পাড়ার আমজনতাকে ডেকে এনে খাওয়াতে পারতেন।
আসবে কেন তারা? বলেছি না, টেগার্ট সাহেবের সৌজন্যে আমি কিঞ্চিৎ নামজাদা হলেও তারা আমাকে এড়িয়ে চলত–তখন না হয় একটু আমজাদাই হয়েছি, তাই বলে তারা আমায় আমল দেবে নাকি? সাধনবাবুর দোকান থেকে সের দুয়েক রাবড়ি নিয়ে এসে আমার বোনেদের-জবা পুতুল কাবেরী ইতুদের ডেকে আনতে চলে গেলুম। আমার অনেক বইয়ে ওদের গল্প পড়ে থাকবেন, ওরা আপনার অজানা নয় বোধ হয়? ভালোবাসার অনেক নাম-বইটার গোড়ার গল্পটাই তো জবাকে নিয়ে। আবার নিখরচায় জলযোগ বইয়ের শেষের গল্পটাও তাই-আমার সেই জবাই! সত্যি বললে, এক সম্পর্কে ওরা আমার কাজিন হয়। সে সময় ওরা সবাই কূপার স্ট্রীটে থাকত, বিয়েও হয়নি কারু–সেই কূপার থেকে পাকড়ে আমার অন্ধকূপে টেনে আনলাম সবাইকে–আম খাওয়ার আমন্ত্রণে। আনলাম তো, কিন্তু এসে দেখি, ওমা! আম যথাযথই আছে বটে, কিন্তু রাবড়ির গামলাটা পিঁপড়েয় ভর্তি, রাবড়ির সরের ওপর রঙচঙে এক স্তর পিপিড়ের পুরু পলস্তারা।
সে কী মশাই!
বলছি কি তবে? আমার সেই ঘরের জঞ্জাল তো দেখেছেন? তার ওপরে সেদিনের খবর কাগজটা পেতে তার ওপরেই গামলাটা বসিয়ে ঢেকে রেখে গিয়েছি।
পিঁপড়েরা গন্ধ পায় মশাই! এদিকে পুলিসের সঙ্গে বেশ মিলে আছে তাদের।
ভাবলাম গন্ধ পেলেও সন্ধান পাবে না। রাজ্যের ওই নোংরা মাড়িয়ে, খালি পায়ে আবর্জনার সেই উচ্চাবচ পর্বতশৃঙ্গদের ডিঙিয়ে, দুর্গম গিরি কান্তার মরু পার হয়ে এত কষ্ট করে তারা সেই অমৃতকুম্ভের নাগাল পেতে আসবে, ধারণাও করিনি–কিন্তু পাত্তা পেয়েছে ঠিকই। যাই হোক, ওপর ওপর চেঁছে ফেলে রাবড়ির তলানিটাই সদ্ব্যবহার করা গেল আম দিয়ে–কতো কী ভালো-মন্দ তো তারা খেয়েছে জীবনে। তাদের বাড়ি আমিই কি কম কিছু খেয়েছি নাকি, তবু আমার মনে হয়, সেই খাওয়ার সোয়াদ এখনো বুঝি তাদের–আমার সেই বোনদের মুখে লেগে রয়েছে।
সত্যি! জনাব সুরুৎ করে জিভের জল টানলেন। ঝালের মত মিষ্টিটাও পরের মুখেই খেতে হয় বুঝি।
ইতু বলল, দূর, বাড়ি বসে কি এসব জমে নাকি? চলো আমরা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ময়দানে গিয়ে পিকনিক করিগে। তাই গেলাম সবাই। গ্রেট ইস্টার্ন থেকে কেক প্যাট্রজ কাটলেট স্যানডউইচ ইত্যাদি নিয়ে খবরের কাগজ বিছিয়ে সেখানে গিয়ে বসলাম আমরা। খানিক বাদেই চেঁচিয়ে উঠেছে ইতু-ওমা? কাভটা দেখেচ! তোমার সেই পিঁপড়েরা আবার এখানেও এসে হানা দিয়েছে দ্যাখো! এখানে আসব আমরা, কী করে টের পেয়েছে কে জানে! আমি যখন ভিক্টোরিয়ার কথা বলছিলুম না, তখনই শুনেছিল বোধ হয়। আর সটান চলে এসেছে সঙ্গে সঙ্গে। পুতুল তো ওর কথায় অবাক। এগুলো সেই মেসের পিঁপড়ে বলছিস তুই? না তো কী! দ্যাখ না, একেকটা ঘাড় তুলে তাকাচ্ছে কেমন আবার! সেই পিঁপড়েরাই! তোর দিকেই তাকাচ্ছে বোধ হয়–এর মধ্যে আহামরি তো তুই-ই কেবল। ইতুকে আমি সান্ত্বনা দিই।
সেই থেকেই আমার ধারণা মশাই, পুলিসের মতন পিপত্রে হাত থেকেও পার পাওয়া যায় না। যে করেই হোক, টের তারা পাবেই–এড়ানো যাবে না তাদের। তবে একটা কথা আমি বলব, পিঁপড়ে প্রমুখদের ফেরানো না গেলেও পাওনাদারদের চোখে ধুলো দিয়ে থাকা যায় বেশ ঐ বাসাতে…
মানে, আপনাকে আর পালাতে হয় না, বাড়িটাই পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায় বলছেন অই? জনাব কন–নাকি সদরে পাওনাদারদের দর্শন পেলেই আপনি খিড়কির শুড়িপথ ধরে সরে পরতে পারেন? সেই কথাই?
