কিন্তু তথাপি তাঁর ক্ষোভ যায় না–কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি–বস্তির লোকের এত গুমোর… তিনি গুমরোন তবুও।
বস্তি বলছেন কেন? শ্রাবস্তি বলুন। সুন্দর মেয়েরা যেখানে-স্বর্গ সেখানেই! স্বর্গের অলকনন্দা সেখান দিয়ে প্রবাহিত। সেই অলখ ঝোরার সন্ধানে বেরিয়ে হাজার হাজার বছর পর্যটনের পর ক্লান্ত পথিকরা অবশেষে শ্রাবস্তির কারুকার্যের কিনারায় এসে পৌঁছায়, জীবনের আনন্দ (কিংবা কবি জীবনানন্দকেই) নিজের অন্তরে খুঁজে পায় বুঝি। কত কাভ করে পেতে হয়–তা কি অত সোজাসুজি পাবার? তবে হ্যাঁ, আপনার একথা আমি মানব, এই কদিন বাসাটার খোঁজাখুজিতে যে পরিশ্রমটা করেছেন, পরীর মত কেউ নজরে পড়লে, তেমন কাউকে একটু নজরানা দিতে পারলে শ্রমটা আপনার সার্থক হতো বই কি!
যাই হোক, বাসাটা আপনার পালটান মশাই! আপনার সন্ধানী ভদ্রসন্তানদের আর এমন নাহক হয়রান করবেন না। তাঁর উপরোধ শুনতে হয়।
হ্যাঁ, আপনার কথায় বাসা পালটাই আর ধরা পড়ে যাই শেষটায়! ও-কথা আমি আমলই দিই না।
তার মানে?
তার মানে, কলকাতায় থেকেও ঢাকায় থাকার মত, গা-ঢাকা দিয়ে থাকার মত এমন আরেক খানা বাড়ি নেই শহরে। আছে আর কি? যেখানে কিনা আপনিও ফেরার, আপনার বাসাও ফেরার–যুগপৎ! কারো পাত্তা পাবার যো নেই। ঠিকানা পেলেও যার ঠিকঠিকানা মিলবে না কোনোদিন।
পুলিসের ভয় আছে বুঝি আপনার?
কার নেই? পুলিসের ভয় সবাই করে–সর্বত্র–সব সময়। জানেন, বিনয় বাদল দীনেশের একজন, কোন আমি ঠিক জানি না, একরাত্তির ঐ বাসায় কাটিয়ে গেছেন? তারকদার খোঁজে এসেছিলেন তিনি। তারকাও এক বিপ্লবী, আমাদের দেশের গাঁয়ে ইনটারনী হয়ে ছিলেন দিনকতক। মাঝে মাঝে কার্যগতিকে আমাদের বাসায় উঠতেন, থাকতেন আমার ঘরেই। তাঁর আসবার কথা ছিল যে আজ। আজকালের মধ্যে এসে যাবেন নিশ্চয়, বলল ছেলেটি, আমি তাঁর জন্যে অপেক্ষা করব এখানে। করুন, আপত্তি কিসের! কিন্তু আমার গেস্ট হয়ে ছিলেন তিনি শুধু ঐ এক রাত্তিরই। পরদিন সকালে উঠে আর তাঁর দেখা পাইনি। আমার ঘুম ভাঙার আগেই কোনো কথা না কয়েই কখন যে তিনি চলে গেছেন টেরও পাইনি আমি। টের পেলুম তার পরদিন-তখন তাঁর আসল পরিচয় পাওয়া গেল। রাত না পোয়াতেই দমাদম ঘা পড়তে লাগল আমাদের সদর দরজায়। উঠে দেখি, গোটা পাড়াটা ছেয়ে গেছে পুলিসে। যেদিকে তাকাই খালি পুলিস আর পুলিস! বাসাড়েরা ভয়ে কাঁপছে সবাই–আমরা ঘেরাও! আর সশস্ত্র পুলিস আর গোরা সার্জেন্টদের নিয়ে এসেছেন অপর কেউ নয়–স্বয়ং টেগার্ট সাহেব!
.
৫৬.
