হ্যাঁ, তাহলে যে বছরে প্রায় একশো আশী পার্সেন্ট সুদ দাঁড়ায় মশাই।
দাঁড়াক না। আমিও দাঁড়ালাম তো তার দৌলতেই। বছরে সেটা যত পার্সেন্টের ধাক্কাই হোক না, সে সময় যেন আমার কাছে সেটা বিধাতার আশীর্বাদের মতই এসেছিল। আমি বলি–তুলনাটা একটু অশোভন হলেও, রবীন্দ্রনাথ যেমন কাবুলিওয়ালার সাহায্যেই সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন…
অ্যাঁ? শুনেই চমকে উঠেছেন জনাব : তাকেও কি ওই কাবুলির কাছে ধার করতে হতো নাকি?
না না। সে ধার দিয়ে বলছিনে। কাবুলিওয়ালা গল্পটা লিখেই কথাসাহিত্যে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে না? এবং পরে-বহুকাল পরেই যদিও-সেই কাবুলিওয়ালার থেকেই সিনেমা জগতেও তাঁর প্রতিষ্টা-সেটা রবি আর তপনের যুগপৎ সমুদয়ে যদিও-তেমনি আমারও যা-কিছু জারিজুরি তা সেই কাবুলিওয়ালার প্রেরণাতেই।
তার মানে? পরিষ্কার করে বলুন।
প্রেরণ করো ভৈরব তব দুর্জয় আহবান হে! সে আহ্বান আর কার হতে পারে? কাবুলিওয়ালা ছাড়া আবার কে? তারই প্রেরণায় আমি পড়ি কি মরি করে গল্প লিখতে বসলাম। মাসের অমুক তারিখে অত টাকার সুদ গুণতেই হবে আমাকে, ছাড়ান ছোড়ন নেই, কী করা যায় তখন বলুন? না লিখে উপায় আছে? তিন টাকা কি পাঁচ সিকে, কিংবা সাড়ে চার বা দশ টাকাই গল্পের দর তখন আমার। রোজ লিখি সকালে দুপুরে রাত্তিরে, রাত জেগেও লিখতে হয়–একেক দিন এমনকি তিনটে করেও ওতরাতে হয়। লেখাগুলো ওতরায় কিনা জানিনে, কিন্তু আমার লেখনীকে ওগরাতে হয়ই। নামকরা কোনো কাগজে লিখি না তখন, নেয়ও না, চায়ও না তারা আমার লেখা। লিখি ছোট ছোট কাগজে-ছোটদের পত্রিকায়–বেঁটেখাটো দক্ষিণায়। তিল কুড়িয়ে তিল পাকাই, কিন্তু পনের টাকার মত লিখতে গেলেই যে সেই আন্দাজে লেখা যাবে তা হয় না, লেখার ঠেলায় লেখা বেড়ে চলে বাধ্য হয়ে কোনো কোনো মাসে পনেরর জায়গায় পঁচাত্তর উপায় করে বসি। আবার সেই গল্পগুলির জোট পাকিয়ে ছোটখাট বই হয়ে যায় একেকটা। যে কোনো প্রকাশককে যে কোনো দামে দিয়ে দিই–আমার খাসী তখন দ্বিতীয়বার জবাই হয়–মোটমাট অনেকগুলি বই এ করেই বেরিয়ে যায় আমার তখন। আর এমনি করেই, যৎসামান্য যা আমার প্রতিষ্ঠা–সব সেই কাবুলিওয়ালার প্রেরণাতেই। তার কাছে আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ। আর চিরঋণী তো বটেই। সুদ আসল কিছুই তার শোধ করতে পারিনি।
বেশ করেছেন।
মোটেই বেশ করিনি। অনিচ্ছা সত্ত্বে হলেও আমার সেই অবিশ্বস্ততায় প্রাণে সে কতত ব্যথা পেয়েছে কে জানে! কাবুলিওয়ালাও প্রাণে ব্যথা পেতে পারে, তারও প্রাণ আছে, আমার মত প্রাণীই সে। কতো মেয়ের স্নেহের কথা আমি বেমালুম ভুলেছি, কিন্তু কবে কে পাঁচ টাকা ধার নিয়ে দেয়নি, তার শোক এখনো আমার যায়নি–এখনও মনে পড়ে ক্ষণে-ক্ষণে। অন্য শোক ডালেপালে, অর্থশোক বক্ষস্থলে-বলে না? ঠিক তাই। না, অনিচ্ছাকৃত হলেও, কাজটা আমার খুবই গর্হিত হয়েছে। কিন্তু এমনই এই সংসারটা, গহিত কিছু না করলে গড়পড়তায় কারও হিত হয় না বোধ হয়।
যাই হোক, যে করেই হোক, অসাধ্যসাধন করেছেন বটে। আমি এটাকে আপনার জীবনের যুগান্তর বলব। কাগজের হকার থেকে কাগজের লেখক হওয়া যুগান্তকারী নয় কি?
