প্রথম কোথা থেকে টাকা পান আপনি লেখার জন্য?
মৌচাক। মৌচাক ছোটদের মাসিক, সুধীর সরকার সম্পাদক। আমাদের আধুনিক কিশোর সাহিত্যের পথিকৃৎ তিনিই। নিজে যে খুব বেশি কিছু লিখেছেন তা নয়, যদিও তাঁর লেখার বেশ হাত ছিল–আমার দেশ, আমার কাল-বইয়েই তার প্রমাণ আছে, তবে সাহিত্যকৃতির চেয়েও তাঁর বড় কৃতিত্ব সাহিত্যিক সৃষ্টিতে-যে-কীর্তির অংশীদার বঙ্গদর্শনের বঙ্কিম,সাধনার রবীন্দ্রনাথ, সবুজ পত্রের প্রমথ চৌধুরী, প্রবাসীর রামানন্দ, বিচিত্রার উপেন গাঙ্গুলি, কল্লোলের দীনেশ দাশ থেকে শুরু করে সসাগরা ভারতবর্ষের আরো অনেকে। সম্পাদকরূপে সুধীরবাবুও তাঁর স্বক্ষেত্রে সেই রকম এক অগ্রগণ্যই। স্বয়ং সারথি হয় সেকালের অনেক সাহিত্যরথীকে শিশু সাহিত্যের কর্মক্ষেত্রে টেনে এনেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন দত্ত, মণিলাল, হেমেন্দ্রকুমার, রাজশেখর, কেদার চাটুজ্যে, বিভূতি বাঁড়ুজ্যে, শরৎচন্দ্র থেকে আরম্ভ করে কল্লোল গোষ্ঠীর বড় বড় লিখিয়েদেরও ছোটদের জন্য কলম ধরিয়েছিলেন, প্রায় কেউই বাদ ছিল না। বড়রা লিখতে ধরেছিলেন বলেই আমাদের শিশুসাহিত্য বড় হল। বড়দের লেখা, বড় দরের লেখা পেলে তবেই না দেশের ছেলেমেয়েরা বড় হবে। তাঁর প্রেরণালব্ধ লেকখদের সাহিত্য সৃজনেই সেই সুধীরবাবুরই জয় হয়েছে, আমি মনে করি।
সুধীরবাবুর কাছ থেকেই আপনার প্রথম লেখার দক্ষিণালাভ?।
হ্যাঁ, তাঁর দাক্ষিণ্যই সব প্রথম। তবে সেটাই আমার প্রথম লেখা নয়। তার আগে বিস্তর লিখেছিলাম–বড় বড় কবিতা, মেজ মেজ গল্প, আর মাজাঘষা প্ৰরন্ধ কম লিখিনি–একাঙ্কিকা নাটক-ফাটক কী না! সে সব লেখা বড় পত্রিকার পৃষ্টায় বয়স্কদের পাতে পরিবেষিত। বেরিয়েছিল ভারতী, ভারতবর্ষ, উত্তরা, কল্লোল, বিজলী আর ধূমকেতুতে। সিরিয়াস যত লেখা। কিন্তু তার কোনটার জন্যেই কিছু পাইনি। চাইওনি কোথাও হাত বাড়িয়ে। চাইবার সাহসই হয়নি বলতে কি! লেখা ছাপানোর জন্যই, নিজেকে ধন্য জ্ঞান করেছি, সাধুবাদ দিয়েছি সম্পাদককে। তখন মনের আনন্দে লিখতেন লেখকরা, আর লেখা ছাপা হলেই কৃতার্থ! তার থেকে কৃত অর্থের কোনো কথাই ছিল না, অর্থমূল্যে রচনা বিক্রীত (কিংবা বিকৃত) করার গরজ ছিল না তাঁদের। সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে লিখে যেতেই এনতার, তারপর বয়স্য কন্যা পাই করার ন্যায় সেই সব রচনা পত্রস্থ করার একটা দায় ছিল যেন তাদের। বুঝতে পারছেন অবস্থাটা? কাগজে লিখে কিছু উপায় করার কথাটা তখন গজাই না আমার মগজে…
তাহলে?
