আর তিনিও মিশতে পারতেন সহজভাবেই। সাহিত্যিক-সুলভ কোনো ব্যবধান না রেখেই। বড় কঠিন সাধনা যার বড় সহজ সুর। খুব কঠিন জীবনসাধনার জন্যই শরৎচন্দ্র তাঁর জীবনে অত সহজ হতে পেরেছিলেন আমার মনে হয়। কেবল অভ্রভেদী লেখক বলেই নয়, সাধারণ স্তরের মানুষদের সঙ্গে অত সাধারণের মতই মিশতে পারতেন বলেই তিনি অসাধারণ।
আর, তেমনি আশ্চর্য মানুষ ছিলেন উপেনদা। কলমের আঁচড়ে যেমনটি, ব্যবহারে আচরণেও ঠিক তেমনিই–যত সহজ ততই যেন গভীর। তাঁর লেখার মতই তিনিও অবিকল মিলিয়ে দেখা যেত। বিজলীর পাতায় তাঁর উনপঞ্চাশীর যে হাওয়া তিনি বইয়ে দিয়েছেন, সেই আবহাওয়াতেই সত্যি বলতে শুধু আমি কেন, অনেকেই তখন বয়ে গেছেন। বাংলা সাহিত্যের ব্যঙ্গ রচনায় হালকা চালে গভীর কথা বলার যে ধারাটি তিনি সূত্রপাত করেছিলেন, সেখানে শুধু তিনি অগ্রগণ্যই নন, অনন্য আজও।
গিরিজা কিন্তু এর মধ্যেই অনেকের সঙ্গে ভাব জমিয়েছিল বেশ। দেশবন্ধু, সুভাষচন্দ্র, বিন রায়, শরৎ বোস–এহেন উচ্চস্তরের মানুষদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারলেও মাঝামাঝি এলাকায় আমি যেন বেখাপ্লাই ছিলাম-সেখানে আমার কোনো পাত্তা ছিল না। উচ্চলোকের পরেই মিশবার পাত্ররা আমার তুচ্ছলোকে–পাড়ার যত ছোট লোক (তারা তা না হলেও তাই বলে আমরা ভাবি যাদের ) আর ছোট ছোট বালকরা। তাদের সঙ্গই আমার মিষ্টি লাগত–আর তাদের সঙ্গেই মিশ খেতাম সহজে।
মধ্যবর্তী স্তরের স্কলারলি উন্নাসিক পণ্ডিতম্মন্যদের কাছে খাতির ছিল গিরিজার। তাঁদের সঙ্গে উচ্চমার্গের আলোচনা বিতর্কে উৎসাহিত ছিল সে, যেটা আমি সতর্কভাবে সবসময়ই এড়িয়ে চলতাম। হয়ত, তাবচ্চ শোভতে…হিসেব করেই নিজের শোভা বজায় রাখতে চাইতাম ঐভাবে।
কিংবা উত্তম পুরুষ হিসেবে (নিজের ধারণায় নয়, ব্যাকরণ মতে ) শুধু পুরুষোত্তমদের সঙ্গে যা একটু খাপ খেত আমার–মধ্যপদস্থরা মধ্যপদী সমাসের মতই একেবারে লু ছিল আমার কাছে। আর, তাঁদের কাছে আমি যেন ছিলামই না। উচ্চরা আমাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেননি, হয়ত তাঁদের সমুচ্চ মহানুভবতায়, কিন্তু মধ্যবর্তীরা সর্বদাই আমায় এড়িয়ে চলেছেন। কারণ বোধ হয়, উত্তম নির্ভয়ে চলে অধমের সাথে। তিনিই মধ্যম যিনি থাকেন তফাতে। মাঝারিদের বাজারে এই অধমের কোনো কলকে ছিন না।
.
৫৯.
