আপনি দেশবন্ধুর স্নেহধন্য ছিলেন, জানি আমরা।
তেমন অনেকেই ছিল। আমি এমন বিশেষ কিছু নয়। তবে নজরুল আর সুভাষকেই তিনি বেশি ভালোবাসতেন মনে হয়। তবে বললাম না? তাঁর স্নেহলাভের বাধা ছিল বিস্তর।
আমার মতন অনেক স্নেহভাজন, তারা আবার নিকটজনও, তাঁকে ঘিরে রাখত–আমার মত অভাজনদের এগুতেই দিত না তাঁর কাছে–সেই দুস্তর বাধা পেরিয়ে পৌঁছনো যায় কি করে? তা ছাড়া তিনিও মাঝে মাঝে সুদূরপরাহত হয়ে যেতেন। অল ইন্ডিয়া লীডার ছিলেন তো তিনি–প্রায়ই হিল্লি-দিল্লি, বোম্বে, মাদ্রাজ, এলাহাবাদ, নাগপুর ঘুরতে হত তাঁকে–তখন? সেই দুঃসময়ে কী করি বলুন?
কী করতেন?
অসহায়ের পাশে কে দাঁড়াবে আবার? কে সহায় হয় তার? সে সময় শুধু দুজনই আছে কেবল–মা-কালী আর বাবা কাবুলি। সামনের মন্দিরের ওই প্রতীকাকার আর সেই প্রতিকার।
কাবুলির কাছে ধার করতে হতো আপনাকে?
হত বইকি। হয়েছিল একবার–সেই একবারই মাত্র। আমাদের দেশের একজন–শরৎ ঝা-চাঁচলের ইস্কুলে এক বছরের সিনিয়র ছিল আমার–সেই শরৎদাই আমায় নিয়ে গেছল তাঁর চেনা কাবুলিটির কাছে। দেখে-শুনে সে ধার দিতে রাজী হয়ে গেল এক কথাতেই। অদ্ভুত এই কাবুলিরা, সত্যিই! দিয়েছিল সে শদেড়েক টাকা ধার।
কী দেখেশুনে দিল শুনি?
আমার কথা শুনে। আর আমার ঠিকানায় এসে বাসাটা দেখে–তারপরে। কেয়া কাম বতে হো? শুধিয়েছিল সে শুধু। সকালে খবর কাগজ বেচার কথাটা আমি বলেছি। সে শুনে বলল–আচ্ছা কাম হ্যায়। বহুৎ আচ্ছা কাম। লেকিন উওতো ফজিরকা কাম। আর সমুচা দিন… বিলকুল বেকার? কুছভি নেহি আউর?
কাহে নেহি? হা এক মোকামকা কেয়াটেকার ন্যায় না? কেয়ারটেকারকা কেয়া বোলতা? দারোয়ান। যাঁহা হাম রহতা হ্যায়, ওই কোঠিকা দারোয়ানি ভি করতা হ্যায়।
বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! ইয়ে আউর ভি বড়িয়া কাম। এহি দারোয়ানিসে জবর কাম আউর কুছভি নেহি। সে বলেছে।
জী হাঁ! আমি সায় দিয়েছি তার কথায়–ইসে জেয়াদা কাম আউর কেয়া হ্যায়? এই পেয়াদা কাম?
জরুর, জরুর! সে ঘাড় নাড়ে-হাকিমসে ভি জবর ইয়ে কাম। হরবখৎ মোকামকা দরওয়াজা পর খাড়া।.হাকিমকা সাথ দোস্তি-রহনে সেকতা, লেকিন পেয়াদাসে দোস্তি বেগর হাকিমসে মিলনা ভি মুশকিল! পেয়াদা দরোয়াজামে যোক দেনেসে তোম উপর জায়গা কিন্তরে?
