মা-কালী বা বাবা কাবুলিওলা–যার প্রেরণাতেই হোক না, প্রেরণা বা ঠেলা যাই বলুন এই মেলাই গল্প–এত গল্পের মেলা–এ কীর্তিও কিছু কম নয় মশাই! কালী কমলিওলার কথা শুনেছিলাম, কিন্তু কালী কাবুলিওলার দৌলতে যা কাভটা আপনি বাধালেন না?
এমন কিছু মহৎ সৃষ্টি নয়, আমি মানব। তেমন কিছু করতে পারিনি জানি আমি। সেটা মার দিকের কোনো গলদ নয়, আমার দিকেই বলহীনতা। নয়মাত্মা বলহীনেন লভ্য, জানেন তো? মহাকালের বৃত্তে, স্বয়ং শিবকে বৃত্ত করে যিনি মুহূর্তে মুহূর্তে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করছেন আমার ন্যায় অক্ষমের সামান্য বৃত্তে এসে যৎকিঞ্চিৎ বৃত্তির পরিধিতে তিনি আর এর বেশি কী করবেন। বৃত্তই তো আধার–যেমন আধার তেমনটি হবার, বলতেন না ঠাকুর? কল্পতরুর কান্ডে যাঁর অসামান্য ফলসম্ভার, সামান্য ঘেঁটুগাছের ডগায় এসে তাঁর তেমনি ধারাই সাফল্য হবে তো। গুল্মকে তো আর বনস্পতি বানানো যায় না। কাঁটা গাছের বাদাড়ে ফুল নয়, কাঁটাই ফুটবার। আমার ভাগ্যে যা জুটেছে তাতেই আমি প্রফুল্ল। মহাকালের বক্ষে যিনি মহাকালী, আমার মতন মাকালদের পক্ষে তিনিই মাকালী।
.
৫৮.
আমি ভগবান-ফগমান মানি না…
আমিও না…
ভগবান কিছু করতে পারে আমার বিশ্বাস হয় না। যা কিছু করার মানুষই করছে, মানুষই করবে।…
আমারও তাই মত। আমি প্ৰকাশ করি-ভগবান যে মানুষ করে ছেড়ে দিয়েছে সেই ঢের। এখন আমাদের চরে খাওয়া উচিত।
মানুষের ব্যাপারে ভগবানের কিছু করণীয় আছে আমার মনে হয় না। মানুষই নিজের ভালোমন্দ সব করছে, আর সে-ই করতে পারে। এ বিষয়ে ভগবানের কোনো হাত নেই।
ভগবানও সেই কথাই বলতে চান, আমি মনে করি।
ভগবানের মনের কথা টের পান আপনি? তাঁর উক্তিতে বক্তৃতার কটাক্ষ।
তা কি করে পাব? কেউ পায় নাকি? পেয়েছে কেউ কখনো? তবে এই আমার মনে হয়। ভগবান নিজেই কি একথা বলে দেননি?
কোথায়? গীতায়? জনাব সাহেবের জিজ্ঞাসা।
গীতায় কেন? গীতার ভাষ্য ছাড়া তাঁর বক্তব্য কি আর কোথাও প্রকাশ্য হয়নি? সর্বজনবোধ্য ভাষাতেই তিনি কত রকমেই তো সেকথা প্রকাশ করেছেন…
কী রকমের ভাষাটা? শুনি তো!
কবিসুলভ ভাষায়। ভগবান আসলে কবিই তো। কবি ছাড়া আর কী? আদি কবি আমাদের।
এই বিশ্বসৃষ্টি তাঁর কবিতা, এই কথা বলছেন?
না না, সে কথা নয়। এটা তাঁর লীলা কি কবিতা তার তত্ত্ব কে জানে! না, সে কথা বলছিনে। কবির একটা অর্থ হচ্ছে স্রষ্টা, অতএব স্বয়ং স্রষ্টাও কবিই। কবি হতে বাধ্য। অভিধান মতে কবিই। অর্থাৎ তাই দাঁড়ায়। কিন্তু কথা হচ্ছে এই যে, সেই আদি কবিও আমাদের আধুনিক কবিদের মতই প্রতীকী ভাষায় কথা কন।
যেমন?…তিনি দৃষ্টান্তর মুখাপেক্ষী।
যেমন আপনি বললেন না, ভগবানের কোন ব্যাপারেই কিছু হাত নেই–বললেন না? সাক্ষাৎ জগন্নাথরূপে ঠিক সেই কথাটিই কি তিনি বাতলাননি ঐ প্রতীকী ভাষায়? কিংবা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে–যাই বলুন।
ঐ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে?