তখনকার দিনে কাগজ বের করা এমন কিছু শক্ত ছিল না। চাইলেই ডিক্লেয়ারেশন মিলত, হিল্লি-দিল্লি দৌড়-ঝাঁপের মুশকিল ছিল না এখনকার মত। কাগজ ছিল সস্তা, কম পাউন্ডেজের ডবোল ডিমাইয়ের রীম বোধকরি দশ টাকাতেই পাওয়া যেত, ছাপাই খরচাও ছিল প্রায় তেমনই।
দশ টাকায় ফর্মা। ডবোল ডিমাই আট পাতার কাগজ পাঁচ হাজার ছাপতে পঞ্চাশ ষাট টাকার বেশি পড়ত না। কাগজের দামও প্রায় তাই।
কাগজটা কিনতে হত নগদ। প্রিন্টিং বাবদ যা দেবার কাগজ বেচে দিলেই চলত। যেখানে বিজলী, আত্মশক্তি প্রভৃতি ছাপা হত, বউবাজারে সেই চেরী প্রেসেই আমরা ছাপাতাম।
ছাপাখানাটা ছিল পাইকপাড়ার কুমার অরুণ সিংহের। এমনিই পড়েছিল নাকি, বারীনদারা আন্দামানের থেকে ফিরে এসে কাগজ বার করতে চাইলে অরুণবাবুরা অনিই সেটা তাঁদের ছেড়ে দেন-ব্যবহারের জন্য।
ছাপাখানাটা চালাতেন ঋষিদা-ঋষিকেশ কাঞ্জিলাল-আন্দামান-ফেরত তিনিও। যেমন নামে, তেমনি চেহারায়, তেমনি কিনা আচারে আচরণে প্রায় ঋষিতুল্য, তিনি অনেক সুযোগ সুবিধে দিতেন আমাদের।
আর সুবিধে পেয়েছি শ্ৰীপাতিরামের কাছে। বিখ্যাত পত্রিকাদের সুবিখ্যাত এজেন্ট-বেচবার আগেই সাতষট্টি পারসেন্ট দাম দিয়ে দিত নগদ আর কাগজও বেচে দিত অবলীলায়। শিবরামের কাগজ পাতিরাম কাটাতেন। পোকারা কাটবার ফুরসত পেত না।
এক আনা করে দাম ছিল একখানার। শতকরা তেত্রিশের কমিশন বাদেও প্রায় দুশ টাকার মতন উপায় হত হপ্তায়। তার একশ টাকাই নেট লাভ।
কী করতেন টাকাটায়? জনাব সাহেবের জিজ্ঞাসা।
পরের হপ্তায় ছাপা কাগজের দামটাম মজুদ রাখতাম।…
আর বাকী টাকার কী গতি করতেন? কী হতো?
আমার গর্ভে যেত। খেয়েদেয়ে ফুঁকে দিতাম সব। গিরিজা কিছু নিত বোধ হয়। আর কাউকে বিশেষ কিছু দিতে হত না।
রাজেন মল্লিকের লঙ্গরখানা ছেড়ে দিয়েছিলেন নাকি?
বাসাতেই খানা পাকত যে তখন। তদ্দিনে মোস আমাদের জমজমাট। তারকা তাঁর চেনাজানাদের নিয়ে এসে বাসাটা চালু করে দিয়েছিলেন–তিনি নিজেও মাঝে মাঝে এসে থাকলে তো। যদ্দিন ইচ্ছে খুশি মতন। সেকালে বাসা-খরচাও বিশেষ কিছু পড়ত না। সস্তার বাজার ছিল তো তখন।
তেমন নামকরা কেউ ছিল আপনাদের বাসায়?
তখন বিনামা, পরে তাঁদের কেউ কেউ বেশ নাম করেছেন বইকি। তখনই খুব নামকরা দুজনা ছিলেন অবশ্যি
একজন বিখ্যাত ধ্রুপদ-গাইয়ে ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (এখন স্বত), অপরজন নামজাদা খেলোয়াড় সূর্য চক্রবর্তী-ইস্টবেঙ্গলে খেললে সেকালে–তাঁরা দুজন আমার দুপাশের ঘরে থাকতেন আর থাকতেন সতীশন্দ্র সরকার, বগুড়ার কংগ্রেসী নেতা, কর্পোরেশন না কোথায় কাজ করতেন যেন। আর ছিলেন প্রসিদ্ধ গবেষক প্রাবন্ধিক বাংলার বাউলের লেখক উপেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য-তখন তিনি বিদ্যাসাগরের ছাত্র। আর থাকতেন স্বৰ্গত তারানাথ রায়। প্রাক্তন বিপ্লবী। পরে ইনি নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। তার পরে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন দৈনিক বসুমতীর সঙ্গে। উপন্যাস ইত্যাদি লিখেছেন।