ওহি তো বাৎ! পেয়াদা নেহি কাৎ হোনেসে হাকিমসে ভি মোলাকাৎ নেহি।
কাবুলি আমার বুলিতে খুশি হয়েছিল বোধ হয়। সে তার ঝুলির থেকে কিসমিস বাদাম বার করে খেতে দিয়েছিল আমায়। আমার হকারির চাইতেও আমার দারোয়ানিকে বেশি মর্যাদা দেওয়ায় আমিও মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাকে সঙ্গে করে মহাসমাদরে নিয়ে এসে বাসাটা দেখিয়ে দিলাম আমার।
সে জানালো, মাসের একটা নির্দিষ্ট তারিখে বাড়িটার এক ফার্লং দূরে এই ল্যাম্পপোস্টের সামনে এসে সে খাড়া হবে, তাকে দাঁড়াতে দেখলেই আমি যেন সুড় সুড় করে সুদের টাকাটা গিয়ে তার হাতে গুঁজে দিয়ে আসি। তা হলে সে বাসায় এসে হানা দেবে না, ঐখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে চুপচাপ- কিন্তু তাকে দেখার পরেও আমি নেহাত যদি না যাই, তখন সে বাধ্য হয়ে এখানে এসে চড়াও হবে কিন্তু। আর যদি তাকে দেখেই আমি দিয়ে দিয়ে আসি গিয়ে, তা হলে সে আমাকে পেস্তা, বাদাম, কিসমিস, মনাক্কা, আখরোট, আঙুর ইত্যাদি মেওয়া খাওয়াবে আবার। কিন্তু দিতে দেরি করলে–সবুরে সে মেওয়া ফলবে না।
যাবার আগে সে বেশ করে দেখে গিয়েছিল বাড়িটাকে। কিন্তু সেই তার প্রথম দেখা আর সেই-ই শেষ।
সেই শেষ কেন? কী হলো তারপর?
তারপর তার সৌজন্যে আমার স্ট্রাগলটা শেষ হলো বটে, অন্তত তখনকার মতন। কিন্তু তার স্ট্রাগলটা শুরু হয়ে গেল তারপরই। আমার বাড়িটা খুঁজে বার করতে লাগল সে। তারপর–কিন্তু পাত্তা পেল না কিছুতেই। আমিও তার দেখা পাইনি আর! সেই বাসাটার দৌলতেই না? সেই বাসা আমায় আপনি বদলাতে বলছেন মশাই?
.
৫৭.
চলুন, আজ ভালো করে দেখব। জনাব সাহেব কথা পাড়েন মাঝখানে : আপনার মেসটা চিনে আসব বেশ করে।
কী হবে চিনে? আমি কোনো উৎসাহ দেখাইনে-আমি তো আপনার কাছে কোনো ধার চাইতে যাচ্ছিনে। আপনার ধার ধারবারও কোনো মতলব নেই আমার। না, সেজন্যে নয়। এত ঘুরেফিরে, এতবার ঘোরাঘুরির পরেও যা চিনতে পারেননি, তা না হয় নিশ্চিহ্ন হয়েই থাক। তাতে আপনারও শাভি এবং হয়ত আমার-আমারও…
তার বেশি বলতে পারি না। নিজের শান্তিপ্রিয়তা ব্যক্ত করতে সঙ্কোচ হয় স্বভাবতই।
বাসায় তো ফিরছেন এখন? চলুন না!
না, বাসায় কেন আবার? বেরুলাম তত এই। নানান বিষয়কর্মে বেরিয়েছি। হাতে ওষুধের শিশি দেখছেন না? বোস কম্পানিতে মিকশ্চারটা বানাতে দিতে হবে। সেখান থেকে আরেকটু এগিয়ে, বিবেকানন্দ রোড পেরিয়ে চাচার দোকানের পাশে সাঙ্গভেলির কেবিনে…সেখানে চা-টা খেয়ে ফেরার পথে ওষধটা নিয়ে আসব বোস কোম্পানির থেকে… এর ভেতরে তাঁরা বানিয়ে রাখবেন মিকশ্চারটা।
কিসের মিকশ্চার?
অ্যাজমার। মার ছিল না ঐ ব্যামো? আমারও হয়েছিল একবার। আমারও হবে, বলেছিল মা। অ্যাজমা মার, ঐ অ্যাজমা আমারও। সেই রকমটাই হয়েছিল একবার ভারী জোর হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর হতে দিইনি। এখন মাঝে মাঝে এক-আধবার একটু-আধটু না হয় যে তা নয়–এর কয়েক দাগ খেলেই সেরে যায়।…ডাক্তার নানী সেনগুপ্তর প্রেস্কৃঞ্জন এটা মশাই, সেই কোন সেকালে। আমরা যখন যদুনাথ সেন লেনে থাকতাম–বাড়িটার এগরো নম্বর বোধ হয়, আর ডাঃ সেনগুপ্ত তখন সবে প্র্যাকটিশ জমিয়েছেন, চার টাকা মাত্র ফি ছিল তাঁর তখনকার–থাকতেন মানিকতলা স্ট্রীটের কোথায় যেন–এসে মাকে ভালো করে দেখেশুনে ঐ মিকশ্চারের ব্যবস্থা করে গেছলেন।