সদর দরজা ভেঙে ফেলার যোগাড়, কিন্তু ভয়ে কেউ উঁকিটি মারছে না পর্যন্ত। সবাই নিঃসাড়।
কিন্তু আমি তো জানি পুলিসের ডাকে সাড়া না দিয়ে যাবার জো নেই, শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের সেই কারাবরণের সময় থেকেই জানা আমার।
পুলিসের সঙ্গে পারা যায় না। দে ক্যান শুট। আর, সব সময় যে বন্দুক দিয়েই–তা নয়। শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের গুলতানিতে ঘোড়ামুখো এক গোরা সার্জেন্ট কেমন শুট করে আমায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল কয়েদগাড়ির ভেতরে-তার এক লং শটেই না।…বলপ্রয়োগ, মানুষকে বলের মত
অপপ্রয়োগে তাদের দ্বিধা বাধা নেই আমি জানি।
এর মধ্যেই অগ্রপশ্চাত খতিয়ে দেখা হয়েছে। যম যে সব সময় পিছে থাকেন, পিছিয়ে থাকেন তা নয়, এখানে সামনে বাঁয়ে ডাইনে পিছনে সর্বত্র। পিছনের খিড়কি ধরে বস্তির দিকে সরে পড়া যাবে, সেপথও বন্ধ–সেধারেও পুলিস। বাঁ দিকের দেয়াল টপকে পালাবো যে, সেদিকেও পাহারা। দরজা যদি না খুলে দি, আর কবিগুরুর সেই গানের মত তারা দ্বার ভেঙে এসে পড়ে যদি, তাহলে প্রাণের আর কিছু বাকী থাকবে না। আস্ত রাখবে না।
নামতে হল আমাকে, বাধ্য হয়েই।
দরজা খুলে বেরুতেই এক পুলিস অফিসার-তিনিই টেগার্ট সাহেব জানা গেল–এগিয়ে এলেন–নাম কী তোমার?
বললাম নাম।
কদ্দিন আছো এখানে? কতজন থাকে এ বাসায়? কী করে তারা সব?
যথাযথ উত্তর দেবার পর তাঁর প্রশ্ন হল আবার-বাইরের ফালতু লোকের যাতাযাত আছে এখানে?
মাঝে মাঝে। কারো আত্মীয়স্বজন কখনো-সখনো এলে কয়েকদিনের জন্যে থাকেন তার গেস্ট হয়ে। তারপরে চলে যান।
এর ভেতর কেউ এসেছিল কি? তোমাদের এখানে?
না তো। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে-হ্যাঁ, এসেছিল। পরশু রাত্তিরে একজন এসেছিল বটে, এক যুবক, তাকে আমি চিনি না। ভালো করে আলাপ হবার আগেই কাল সকালে সে চলে গেছে–কোথায় জানি না। আমাকে কিছু না বলেই চলে গেছে সে।
কীরকম দেখতে যুবকটি?
বর্ণে বর্ণে তার পরিচয় দিতে না পারলেও একটা বর্ণনা দিলাম সাধ্যমতন। শুনে টেগার্ট পাশের সহযোগী বাঙালী অফিসারের দিকে ইঙ্গিত করলে–দ্যাটস্ দা ম্যান। এসেছিল কেন সে তোমার কাছে?
আমার কাছে আসেনি ঠিক। তারকা বলে একজনের খোঁজে সে এসেছিল এখানে।
হু ইজ দিস তারক? এখানে থাকে সে? এ মেম্বর অফ দিস মেস?
না। মাঝে মাঝে এখানে আসে। এসে দুয়েক দিন থাকে, থেকে চলে যায় আবার। কোথায় যায় জানি না।
এনি রিলেটিভ অফ ইয়োরস?
নো সার। আমাদের মালদায় ইনটার্নী হয়ে ছিল সে কিছুদিন। সেখানেই তার সঙ্গে আমার আলাপ।
সিওরলি এ টেররিস্ট। কামস্ টু ইউ হিয়ার ফর সাম টেররিস্টিক অ্যাকটিভিটি আনডাউটেডুলি?
সে টেররিস্ট কিনা আমি জনি না। তেমন কোনো কাজে আমার কাছে আসে না। সেরকম কোনো কথাও বলে না সে। হি রাইটস্ নভেলস্। আমাকে শোনাতে চায়-তাই। নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদি করার জন্যেই আসে।