যদি না কাবুলিওলার আসন্ন তাগাদার কথাটা গজালের মত লেগে থাকত মাথায় গজগজ করত সব সময়। সেই কথা ভেবেই-তারই গঞ্জনায় আমায় আদায়ের পথে এগুতে হলো। সুধীরবাবু যখন আমায় মৌচাকে লেখার জন্য বললেন, আমি মুখফোঁড় হয়ে চেয়ে বসলুম-টাকা দেবেন তো?
নিশ্চয়। টাকা দেব বইকি? কত দাবি বলুন? সুদের ধান্দা ছিল আমার মাত্র পনের টাকার–তা-ই আমি চেয়েছিলাম। এই নিন আগাম বলে তক্ষুনি টাকাটা আমার হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন। দিতেই, টাকাটা পেতেই না, আমার সমস্ত অন্তরাত্মা যেন হেসে উঠল তক্ষুনি। সেই হাসিই ক্রমে বন্যার আকার ধরে আমার আগেকার সব লেখাপত্তর ধুয়ে মুছে ভাসিয়ে নিয়ে হাসির গল্প হয়ে দেখা দিয়েছে তার পরে…বাংলা সাহিত্যে তো নয়ই, শিশু সাহিত্যেও প্রথম নয় নিশ্চয়, কিন্তু আমার হাতে প্রথম হাসির গল্প সেইটাই।
কী ছিল গল্পটা?
একটা ঘোড়ার গল্প। গরীব গঞ্চাননের একটা বেতো ঘোড়া ছিল, খেতে পেত না বেচারা। পেট ভরে খেতে দিতে পারত না, তার ওপর বেদম খাটাত পঞ্চানন। খিদের জ্বালায় ঘোড়াটা ছটফট করত সর্বক্ষণ। বেগুনীর থেকে শুরু করে টর্চ বাতি, লেপ মশারি যাহা পাইত তাহাই খাইত-পঞ্চানন করল কি দাঁও বুঝে একদিন গাঁয়ের এক মোড়লকে ধরে গছিয়ে দিল ঘোড়াটা। হয়েছিল কি, জেলার হাকিম সেখানকার ডাকবাংলোয় এসেছিলেন সেদিন, আর মাতব্বর লোকটি তাঁর সাক্ষাৎকারে যাচ্ছিলেন। পঞ্চানন তাকে বুঝিয়েছিল, পায়ে হেঁটে হাকিমদর্শনে গেলে কি আর কদর হবে, ঘোড়ায় চেপে গেলে আদর মিলতে পারে। নামমাত্র দামে ঘোড়াটা পেয়ে তাতেই চেপে ডাকবাংলোয় হাজির হলেন ভদ্রলোক। তার ঘোড়াটাকে নিয়ে যাওয়া হলো বাংলোর আস্তাবলে-হাকিম সাহেবের ঘোড়া বাঁধা ছিল যেখানে। সেখানে হাকিমের ঘোড়ার মতই তাকেও বালতি ভরে দানাপানি দেওয়া হল। সেই সব বাদাম ছোলা, আরো কতো কী, খাওয়া দূরে থাক, জীবনে কখনো চোখেও দেখেনি বেচারা। তাই না দেখেই, বালতিতে মুখ ডোবাবে কি, আকাশের দিকে মুখ তুলে হাসতে শুরু করে দিয়েছে সে-চ্যাঁ হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ হ্যাঁ! ভূরি ভোজে মুখ না ছুঁইয়ে ভূরি ভূরি তার সেই অভ্রভেদী অট্টহাসি! খাবে কি, খাবার দেখেই তার চক্ষুস্থির! সে আত্মহারা। মর্মভেদী হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাসতে হাসতেই মারা গেল বেচারা শেষ পর্যন্ত? এই গল্প।
গল্পটার নাম পঞ্চাননের অশ্বমেধ, তাই না? বইটা পড়েছিলাম যেন কোনকালে। এখন আর পাওয়া যায় না বোধ হয়?
আসলে সেই ঘোড়াটা আর কেউ না, এই আমিই। এই যে ঘোড়েল–আপনার সামনেই। সেই ঘোড়ার হাসি, লিখে প্রথম টাকা পাওয়া আমার সেই গোড়ার হাসিই তারপর আমার সব গল্পে আমদানি-আমার সব লেখাতেই ছড়িয়ে যাওয়া এখন অবধি। আগাগোড়া একই হাসাহাসির ব্যাপার।