না, না মশাই। এদিকে পাওনাদারের টিকি দেখলেই ওদিক দিয়ে টিকিট কাটব সে বরাত করিনি-আমার আবার পানাদার কে হবে? কে ধার দিতে যাবে তখন আমায়? তেমন ধারালো বন্ধু-তেমন কেউই ছিল না যে। তখন আমার স্ট্রাগলিং পিরিয়ড চলছিল না? সেই দারুণ দুঃসময়ে কেউ কারো মিত্র হয়? সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়, অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়, পড়েননি পদ্যপাঠে?
কেন, দেশবন্ধু তো ছিলেন আপনার? পাননি–পেতেন না তাঁর কাছে?
পাব না কেন? পেয়েছি তো, অনেক অনেক-অনেকবার! কাছে গেলেই কেমন করে যেন তিনি টের পেতেন, তখন যা তাঁর পকেটে থাকত, সব উজাড় করে বের করে দিতেন, কিন্তু তাঁকে পেলে তো?
পাবার বাধাটা কী ছিল?
আমি নিজেই বাধা। মুহুর্মুহু গিয়ে চাওয়া যায় খালি খালি? চক্ষুলজ্জা করে না? বুড়ো ধাড়ি হয়ে বার বার তাঁর বাড়ি গিয়ে…তা ছাড়া, আমার প্রতি তাঁর বদান্যতার কথা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরাও টের পেয়ে গেছল যে…সেই বদ অন্যরাই তাঁকে দুইত বোধ হয়–তারাই তাঁকে ঘিরে থাক সব সময়। ধারে-কাছে ঘেষতেই দিত না আমাকে। বাড়ি থাকলেও বলে দিত বাইরে চলে গেছেন। এমনি নানা ফন্দি ফিকিরে বাধা দিত তারা আমায়…
চিঠি লিখে জানাতে পারতেন…মাইকেল যেমন বিদ্যাসাগরকে পত্রাঘাত করতেন…কেবল আপনাকেই নয়, অনেক লেখককেই তিনি সাহায্য করতেন জানা গেছে, আর তিনি বিদ্যাসাগররের মতই তাদের প্রতি মুক্তহস্ত ছিলেন।
তা বটে, নিজেকে তিনি উঠতি প্রতিভাদের প্রতিভূ বলে জ্ঞান কানে বোধ হয়। তা বলে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর তুলনা হয় না–সে তুলনা করবেন না। এদিক দিয়ে বিদ্যাসাগরের চেয়ে তিনি বড়ো ছিলেন এমন কথা আমি বলতে চাইনে, তিনি ছিলেন তাঁর থেকে আলাদা। একেবারে স্বতন্ত্র। বিদ্যাসাগর যোগ্য লোককে দিতেন আর দেশবন্ধু অযোগ্য ছাড়া দিতেই না। বিদ্যাসাগরের বিচারপূর্বক দান আর তাঁর ছিল নির্বিচার। বর্ষার মেঘপুঞ্জ যেমন কোন বাছবিচার না করে স্থানে-অস্থানে সমানে অকাতরে ঝড়ে পড়ে নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত হয়ে বাঁচে ঠিক–তেমনটাই। বিদ্যাসাগরের করুণা; আর দেশবন্ধুর স্নেহ। দুজনের তুলনা হয় না।
