দেখে তো মনে হয় না আপনার অ্যাজমা-ট্যাজমা আছে? হেঁপো রুগীকে দেখলেই তো চেনা যায়। কোনো অসুখই আপনার রয়েছে বলে বোধ হয় না। আপনি বোধ হয় কলকাতার সুস্থতম ব্যক্তি।
অসুস্থতম। হেন আধিব্যাধি নেই, যা নাকি হয়নি আমার–আর নেইকো এখন। যে রোগটা একবার আমায় ধরেছে সে আর আমায় কখনো ছাড়েনি, ছাড়তে চায়নি বুঝি। এবং আমিও যে ওষুধটা একবার ধরেছি তার ছাড়ান দিইনি আর। শরীর ব্যাধি মন্দিরম-বলেছে না? বাঁচতে হলে, বুঝলেন মশাই, হয় অসুখে ভুগুন, নয়তো ওই ওষুধেই–ভুগতেই হবে। অসুখে ভুগলে অশান্তি, নিজের এবং আশপাশের সবাইকার, কিন্তু ওষুধে ভুগলে সেটা নেই। কপেয়ারিটিভলি অনেকটা শান্তি–তাই না কি? তবে যতই ওষুধ খান না, মৃত্যু এড়ানো যাবে না সত্যি, তবু যতটা স্বচ্ছন্দে থাকা যায়–আর শান্তিতে মরা যায়। আমার ভোগসুখে যেমন অনীহ্যাঁ, অসুখ ভোগেও সেই রকমটাই। সুখ ভোগ নাগালের বাইরে বলে সাধ করে অসুখ ভোগ বাগাতে যাব, এমন ভোগলালসা নেই আমার। তাই যতটা সম্ভব যথাসাধ্য তাদের প্রকোপ এড়িয়ে যেতে চাই।
সবাই তো তাই চায় মশাই!
আর আজকাল এমন এমন ওষুধ বেরিয়েছে না! মন্ত্রের মতন রোগ সারায়, রোগ আটাকাতেও তাদের জোড়া নেই।
তা, এখন বোস কোম্পানিতে যাচ্ছেন যে! হাঁপানি হয়েছে নাকি?
না, হয়নি। সে একবারই যা হয়েছিল, বললাম না! সেই একবার ভুগেই আমার ভোগস্পৃহা মিটে গেছে…হইে দিই না এখন আর, হবার আগেই সারিয়ে রাখি। যে দাবাইয়ে সারায়, তাই দিয়ে দাবিয়ে রাখি আগের থেকে। নিয়মিত এক-আধ দাগ খাই রোজ, খেয়ে যাই–তাতেই আর ওটা পাত্তা পায় না। আমলই দিই না অসুখটাকে। ভালো আছি বেশ।
আশ্চর্য! রোগ না হলেও ওষুধ খায় লোকে?
আশ্চর্য বটে। এ তো মিরাকল-এর ন্যায়। ওষুধ সব থাকতেও লোকে যে এত অসুখে ভোগে তা দেখে আমি কিছু কম অবাক হই কি মশাই? আমার কী মনে হয় জানেন? ভোগবাসনা মানুষের অন্তর্গত, কিছুতেই তা যায় না, যেতে চায় না। যেমন সুখের জন্য তেমনই আবার যেন অসুখের জন্যেও মন তার কেমন করে যেন। সেটি না হলে কেমন যেন ভালো লাগে না, মনে মনে, চায় যে, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন সবাই মিলে তার জন্য আহা-উৎ করুক, সেবা করুক ঠেলে, অসুখে না পড়লে তো পারিবারিক প্রীতি প্রকাশ পায় না। তার পরিচয় পাবার তরেই হয়ত সে ওই লালায়িত। সেই হেতু সাধ করে রোগ ডেকে আনে-মারা পড়ে অনেক সময় সেইজন্যই। চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার। ওষুধটা করতে গিয়ে সাঙ্গুভেলিতে বসি গিয়ে–সেখানে বসেই গল্প করা যাবেখন। চা টোস্ট কফি যা চান, অমলেট পোচ কাটলেট যা চাই, স্ট কারি কোর্মা সব পাওয়া যায় সেখানে। চমৎকার সস্তায়।
বোস কম্পানিতে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে সাঙ্গুভেলিতে গিয়ে বসলাম আমরা। দুপ্রস্থ খাবারের অর্ডার দেওয়া গেল।
