আপনার বা আপনার মার–যাই হোক না, আপনাদের মোদ্দা কথাটা মোটামুটি বুঝলাম। কিন্তু সেকথা নয়, কাগজের হকারির থেকে কি করে সম্পাদকারিতে উতরে এলেন, আপনার কাগজই বা ওরালো কেমন–সেই কথাটা কম।
আমি আর ওতরালাম কোথায়! আমি জীবনের কোনো পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হতে পারিনি, পাশ না করে সব কটারই পাশ কাটিয়েছি। তবে হ্যাঁ, কাগজটা উতরেছিল বেশ। সেটা আমার কোনো বাহাদুরি নয়, তার নাম-মাহাত্ম-ঐ যুগান্তর নামটাই।
নামটা মাথায় এল কী করে শুধোচ্ছেন? হঠাতের মাথায়। কাগজ ফিরি করতে করতেই মাথার পোকারা নড়ল একদিন–আমার মনে হলো, এই চিনির বলদ হয়ে কী লাভ? চিনির আসল সোয়াদ তো পাচ্ছিনে। পরের ভূতের বোঝা না বয়ে নিজেই যদি কাগজ একখানা বার করি তো কেমন হয়? চিনির মোট বওয়ার চেয়ে চিনি পয়দা করার ফয়দা আরো বেশি হবে নিশ্চয়? আর তার মোট নিজে না হেঁকে ফিরে অন্য ফিরিওলা হকারদের দিয়ে বেচলে মোটামুটি দু-পয়সা উপায় হতে পারে হয়ত।
কাবুলির সেই একশো পঁয়ত্রিশ টাকার পুঁজি সম্বল করে একশো চৌত্রিশ নম্বর থেকে যুগান্তর বেরুল–আমার ঘরের বিছানাটাই তার কার্যালয়। পরে এই কাগজকে দেশবন্ধুর থেকে বিধান রায় পর্যন্ত অনেকেই অর্থ সাহায্য করেছেন, তবে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছি ঐ নামটার কাছেই।
হ্যাঁ, তারই কুদরতে প্রথম সংখ্যার পাঁচ হাজার কপি বাজারে পড়তে না পড়তেই উড়ে গেছল। যুগান্তর-নামখানাই অর্ধেক কাজ এগিয়ে রেখেছিল, আর সময়টা ছিল তো অগ্নিগর্ভ। বেরুতে না বেরুতেই আমি বিখ্যাত হয়েছিলাম। রাতারাতি।
কাগজের কাজে কৈশোর কালের বন্ধু গিরিজাকে আমার সহযোগী পেয়েছিলাম। জিলা স্কুলের থেকে চাঁচলের ইস্কুলে পড়তে আসার সময় থেকেই ওর সঙ্গে ভাব আমার। এন্ট্রেন্স দিয়ে আমাদের মেসেই এসে উঠেছিল সে, কলেজে ভর্তি হবার আগেটায়। এখন একখানা কাগজ বেরুতে দেখে আপনার থেকেই সে এগিয়ে এল। আর সে-ই নিয়ে এল বীরেন্দ্রকুমার সেনকে যুগান্তরের যুগ্ম-সম্পাদক করে। নামমাত্র সম্পাদক। গিরিজা আমাকে বুঝিয়েছিল যে, বীরেনদা লিখিয়ে বলে বেশ নাম আছে বাজারে, আর খাতির আছে লেখক মহলে; সম্পাদকের স্থলে তাঁর নামটা আমার সঙ্গে থাকলে কাগজের মর্যাদা হবে। তাই হোলো। গিরিজা হোলো কাগজের প্রিন্টার পাবলিশার। চুটকি লেখারাই আমার সব রচনার চেয়ে (পাঠকের চোখে অন্তত ) চটকদার হয়ে বৈতরণী-উত্তরণের আগে পর্যন্ত তরিয়ে দেবে আমায়। ওই চড়াই পাখির পাখায় ভর দিয়েই জীবনের যত চড়াই উত্নাই সব উতরে যাব অবহেলায়, তা আমি ধারণাও করতে পারিনি।
কী থাকত কাগজে? যা যা দস্তুর। প্রথম পাতাতেই একটা কবিতা–একটু গরম গরম। তারপরে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় ও সম্পাদকের মন্তব্য, তারপর গল্প-টল্প এক আধটু, অনেকটা রূপকগর্ভ কথিকা জাতীয়, বিজলীতে উপেনদার উনপঞ্চাশীর মত একটু পলিটিক্যাল রসরচনা (উপেনদার লেখা সেকালে আমায় প্রভাবিত করেছে গোড়াতেই বলেছি) আর টুকরো খবরের ওপর টিপ্পনির চুটকি-কলম দুয়েক। এখনকার অল্পবিস্তরের প্রথম ক্রুশ সেটাই। যখন ধ্ৰুণাক্ষরে ঐগুলি লিখেছিলাম তখন কি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পেরেছি, যে, শেষ পর্যন্ত ঐ চুটকি লেখারাই আমার সব রচনার চেয়ে (পাঠকের চোখে অন্তত), চটকদার হয়ে বৈতরণী-উত্তরণের আগে পর্যন্ত তরিয়ে দেবে আমায়। ওই চড়াই পাখির পাখায় ভর দিয়েই জীবনের যত চড়াই উৎরাই সব উৎরে যাব অবহেলায়!
