আপনি পুতুল, প্রতিমা, প্রতীক-তত্ত্ব, রহস্য, ইঙ্গিত-সব গুলিয়ে একাকার করছেন।
একাকারই তো। এক বস্তুরই নানা আকার। মূলত সেই জড় কিংবা চৈতন্য-যাই বলুন–এক বস্তুরই এপিঠ ওপিঠ-আসলে যা উৎস, যার থেকে সব কিছুর উৎসার-তাবৎ উৎসাহ! জড়ের থেকেই অজর অমরত্ব! সেই আদিম জড়াবের থেকেই যত কিছুর উদ্ভব–যত না উদ্ভাবনা–জীবনের সব উৎসব! কিন্তু সে কথা যা আপনি এই অসময়ে অকুস্থলে এমন হঠাৎ এই বেপাড়ায় যে…?
বেপাড়া?
বেপাড়া না? নেহাত বে-র বরযাত্রী না হলে কেউ কি এ পাড়ায় পা বাড়ায়? কলাবাগান আর চোরবাগানের এই চত্বরে সাধ করে নিজের পকেট খোয়াতে আসে?
খোয়ানোর কথা বলছেন? খোয়ার কথা? তা, আপনার খোঁজে এসে এই কদিনেই আমার যথেষ্ট খোয়র হয়েছে!
আমার খোঁজে?
হ্যাঁ, কিন্তু কিছুতেই আপনার সেই বাসার খোঁজ পাচ্ছিনে আর।
সে কি! আপনি কয়েকবার আমার বাসায় এসেছেন তো এর মধ্যে।
তা তো এসেছি। দেখেও গেছি ভালো করে। কিন্তু এখন এসে কিছুতেই তা আর খুঁজে পাচ্ছি না। এখানেই ছিল, অথচ কোথায় গেল যে এখন!
কদিন ধরেই টহল মারছেন এই রাস্তায়?…কেন, আমার বাসার নম্বরটা আপনার মনে নেই নাকি? যাতে ক্ষণে ক্ষণেই মনে পড়ে সেই হেতু খনার বচনের মন করে ছড়া বানিয়ে দিয়েছিলুম না? এক দুই তিন চারগুনে যান বার বার/বাদ দিন দ্বিতীয়কেই পেয়ে যাবেন তা হলেই/অ-দ্বিতীয় আমার ন্যায়/আমার বাসাও যে মশায়। মনে নেই আপনার? ভুলে মেরেছেন বুঝি?
ভুলব কেন? একশ চৌত্রিশ নম্বর তো আপানার? কিন্তু রাস্তায় তার হদিশ কোথায়? ১৩০ অব্দি পাচ্ছি, কিন্তু তার পরেই একেবারেই গিয়ে ১২০-মাঝখানের দশটা বাড়ির পাত্তাই নেই। বিলকুল লোপাট।
এই জন্যেই তো মশাই, গোড়াতেই আমি বলেছিলাম না আপনাকে? প্রথম যেদিন কোন্ এক অভিনয় আসরে না সাহিত্য বাসরে আলাপ হতেই আপনি আমার ঠিকানা চেয়ে বসলেন, আমি দিতে চাইনি কিছুতেই। বলেছিলাম না, সে আপনি খুঁজে পাবেন না সহজে, হয়রান হবেন নাহক। বলিনি কি? জানি তো, আমার পাত্তা পাওয়া কী সুকঠিন? ঠিকানা পেয়েও কলকাতায় কোনো বাড়ির ঠিক পাওয়া যায় না, আমি তো পাইনে অন্তত, আর তা খুঁজে বার করা যে কী দায় মশাই! আর কী যে ঝকমারি, তার ওপর আমার বাসার খোঁজ পাওয়া তো এক ফ্যাসাদ! সেই বাসায় গিয়ে ওঠার পরও কতদিন যে আমি নিজেই তার কোনো ঠাওর পাইনি তা জানেন? পার্কে শুয়ে কতো রাত যে কাটাতে হয়েছে আমাকে…
খোঁজ পান না তো, কী করে বাড়িটা খুঁজে পেয়েছিলেন গোড়াতে?