এখানেও ধারে খাওয়ায় নাকি? টেবিলের ওধার থেকে তাঁর জিজ্ঞাসা।
আরে না না। কাবুলিওয়ালার দক্ষিণা কি সবারই থাকে নাকি? সেকালে যখন খবর কাগজ বেচতাম সকালে, আমাদের দেশের শরৎদার সঙ্গে একদিন রাস্তায় দেখা হঠাৎ। তাঁকে আমি বললাম, শরৎদা, গোটা কুড়ি পঁচিশ টাকা ধার দাও না আমাকে? এই কারবার তাহলে জমিয়ে করা যায়। তোর এই কাগজ বেচার ব্যবসা? হ্যাঁ, আনন্দবাজার, বসুমতী আমি অবশ্য ধারেই পাই, কিন্তু সব কাগজ তো তাই নয়। হ্যাঁ, আরো কতো কাগজ আছে, অমৃতবাজার, ইন্ডিয়ান ডেলি নিউজ, স্টেটসম্যান, নামক সব রকম কাগজই চায় খদ্দের। কিন্তু সেসব তত এই টার্মে মেলে না। কমিশন বাদে কাগজের দাম আগাম মিটিয়ে দিয়ে আনতে হয়। সেটা করতে পারলে আরো কতো উপায় হত আমার। তাই তো ধার চাইছিলাম। তা তো চাইছিস। কিন্তু তুই কি আর এ ধার শুধতে পারবি কখনো? পারব না? কেন বলো তো? পারব না কেন? আরে, যে ধার করে সে কি আর তা ওখতে পারে? পারলে তো তাকে আর ধারই করতে হত না রে। ধার করার দরকারই পড়ত না তার-পড়ার আগেই সে রোজগার করে রাখত। ও বাবা এ যে আমার সেই রোগ হবার আগেই সারাও-থিয়োরির মতই আরেকখানা! তা, টাকাটা দিয়ে তুমি আর ফেরত নাই-বা নিলে শরৎদা? তোমার ঋণ কি শুধবার? তোমার কাছে না-হয় চিরঋণী হয়েই থাকতাম। তিনি বললেন, না ভাই তা হয় না। আমি কারুর কাছে চির পাওনাদার হয়ে থাকতে চাই না। সেটা আমার ভাল্লাগে না। তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাই, কিন্তু তারা আবার দশ বিশ টাকা ধার দিতে চায় না যে, দুশো পাঁচশো হলে দেয়। নিবি দুশো পাঁচশো? নেব না কেন, নিতে বাধা কিসের। পেলে তো ভালোই হয় আরো–কিন্তু অতত টাকা শুধব আমি কি করে? শুধতে হবে না, জানালেন শরৎদা, তাদের টাকা কখনো শুধতে হয় না, শুধতে পারে না কেউ, শুধু সুদ দিয়ে গেলেই হয়। শুধতে গেলেই আমার মনে হয়, তারা হয়ত কেঁদেই ফেলবে ভ্যাক করে। তাই নাকি? হ্যাঁ, ওই টাকায় তারা কি ফেলল না তোকে? জন্মের মতন তুই তাদের জমিদারি হয়ে গেলি, তোর থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করাটাই কাজ দাঁড়ালো তাদের। সে কাজ গেলেই তারা বেকার। তাই সুদ পেলেই তারা খুশী, আর কিছুই চায় না। সেই কাবুলিওলারা। এই বলে সে নিয়ে গেল আমায় সেই কাবুলিওলাদের এক ডেরায়, বউবাজারের কোথায় যেন তাদের আস্তানাটা। তাদের খাতায় সই দিয়ে দেড়শ টাকা ধার করলাম, টেন পারসেন্ট হিসেবে সুদ তার পনের টাকা, সেটা বছরের নয়, মাসে মাসে। প্রথম মাসের সুদের পনেরটাকা প্রথমেই সে উসুল করে নিল–সেটা কেটে নিয়ে বাকীটা দিলো। আর বলে দিল যে, পরের মাসের ঠিক এই তারিখেই ফের এই পনের টাকা যেন তাকে দিয়ে আসি গিয়ে–এমনি মাসের পর মাস পরম্পরায়–তার যেন অন্যথা না হয়। এসব তো বলেইছি আপনাকে গোড়ায়। বলিনি?
