বাংলার মেয়েদের চিনেছিলেন শরৎচন্দ্রই। সব মেয়েই আচরণে এক। সবারই এক আচরণ।
দেবদাসরা নেই আর। অরক্ষণীয়ারাও নেই। কিন্তু পরিণীতারা সবাই রয়েছে। তারা আর পরিণত হয়নি। হবার নয়।
.
৫৫.
বহুদিন বাদ সেদিন হঠাৎ জনাব সাহেবের সঙ্গে মোলাকাত আবার। ঠনঠনের মাথাতেই ঠোকাঠুকি!
মার মন্দিরের সামনেটায়।
এখানে কী করছেন মশাই? মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিগ্যেস করি।
কিছুই না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার ভক্তি নিবেদন দেখছিলাম আর কি! এতক্ষণ ধরে তাই দেখছি।
এতক্ষণ! এক মিনিটও তো হয়নি আমার। আর ভক্তির কথা কী বলছেন, ভক্তি ফক্তির ধার আমি ধারিনে। আমার হচ্ছে অতি ভক্তি-নিতান্তই চোরের লক্ষণ। আদায়ের ফন্দি ফিকির।.আমার মা বলেছেন তাই দিনান্তে একবার অন্তত যাওয়া-আসার পথে এই প্রিমিয়ামটা দিয়ে যাই আমার।
প্রিমিয়াম না প্রণাম-কী বললেন?
প্রিমিয়াম। লাইফ ইনস্যুরেন্সের। মা বলে দিয়েছেন যে, কলকাতায় পথে পথে অপঘাত পদে পদে বিপদ-তার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিরাময় ভাবে নিরাপদে নির্বিঘ্নে টেকসই হয়ে থাকতে হলে এই টেক্স দিতে যেন কখনো না গাফিলতি করি।
বাঁচা যায়।
বেঁচেই তো আছি মশাই। এবং একরকম নিরাপদ নির্বিঘ্নেই। তেমন কোনো শক্ত অসুখ-বিসুখও করেনি কখনও, এবং এক-আধবার যাও বা হয়েছে তাও খুব সহজেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি–প্রায় মিরাকলের মতই। একলাই থাকি, দেখাশোনার কেউ নেই, তবু চার যুগ তো পার হয়ে এলাম নির্ভাবনায়। আপনার জন কেউ কোথাও নেই–আত্মীয় বন্ধুহীন নিরূপদ্রব নিশ্চিন্তিতে এমনি করেই-খাসা আছি মশাই! আবার কী চাই!
কিন্তু এই কালী মন্দিরে এসে মাথা ঠোকা, এটা তো নিছক পৌত্তলিকতাই।
হ্যাঁ, পৌত্তলিকতা তো বটেই। ভাবতে গেলে তাই বইকি। কিন্তু, কতো দূর আমরা ভাবতে পারি বলুন? এই জড় জগতের নিছক জড়তার উৎস থেকেই তো প্রাণ আর চৈতন্যের উৎসার। এই শ্ৰী-সমৃদ্ধি–এত শিল্পকলা–সব কিছুর আমদানি। কিন্তু কোথায় যে সেই জড়তার শেষ আর এই চৈতন্যের সঞ্চার, তার কিছু কি ছাই জানি আমরা? আধুনিক বিজ্ঞান কি মনোবিজ্ঞানীরা কি সেই রহস্যের ধারেকাছেও পৌঁছতে পেরেছেন? একটুও কিনারা করতে পেরেছেন কোনো কিছুর? কিনারেই যেতে পারেননি বলতে কী!
চেতনাই সর্বশক্তির মূলে আর তার ভিত্তি নাকি অবচেতনাতেই–আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ একথা বলেছেন বটে।তিনি কন–কেউ কেউ আবার নির্জানের কথাও বলেছেন।
একই কথা। আরো এগিয়ে যান–একেবারে অজ্ঞানে, অচেতনে,-জড়তায়–জড়পিণ্ডতায়৷ …মানে, আমাদের সম্মুখীন ঐ পুতুলে–প্রতিমায়-প্রতাঁকে।
সেটা কি নিতান্তই জড়োপাসনা হবে না মশাই? জড়ত্বেই আত্মনিবেদন হবে তো?