আমি ঠিক খুঁজে পাইনি, খুঁজতেও যাইনি। সত্যি বলতে, বাড়িটাই যেন কী করে খুঁজে পেয়েছিল আমায়…চিনে নিয়েছিল কেমন করে।
আগের জন্মের আপনজনকে যেমন চেনা-চেনা মনে হয়, সেই রকমটা? পূর্বজন্মের পরিচিত বুঝি বাড়িটা?
তাই বা বলি কি করে? আমার চোখের সামনে জন্মাতে দেখলাম বাড়িকে। আগের জন্মে কোনো বাড়িই ছিল না, একটা দীঘি ছিল নাকি ও-জায়গায়। বসাকদের দীঘি। বসাকদীঘি নাম নাকি তাই রাস্তাটার, জানতে পারলুম। আর আমার চোখের ওপরই বড় হলো বাড়িটা। বাড়লো, হৃষ্টপুষ্ট হলো। আমি যখন ওটায় সেঁধিয়েছিলাম তখন সবে ওর তৈরি শুরু। সম্পূর্ণও হয়নি তখন। আমি এলাম, দেখলাম, সেঁধুলাম–মৌরসী পাট্টা গাড়লাম আপনার। একালের উদ্বাস্তুরা যেমনটা করে না? ভিনি-ভিডি-ভিসি! সেই রকম বাতুঘুঘু হয়ে বসে গেলাম।
ভারী মজার লাগছে তো ব্যাপারটা, বলুন শুনি।
আগের রাত্তিরে আমার এক বোন–হ্যাঁ, বোনই বটে, তবে বন্ধু বলতেও বাধা নেই বলেছিল আমায় যে, রাস্তায় ঘাটে অমন করে পড়ে না থেকে একটা বাসাটা খুঁজে নিয়ে আসতানা গাড়ো নিজের। তাই সকাল বেলার খবর কাগজ বেচার কাজটা সেরেই রাবড়ির ভাঁড় মুখে চুমুকে চুমুকে চাখতে চাখতে বাড়ির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছি। অলিগলির ভেতর দিয়ে একটু গলাগলি করতেই মার্কাস স্কোয়ার মাঠটার সামনে এসে পড়লাম–এক নির্মীয়মান বাড়ির সামনে সৌম্যমূর্তি বর্ষীয়ান এক ভদ্রলোকের সম্মুখে। এধারে একটা মেসবাড়ির সন্ধান দিতে পারেন আমায়? শুধিয়েছি তাঁকেই। চোরবাগানে আবার মেসের অভাব? তিনি বললেন, চারধারেই তো মেস। এই রাস্তাটার কখানা বাড়ি ছাড়িয়ে করিম সাহেবের দোতলার পাশে বাঁহাতি গলির ভেতরে পর পর তিনখানা বাড়িই তো মেস। ল কলেজ মেস। ল কলেজের ছাত্ররা থাকে সেখানে। তুমি কি ল-র ছাত্র?
ছাত্র? হ্যাঁ, ছাত্র তো বটেই। তবে ল-র নয়, হ-য-ব-র-লর। আমি বলেছি।
তবে তো ওখানে থাকতে দেবে না তোমায়। তাহলে দিনকতক অপেক্ষা করো, আমার এই বাড়িটা মেস-পারপাসেই করা হচ্ছে, মেস হলে পর এখানে এসেই উঠতে পারবে তখন।
এখন ওঠা যায় না?
এখন তো সবে দুটো তালা হয়েছে মাত্তর। তিনতলাটা উঠবে এরপর। তারপর ছাদ হবে, ছাদের ঢালাই পেটাই হবে, চুনবালির পলস্তরা পড়বে, দরজা জানালা বসবে, ইলেকট্রিক ফটিংস আছে–বিস্তর কাজ বাকী এখনো।
থাক না। হতে থাক। দোতলার সিঁড়িটা হয়ে থাকলে এখনই তো ওঠা যায়। যায় না?
তা যায়, দোতালায় গিয়ে ওঠা যায় বটে। কিন্তু মেসবাড়ি কাকে বলে তার কোন আইডিয়া তোমার নেই বোধহয়? বিশ-ত্রিশজনায় মিলে একখানা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভাগ করে থাকে, ঠাকুর চাকর রেখে মেস গলায়-বখরায় খাওয়া-থাকা চালায় বলে খরচা কম পড়ে–একজনায় তো একটা মেসবাড়ি হয় না।
