এখন একজন মেম্বারই আগাম চলে এল না-হয়। তারপর বাকীরা যখন এসে জুটবে তাদের একজন হয়ে থাকব আমি তখন। কিন্তু…কিন্তু…একটু কিন্তু কিন্তু করে কথাটা পাড়ি : কিন্তু ততদিন গোটাবাড়ির ভাড়াটা কি একলাই আমায় গুণতে হবে নাকি?
না, তা কেন। এমনি তুমি থাকতে পারো। আমার বাড়ির এক কেয়ারটেকার হিসেবে। তুমি থাকলে বাড়ির দরজা জানালাগুলো ঠিক থাকবে, সিমেন্ট বালি বেহাত হবে না–চোর ছাচোরের উপদ্রব থেকে বাঁচব। সেজন্য তোমাকে যেমন কোনো বেন দেব না, তোমারও কোনো ভাড়া দিতে লাগবে না। তা না হয় হল, কিন্তু তুমি খাবে কোথায়?
খাওয়ার জন্যে চিন্তা করিনে। এই পাড়ারই এক জায়গায় আমার খাবার ব্যবস্থা আছে…তাছাড়া এইরকম কয়েক ভাঁড় রাবড়ি হলেই আমার সারাদিন চলে যায়। হান্দ্রে দৃষ্টান্ত দেখিয়ে কথাটা সারি।
কিন্তু সিঁড়ির রেলিং এখনো হয়নি, বাড়িতে আলো নেইকো। রাত-বিরেতে ওঠা-নামায় অন্ধকারে পড়ে যাও যদি?
পড়লেই উঠে পড়ব তক্ষুনি–তার কী হয়েছে।
বেশ, তাহলে দোতলার যে-কোনো ঘর বেছে নাও গে। তোমার শোবার জন্যে একটা চৌকি পাঠিয়ে দিচ্ছি বরং, একটা হেরিকেন লণ্ঠনও। হেরিকেন দেব, নাকি টর্চ?
হেরিকেনের দরকার নেই, টর্চ একটা আমি কিনে নেব না-হয়। তাঁকে বললাম আপনার বাড়িটার চৌকিদারির জন্যে একটা চৌকিই যথেষ্ট। তার বেশি আর টর্চার করতে চাইনে আপনাকে।
আস্তানা গাড়লে কী হবে–রাস্তা মুখস্থ হয়নি তখনো। যে ধরনের পাঠ মুখস্থ করায় আমি অভ্যস্ত এ-পড়া তার থেকে আলাদা। কেবল মুখে মুখে সুখে আয়ত্ত হবার নয়, বার বার চোখস্ত করার পরই মুখস্থ হয়। রাস্তার নামধামেও ফারাক বিস্তর। নম্বরটা মুক্তারামের, বাড়িখানা এদিকে বসাকদীঘির লেনে। পাড়াটাও যেন কী রকমের। কারো কাছে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় না। পরদিনই আর পথঘাটের কোনো হদিশ পাইনে। সকালের কাগজ ফিরি করে ফেরার পর দেখি আমার বাড়িও ফেরার। বাসার কোনো পাত্তাই নেই। কোথায় গেল সেটা? এই তো সকালেই দেখে গেছি–এখানেই ছিল কোথায়–এর মধ্যে উধাও? সারা চোরবাগান চষেও তার টিকির নাগাল পাই না। আপনি তো তবু দু-চারবার ঘোরাফেরা করার পরই ঐ ১২০ নম্বর কুড়িয়ে পেয়েছেন, আমি তো মশাই একশ কুড়িবার চক্কর মারবার পর তবে তার কিনারা পাই…।
একশ কুড়িবার?