কে লিখতেন আমাদের যুগান্তরে? যুগান্তকারী কোনো লেখক নয়। কে যাবে তাঁদের কাছে? গায়ে পড়ে কারো সঙ্গে ভাব জমানোর স্বভাব ছিল না আদৌ, একটু মুখচোরা, সেইহেতুই অমিশুক ছিলাম বোধহয়। তখন লেখার জন্য কোনো স্বনামধন্য লেখককেও টাকা দিতে হত না, একটু সাধাসাধি করলেই হত–কিন্তু সাধ্যসাধনার ধাত ছিল না যে। প্রমথ চৌধুরি সাপ্তাহিক বিজলীতে নিয়মিত বীরবলের চিঠি লিখতেন, তাঁর কাছে গিয়ে চাইলেই হত। লেখক হিসেবে তত দিনে আমি তাঁর কাছেও পরিচিত হয়েছিলাম মনে হয়। একবার বিজলীতে, তাঁর পৃষ্ঠায়, যুগান্তরের আমার চুটকিগুলির তারিফ করে তিনি লিখেছিলেন। তবু, এমনকি, ধন্যবাদ জানাবার হলেও তাঁর কাছে যাবার আমার সাহস হয়নি, উৎসাহও বোধ করিনি, কেন জানি না।
বড় লেখক বলতে আলাপ হয়েছিল শুধু শরৎ চাটুজ্যের সঙ্গে। আর উপেন বাঁড়ুজ্যে আমাদের উপেনদা তো ছিলেনই। এই দুজনাই কেবল–তখন পর্যন্ত।
শরৎচন্দ্রের কাছে নিয়ে গেছলেন আমায় তারকা। তাঁর লেখা একটা উপন্যাসের প্রকাশক পাবার দরবারে। ভূমিকার মত দু-ছত্র লিখে দিলে প্রকাশক মহলে যদি লেখাটার দর বাড়ে। পড়ে দেখবেন, তারপরে লিখবেন বলে পাণ্ডুলিপিটা তিনি রেখে দিলেন। বিপ্লবীদের প্রতি শরৎচন্দ্রের শুধু স্নেহ নয়, অন্তরের টানও ছিল মনে হয়।
শরৎচন্দ্রের সম্মুখীন হতে আমি ভয় খাইনি, স্বাভাবিক আকর্ষণেই গেছি। শরৎচন্দ্রের লেখা পড়লেই তাঁকে কেমন দরদী আপনজন বলে মনে হয় না? যেমন তার রচনার পাত্রপাত্রীদের সঙ্গে তেমনি যেন তাঁর পাঠকদের সঙ্গেও তিনি একাত্ম হয়ে যেতেন–তাঁর ঐকান্তিকতা সংক্রামকই ছিল। তাঁর লেখার আয়নায় পাত্রপাত্রীদের মনস্বত্বমোচনের প্রত্যক্ষ প্রতিফলনে তাঁর নিজের মনটিও ধরে দিতেন যেন, সেই লেখার সংস্পর্শে এলে, তাঁর মনের স্পর্শ পেলে পাঠকপাঠিকারা তাঁর আপনার হয়ে যেত নিজের অগোচরেই কেমন করে যেন। তাঁকে নিজের একান্ত বলেই মনে করত তখন। সহজভাবে তাঁর সঙ্গে মেশার কোনো বাধা থাকত না আর।