হাতের দিকে তিনি শূন্য। যেমন হাতে শূন্য তেমনি তিনি শূন্যহস্তই। তাঁর হাতেও কাউকে দেবার কিছু নেই। যা পাবার তা আমাদের অর্জন করে নিতে হবে, উপার্জন করে পেতে হবে। তার কোনো ভুল নেই মশাই! তবে কিনা…
তবে কিনা?
তবে কিনা সেই শূন্যতার থেকেই সমস্ত আসে, সব কিছু মেলে যে! সেই শূন্য হাতই আমাদের দু-হাত পূর্ণ করে দিতে পারে…দেয়, বুঝি বারে বারে…স্বতোৎসারে। সেই শূন্যের থেকেই আসে পূর্ণতা, শূন্যতা হেঁকেই সব পাই। তার কাছে কিছু চাইতে হয় না, না চাইতেই পাওয়া যায়। কেন্দ্রবিন্দুর সেই পরম শূন্যের দিকে, মানে কেন্দ্রমূলে মন নিয়ে সেই শূন্যের দিকে উন্মুখ থেকে নিজের পথে এগুলেই পদে পদে পেয়ে যাই, হাতে হাতে মিলে যায় সব।
শূন্যের দিকে মন দেয়া যায় কি করে শুনি? জনাবের জিজ্ঞাসা।
মনকে শূন্য করেই। শূন্যমনা হয়ে যদি মনোবৃত্তির সাধনায় লাগি, প্রবৃত্তির পথ ধরি, সেই শূন্যচিত্তের থেকেই নিত্য নব অমৃতায়ন। তাঁর সঙ্গে সংযোগই হচ্ছে অমৃত, আর তাঁর হাত ধরে যাওয়াটাই সার্থক যাত্রা।
তা না হয় হোলো, কিন্তু তাঁর এইসব প্রতীকী রূপ?…
তাঁর প্রকৃতির পরিচয় ছাড়া কিছু নয়। তাঁর প্রকৃতিরই প্রতিকৃতি। জীবনের দশ দশার বৃত্তে আমাদের সঙ্গে তিনি নিত্য বিদ্যমান। সেই সব বৃত্তিপথে তাঁর যে চেহারা, তাঁর থেকে যা প্রাপ্তিযোগ, সেই কথাই তো দশমহাবিদ্যার রূপে প্রকাশিত। আসলে মার এই প্রতীক-কৃতিই প্রতাঁকের সাহায্যে বলার ধরনটা আমাদের চলার সাহায্যে তাঁর পথনির্দেশ মাত্র।
কী পথ? কিসের নির্দেশ?
বৃত্তপথ। আমাদের বৃত্তির পথ। তাঁর ঐ প্রতীকী মহাবিদ্যার রূপগুলিকে সেই পথের ম্যাপ বলে ধরতে পারেন। ওগুলি যেমন তাঁর হওয়া তেমনি তাঁর সঙ্গে আমাদেরও হওয়া তো-পরস্পরের সহাবস্থান-কোএকজিসটেস্। কোএকজিস্টেনসিয়ালিজমও বলা যায়। পরস্পরের আবহাওয়ায় পরস্পরের সব হওয়া। পরস্পরের প্রতিক্রিয়ার প্রতীক-কৃতিই মার ওই প্রতিকৃতিগুলিতে বিচিত্র বিদ্যমানতার বিভিন্ন বিকাশে প্রকাশিত।
তার সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক?
বৃন্তের সঙ্গে ফলের যেমনটা। বৃত্তের সঙ্গে বৃত্তির যেমন কিনা অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। আমরা যেমন বৃত্তে যাব, যা বৃত্তি বেছে নেব, তার ফল কী রকমটি হবার, তাঁর বিদ্যারূপের ঐ প্রতীকী আবৃত্তির দ্বারাই বিশদ করা রয়েছে। সত্যি বলতে, তিনিই তো সব হয়েছেন, সব কিছু করছেন–কিন্তু আমাদের বাদ দিয়ে নয়। আমরাও যা কিছু করছি, তাঁকে বাদ দিয়ে নয়। দেবার উপায় নেই। পরস্পরের মুখাপেক্ষী আমরা। তাঁর হওয়াতেই আমাদের হয়ে যাওয়া, তাঁর হওয়ায় আমাদের বয়ে যাওয়া। তাঁরই বৃত্তপথে আমাদের বৃত্তিরথ চালিয়ে–তাঁর হাত ধরে অবাধে অবলীলায় আমাদের উতরে যাওয়া। সেই উত্তরণ যেমন তাঁর তেমনি আমাদেরও।
