কামারের/কুমোরের/যত ছুতোরের আর ইতরের/ইতাদি (মিস-কোটেশন হয়ে গেল হয়ত বা! যে মেমারি!) প্রত্যাসন্ন যুগের সেই সম্ভাবনার আবছায়াতেই আমার সে সময়ের লেখা যত না। পরে সেই সব ভাব-ভাবনাই ফলাও করে প্রবন্ধাকারে আমি ফলিয়েছি তারানাথ রায় সম্পাদিত নবশক্তির পাতায়–যা পরে আমার মস্কো বনাম পন্ডিচেরি আর ফানুসফাটাই–এই দুই নিবন্ধ বইয়ে প্রকাশ পেয়েছে। কাজীকেও এই পথে আসতে হয়েছিল শেষপর্যন্ত–তার সাম্যের গান কবিতায় যার পরাকাষ্ঠা দেখা যায়। তবে কাজী ছিল আসলে জন্মবিদ্রোহী-তার সেই সর্বপ্রথম কবিতার মতই কায়মনোবাক্যে সর্বদাই বিদ্রোহী সে। এমন কি তার ফাউন্টেন পেনের কালিও ছিল লাল। রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা/ তাই লিখে যাই এ রক্তলেখা/তার কোন কবিতার কোথায় যেন আছে না?
তা যুগান্তর পত্রিকাটির থেকে বেশ উপায় হয়েছিল আপনার? তাই না?