নিশ্চয়ই জড়োপাসনাই তো! মনকে জড় করা। সর্ষের মতন যে মন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডর নানান বিষয়ে ছড়িয়ে রয়েছে তাকে পাকড়ে এক জায়গায় জড়ো করে আনা-পরমহংসদেবের। কথায়। এই জড় পুত্তলিকায় মন দিয়েই সহজে সেটা হয়ত সম্ভব হয়। আর তখনই হয়ত, সেই পুতুলই প্রতিমা হয়ে ওঠে একদিন–জড়ের আড়ালেই অনন্ত শক্তি বিশ্বচৈতন্যের সাক্ষাৎ মিলে যায় কারো কারো।
মনকে জড়ো করা কি রকম মশাই?
মা বলতেন, সব কিছুর থেকে মনকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে এই দুই ভুরুর মাঝখানে নিয়ে এসে একেবারে নির্ভাবনা হয়ে যাওয়া। সেটা মুহূর্তের জন্য হলেও হয়। যে মুহূর্তেই তোর সব ভাবনা থেকে মুক্ত হবি, বলতেন মা, সেই মুহূর্তেই অভাবিত কতো কীর যে উন্মুক্তি ঘটবে!-মা খুব সহজ করে বলতেন কথাগুলো, কিন্তু কী ভাষায় যে বলতেন, সঠিক মনে পড়ছে না–তবে মোদ্দা কথাটা হচ্ছে তার এই। আমার নিজের ভাষণে ব্যক্ত করলাম।
ধারণা করতে পারছি না।
আমিও পারিনি। এখনও পারি না। কেউ পারে কিনা সন্দেহ! তবে তার কোনো দরকারও নেই নাকি, মা বলতেন। যেহেতু, বস্তুটা ধারণা করার নয়, প্রত্যক্ষ করার। গাছের ধারণা করে কী হবে, ফলের আস্বাদ নিয়ে কথা-বলতেন না ঠাকুর? ফলেই পরিচয়।
ফলে?
ফলে বই কি। করে দেখুন না। একটুক্ষণের জন্যেও মনকে জড়ীভূত করে সব ভাবনা দূর করতে পারলেই অফুরন্ত নতুনের উদ্ভাবনা–দেহে মনে জীবনে-গোচরে অগোচরে। সব কিছুর নবনবোন্মেষ ঘটে। যততা আধিব্যাধি সারার পথ ধরে তক্ষুনি কত সুযোগ সন্ধানের পথ খুলে যায়। এমন কি, আমার গল্পের যত না নতুন নতুন আইডিয়া-সে তো আমি এই করেই পাই মশাই। রামের পাদুকা মাথায় জড়ভরত হতে পারলেই আরামের রামরাজ্য লাভ।।
তাই বুঝি এখানে এসে প্রার্থনা করছিলেন? প্রার্থনা করেন সেই জন্যেই!
প্রার্থনা কিসের! কিছু চাইবার দরকার করে না। আসল কথা, দেহে নিস্পন্দ আর মনে নিঃশব্দ হওয়া–অন্তত ক্ষণেকের জন্যেও। বাস, তাহলেই হোলো। হয়ে গেল তক্ষুনি। সেই অচিন্তন থেকেই অচিন্তনীয় লাভ। নিশ্চিভির থেকেই নিঃশেষে প্রাপ্তি। কম ভাবনার থেকেই যতো সম্ভাবনা। অবশ্যি ঘরে বসেও যে নির্ভাবনায় জড়িয়ে যাওয়া যায় না তা নয়, কিন্তু এখানে এই সাক্ষাৎ জড়তার সামনে দাঁড়িয়ে জর্জর হওয়াটা একটুখানি সহজতর নয় কি? বিশেষ পরম শিব যেখানে স্বয়ং জড়ীভূত হয়ে দেশকালাতীত নিজের বুকের মহাকাশ বিস্তারে মহাকালীর অনন্ত লীলায় তন্ময় হয়ে রয়েছেন? জীবশিবের খণ্ডকালের নব নবদ্বীপে নিত্য চৈতন্যলীলা?
