কে আবার? আপনার ঐ মা কালী ছাড়া আর কে? ফোড়ন কাটেন জনাব সাহেব উনিই তো আপনার পৃষ্ঠপোষক।
মাখতে না চাইলেও উনি যেন জোর করে গায়ে মাখিয়ে দেন। কথাটার ঝাল কানে না তুললেও ঝাঁজটা নাকে লাগেই। হ্যাঁ, নিশ্চয়। সামনে না থাকলেও সবার পিছনেই উনি রয়েছেন–ঐ ভগবান। সবার পিঠোপিঠি।
পিঠোপিঠি?
হ্যাঁ, শুধু পার্থের ন্যায় যুগন্ধরদেরই উনি সারথ্য করেন, সামনে থেকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। আমাদের মত লোকদের পিছন থেকে ঠেলা মারেন–ঠেলা দেন ঠিক পথটিতে। আমাদের তো রথ নেই, রথী নই আমরা–তাই আমাদের ঘাড়েই চেপে রয়েছেন। এই পিঠেই তাঁর পীঠস্থান-সেখান থেকেই তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা।
তাই পিঠোপিঠি বলতে চাইছেন?–তিনি কন : মানে, আপনার স্কন্ধপুরাণের পৃষ্ঠায় তিনি রয়েছেন? মাপ করবেন, কথাটা আপনার কায়দায় বলা হয়ে গেল।
তাই বইকি! মাকে তো কোনো দিনই হৃদয়ে ঠাঁই দিতে পারিনি, না নিজের মাকে না ঐ পরমাকে- কিন্তু মা তো কখনই ছাবার পাত্রী নন, নাছোড়বান্দাই। সিন্ধবাদ নাবিকের সেই বৃদ্ধের মতই মাথার ওপর চেপে রয়েছেন-সেখানে বসেই আমার মুণ্ডু ঘোরাচ্ছেন-ফেরাচ্ছেন তাঁর অলক্ষ্য নির্দেশে। খালি আমার নন, সবাইকার।
মুন্ডুপাত করছেন সকলের? বলতে চাইছেন?
তাছাড়া কী? মার বাঁ হাতে যে মুন্ডু-ধরা সে কার? আমারই তো। আমাদেরই। তাঁর গলা জড়িয়ে যে মালা করে পরানো সে তো আমরাই–তাঁর ছেলেমেয়েরাই–কণ্ঠলগ্ন গলগ্রহরা যত! বাঁ হাতে তিনি আমাদের মাথা উদ্ধার করছেন, যদিও দক্ষিণ হস্তে তাঁর চতুর্কগই। বরমাল্যই। তাঁর সে-বর আগ বাড়িয়ে যে বরণ করে নিতে পারে তারই, কিন্তু কজন তা পারে? আর সবাইকে তাই হাতে তুলে তাঁকে দিতে হয়। তাদের ঘাড়ে ধরে তাঁর প্রসাদের পায়েস-পিঠে তিনি হাঁ করিয়ে গিলিয়ে দেন। তা নইলে সেই অক্ষমদের অভুক্ত থাকতে হোত। এই পিঠে দিয়ে পুষিয়ে দেওয়া–এটা তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া আর কী?
আপনাকে তাই ওই কাবুলি দাওয়াই দিয়ে গিলোতে হোলো? পথে আনতে হলো বুঝি?
না তো কী? মা আমায় কবে বলেছিলেন, বৃত্তিতে যাবি–তাই তোর স্বধর্ম, যা ই মন থেকে চাস, যেদিকে তোর প্রবৃত্তি-সত্যিকারের ঝোঁক সেই হোলো তোর আসল বৃত্তি-স্ববৃত্তে তুই প্রবৃত্ত হবি-বৃত্তিলাভেই সিদ্ধিলাভ-স্ববৃত্তেই স্বয়ংসিদ্ধি। কিন্তু মার কথাটা শুনেছিলাম কী! কী যে আমি চাই! তার খোঁজ করেছি কি কখনো? যার-তার যা-কিছুর পিছনে ছুটে মরেছি–আর পরে টের পেয়েছি যে সেটা আমি চাইনি। কিন্তু তখন সেই কালে মার কথা দূরে থাক, মাইে আমার মনে পড়ত না কখনো। না নিজ মাকে, না পরমাকে। একটু আগেই বললাম না আপনাকে? মার সব কথাই মন থেকে ভেসে গিয়েছিল কোনকালে! মারই ঠাই ছিল না আমার মনে-বলতে কি! যত আজেবাজে মেয়েরাই মনের সবখানি জুড়ে বসেছিল, সুন্দর সুন্দর মুখরাই ফুলের মত ফুটফুট করত সব সময়–আলপিনের মতও ফুটত আবার! মার দিকটায় ছিল ঘুটঘুঁটে অমাবস্যাই–কিন্তু অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো! সেই তো তোমার আলো! বলে না? সেই অন্ধকারের পৃষ্টপট থেকেই আমার উৎসবের দিন এগিয়ে এল। যুগান্তর ঘটে গেল আমার জীবনে।
হকার থেকে রচনাকার-যুগান্তর বইকি!