হ্যাঁ, তাই। যুগান্তকারীই। কাবুলিওয়ালার সেই দেড়শ টাকা পুঁজি সম্বলে লেখক থেকে আবার সম্পাদক হয়ে যাওয়া-যুগান্তকারী ঘটনাই বটে। আমার জীবনের সেই যুগান্তর সাধন।
সম্পাদক হলেন আবার কী রকম?
তারপরই আমি সম্পাদক হয়ে নব পর্যায়ে যুগান্তর বার করলাম না?
যুগান্তর! সে তো বারীনদাদের কাগজ ছিল বলে জানি।
হ্যাঁ, তাঁদেরই ছিল বটে। অগ্নিযুগের গোড়ায় বারীনদা উপেনদারা মিলে সেটা বেব করেছিলেন। তারপর তাঁরা নির্বাসিত হয়ে আন্দামানে চলে গেলেন না? কাগজখানা বাজেয়াপ্ত করে নিলেন সরকার। পরে যথাসময়ে আন্দামান থেকে ফিরে এসে তাঁরা বের করলেন সাপ্তাহিক বিজলী-নলিনীকান্ত সরকারের সম্পাদনায়। আর উপেনদা বার করলেন তাঁর নিজস্ব আত্মশক্তি-রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নাম। আর কবি নজরুল ইসলামের ছিল ধূমকেতু-কবিগুরুর আশীর্বাদধন্য। ধূমকেতুর মাথায় সেই আশীর্বাদ-লিপি লেখা থাকত, দেখেননি? আয় রে আয় ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনে এই দুর্গ শিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন। অল্পক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভুলে হোক না লেখা/জাগিয়ে দে রে/চমক মেরে আছে যারা অর্ধচেতন।
তারই সমসাময়িক ভুঁইফোড় সাপ্তাহিক আমার এই যুগান্তর-সরকারী বাজেয়াপ্ত হওয়া বারীনদাদের কাগজ জবরদখল করে নেওয়া আমার।
জবরদখল করে পাওয়া?
তাছাড়া কী? উদ্বাস্তুদের মতই প্রায়–এমনিতেই যার সব হারায় সে। সর্বহারারা যা পায় অমনিই পায়, নয় তো জোর করে আদায় করে। ভুইফোড় আমি জন্ম-উদ্বাস্তুই তো। আমার জীবনের সব কিছুই জবর দখল করা। কী শিশুসাহিত্যে, কী নাট্য জগতে, কী বড়দের লেখাটেখায়, কিছুই আমার পরিশ্রম নৈপুণ্যে নিজগুণে পাওয়া নয়,সাধনোচিত লাভ নয় কোনটাই, সত্যি বলতে যা পেয়েছি তার কোনটাই আমার পাওনা ছিল না। আমার জীবনের যা-কিছু পেলাম, সবই ওই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতই? যেমন কিনা, এই কাবুলিওয়ালাকে পেয়ে যাওয়া সেই চৌদ্দ আনাই তো? সে আমায় তার দেয় টাকার থেকে সুদের দুআনা কেটে চোদ্দ আনা দিলেও, তার থেকে আমি ষোলো আনার ওপরে আঠারো আনা লাভ পিটেছি। কার অযাচিত পৃষ্ঠপোষকতায় কে জানে!