কী বলছি তবে? কিন্তু সেটা আমরা চক্করবরতী বলেই হয়ত হবে। ১২০ কিংবা ১১৮ নম্বর যাই হোক, কিন্তু তারপরেই ওই ১৩০ আসে কী করে-সেটা হচ্ছে আবার চোরবাগানের বিখ্যাত চাটুজ্যেবাড়ি–যাই হোক, মাঝখানের দশ-দশটা বাড়ি লোপাট হয়ে যায় কী করে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা ঘামাচ্ছি, এমন সময় সামনের বাড়ি থেকে একটা ছেলে, প্রায় আমার সমবয়সী কি কিছু ছোর্টই হয়ত, বেরিয়ে এসে শুধোলে, আমাদের বাড়ির সামনে আপনি এত ঘোরাফেরা করছেন যে? কিছু চাই আপনার? বাবা জানতে পাঠালেন।–জিজ্ঞাসাবাদে জানলাম, আমি যেখানে ডেরা নিয়েছি, সেই বাড়ির মালিক আনন্দ সাহা মশায়ের বড় ছেলে সে। প্রভাতকুমার সাহা-বলল নাম। আমি বললাম–চাই বই কি ভাই! তোমাদের সেই বাড়িটাকেই চাই। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিনে সকাল থেকে।
আসুন আমার সঙ্গে বলে সে তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া একটা শুড়ি পথ ধরে (সাহাদের সঙ্গে কলকাতার শুঁড়িপথ একদা অবিচ্ছেদ্য ছিল ) ছোটখাট একটা বস্তি ভেদ করে আমার বাসার পশ্চাদ্দেশে এসে, তারপর তার পাশ কাটিয়ে বাড়িটার সামনের রাস্তায়-বসাকদীঘি লেনে (এখন নাকি যেটা কেদার বাঁড়ুজ্যে লেনে নামান্তরিত) এনে ফেলল। বলল যে, এ গোলমালটা হয় কেন জানেন? মুক্তারামবাবু স্ট্রীট থেকে এই বসাকদীঘি গলি অব্দি পুরো এলাকাটাই আমাদের-বাঁ দিকের সব বাঙ্গিলিই আমাদের…সরু গলিটার সব বাড়ির নম্বরই মুক্তারামবাবু স্ট্রীটের, এমন কি, এ বাড়িটা বসাকদীঘিতে হলেও ইচ্ছে করেই আমরা এটার নম্বরও ওই মুক্তারামের নামেই রেখেছি, স্ট্রীটের বাড়ির ভ্যালুয়েশন গলির বাড়ির চাইতে বেশি হয় কিনা, তাই! বিক্রি করার কালে ভালো দাম মেলে।
আরে মশাই, আমিও যে ওই বস্তিতেই গিয়ে ঠেকেছিলাম। এর ভেতর দিয়ে এগুতেই দিল না আমাকে। আপনাদের তিন তলাটা আমায় দেখিয়ে দিল অবশ্যি; বলল, ঐ বাড়িটাই! কিন্তু এধার দিয়ে রাস্তা নয় তার, আপনাকে যেতে হবে ওধার দিয়ে…সে ধার দিয়ে, অন্য ধার দিয়ে-পূর্ব দিকের গলি দিয়েও যেতে পারেন, আবার পশ্চিম দিক দিয়েও যেতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু এখান দিয়ে না, এটা পাবলিক রাস্তা নয়; এসব ভদ্রলোকের বাড়ি, এখানে এসে অমন ঘুরঘুর করলে গায়ে গরম জল ঢেলে দেব আপনার…এই বলে শাসালো আবার আমায়।…সেই ভদ্রজনরা!
দেবেই তো গরম জল, শাসাবেই তো! প্রাইভেট রাস্তা ওটা–জনাভিকের নেপথ্য যাত্রার। ও পথ দিয়ে আসতে হলে বাড়িওলার ছেলের পাসপোর্ট লাগে…
তাই বলে গায়ে গরম জল ঢেলে দেবে নাকি? বস্তির বাসিন্দাদের এতখানি গুমোর?
সুন্দর সুন্দর মেয়েরা নেই কি সেই বস্তিতে? আপনি ইতিউতি চাইছিলেন বোধ হয়? আশা করেছিলেন, আপনার কপালেও হয়ত কুন্ডলা ফলবে, এসে বলবে, পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ? অনেকে ইচ্ছে করে পথ হারাতে ওখানে যায় যে। গিয়ে পথ হারায় কি না! তাই ঐ গরম জলের ঢালাও ব্যবস্থা। ওরা ঘন্টায় ঘন্টায় চা খায়, গরম জল সর্বদাই রেডি। বডডো বেঁচে গেছেন মশাই!