কিন্তু হোতী কি, মা অমন করে ঘাড় ধরে না গিলিয়ে দিলে? কাবুলিওয়ালার ঠেলায় না পড়লে বৃত্তির পথে যেতুম নাকি কোনোদিন? সে-পথ খুঁজেই পেতাম না হয়তো। কাগজ বিক্রির কমিশনে দিলশোসের মটন চপ আর সাধনবাবুর রাবড়ি সাবাড় করেই আত্মসুখী আমার স্বচ্ছন্দে দিন কাটত-কখন-সখনো এক-আধটু এখানে সেখানে লিখে-টিকে। তারই আত্মসতভাষে কোনরকমে টিকে থাকতাম। লেখাটাকে বৃত্তি করার প্রবৃত্তিই হত না, তার থেকে জীবিকার্জনের ধারণাই করতে পারতাম না-কাবুলিওলার সুদ মেটানোর দায় ঘাড়ে না চাপলে সম্পাদকের কাছে লেখার জন্য টাকা আদায় করার ভাবনাই হত না আমার। আর যাদুশী ভাবনাৰ্যস্য-ভাবনার থেকে তো সাফল্যের অদ্ভাবনা? মাথায় ভাবনা জাগল বলেই না এটা হোলো
কাবুলি পর্বর আগে আপনি লিখে কোথাও টাকা পাননি? চাননি বুঝি?
লেখার জন্যে টাকা দেওয়া নেওয়ার রেওয়াজই ছিল না তখন। এমনকি প্রমথ চৌধুরীও অমনি প্রবন্ধ লিখতেন সেকালে, রবীন্দ্রনাথ কবিতা দিতে চাইলেই। লেখার জন্য দক্ষিণা আদানপ্রদানের পত্তন হয়েছিল নজরুলের থেকেই করেছিলেন পবিত্র গাঙ্গুলি।
স্বনামধন্য পবিত্র গাঙ্গুলি?
পত্রিকাওলাদের বদ্ধমুষ্টি থেকে তার কবিতার দক্ষিণা উদ্ধার করে আনতেন ওই পবিত্র বাবুই–সেই টাকা জেলখানার দরজায় গিয়েও কাজীকে পৌঁছে দিয়েও আসতেন আবার। তার বেলায় পবিত্রর আদায়, আমার বেলা সেই কাবুলিওলার দায়। শৈলজার মতই পবিত্র ছিল কাজীর অন্তরঙ্গ বন্ধু, তার সব কাজ, সেই সঙ্গে বাংলা সাহিত্য আর সাহিত্যসেবীদেরও কাজ সে এগিয়ে দিয়েছিল। আমার বন্ধু বলতে সেই কাবুলিওলাই, আর তো কাউকে দেখতে পাই না। সে-ই আমার কাজ গুছিয়ে দিয়েছে তার খেই ধরানোর থেকেই আমার খেয়া শুরু।
কাবুলিওলার প্রেরণাতেই আপনার কলম ধরা তাহলে? প্রেরণা বা ঠেলাতে–যাই বলুন! ঠেলার নাম বাবাজী বলে যে, তা মিছে নয়।
আমার বেলায় মাইজী। আমার বেলায় মায়ের ঠেলাই-একটু পরয়ৈপদীভাবে যদিও। দক্ষিণ হস্তের বরাভয় তো নয়, বাঁ হাতের দাক্ষিণ্যই–মাথার টিকি ধরে খড়গহস্তর টান। যাই হোক, মার স্নেহ তো! দু দিকেই সমান। আমার মা বলেছিলেন নিজের বৃত্তিপথে পা বাড়ালেই সিদ্ধি পাবি তৎক্ষণাৎ। আর সিদ্ধি মানেই তাঁর সাক্ষাৎ। পদে পদে তাঁর পরিচয়, হাতে হাতে তার প্রমাণ। নিজের মুঠোর মধ্যে নগদ নারায়ণ লাভ করতেই টের পেলাম, কথাটা তো মার মিথ্যে নয়। এই লেখাই আমার পথ–এই পথই আমার তো! আস্ত নোটখানা হাতে আসতেই রাস্তা আমার পরিষ্কার হল।
