কই, কিছু তো মনে পড়ছে না এখন?
মনে পড়ছে না? আমার মনে আছে। বলেছিলাম না, বিয়ের আগে তোমার কথাটা আমি রাখব। বলেছিলাম না যে খাইয়েটাইয়ে যাব তোমায় শেষবারের মতো-যতো চাও।
ও! সেই কথা। আমার মনে পড়ে। আমার সেই ফাঁসির আগের সাধ-তার এই আশীর্বাদের দিনটাতেই।
না। আমার কিছু চাইনে আর। অনেক পেয়েছি তোর কাছে। এমন কেউ বুঝি পায় না কখনো। তবে তুই কী আর দিয়েছিস? আমার মা দিয়েছেন বলেই পেয়েছি। মা-ই তো দেয়।…তা ছাড়া তুই পরের হতে যাচ্ছিস এখন, পরদ্রব্যে লোভ করা কি ভালো?
এমন কি তুমি যদি চাও…চাও তো…
সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে– এখন তো আর ভয় নেই-ভাবনারও কোনো কারণ নেই আমার! বিয়ে তো হচ্ছেই।
না না…কক্ষনো না। আমি চেঁচিয়ে উঠি-ও সব নয়। আমি তোর বন্ধু নই? দাদা না? তোকে আমি নষ্ট করতে পারি?
তখনকার সেই কথায় এখন আমার হাসি পায়। কিন্তু সে সময়ে এমনটাই ছিল বুঝি। শরৎবাবুর বই পড়ে সব ছেলেমেয়েই অদ্ভাবিত হয়ে গেছল তখন। তাঁর ভাবধারায় মোহাচ্ছন্ন হবে সবাই তাঁর উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা– সব ছেলেই সতীশ, সব মেয়েই সতী।
সেই মোহনার মুখে তখন একটিই দ্বীপ কেবল। সন্দীপের চর। রক্ত-মাংসের মানুষ বলতে ঘরে-বাইরের সেই সন্দীপ। একটি মাত্রই ব্যতিক্রম সেই।
তখনো গৃহদাহের পর্ব আসেনি। ঘরপোড়া হনুমানদের সাক্ষাৎ মেলেনি তখনো।
আমার কথায় সে হাসল। বলল, বেশ, তাহলে দাদার মতই তুমি আশীর্বাদ কোরো আমায় আজ। সন্ধ্যেয় যখন সবাই আশীর্বাদ করতে আসবে, আমাদের দোতলার ঘরে এসো, আসবে তো?
যাবো। কিন্তু কি করে আশীর্বাদ করে জানিনে যে। করিনি কখনো।
মাথায় ধান দূর্বা দিয়ে করতে হয়–আবার কী? সবাই যেমনটা করবে…
তাই করব না হয়…আচ্ছা, মনে মনে করলে হয় না?
সত্যি বলতে, ওকে নিয়ে সবই তো আমার মনে মনে করা। গড়া, ভাঙা, আবার নতুন করে গড়া।
আশীর্বাদের ক্ষণটিতে ওর দিদি এসে ডেকে নিয়ে গেল আমায়। খবর পেয়ে শ্বশুর বাড়ির থেকে একটুকু আগেই এসেছিল সে।
কার্পেটমোড়া ওদের দোতলার ঘরটায় আর সবার পাশে গিয়ে বসলাম। ঘরের আসবাবপত্তর দেখে আমার চক্ষুস্থির! ঝকঝকে কতো কি-নামও জানিনে। সবকিছুই রিনির শ্বশুরবাড়ি যাবে–বিয়ের তত্ত্বে ওর।
বরের বাবা মা মামা আশীর্বাদ করলেন রিনিকে। ব্রেসলেট নেকলেস গিনি মোহর আংটি ইত্যাদি দিয়ে। রিনির গায়েও ছিল অনেক কিছু-ঐসবই–অন্য প্যাটার্নের।
আমার দিকে তাকালো সে। একটুখানি হাসলো বুঝি।
কিন্তু শুকনো ধান দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করতে আমার হাত উঠলো না। হায়, কাউকে কিছু প্রেজেন্ট দেবার মতন বরাত দিয়েও যে পাঠায়নি আমায় বিধাতা। কোনো রকমে আমাকেই প্রেজেন্ট করে দিয়েছে কেবল।
কিন্তু এ প্রেজেন্ট কারো পাতে দেবার নয়। হাতে দেবার নয়।
আশীর্বাদের পালা চুকলে কর্তারা সব পাশের ঘরে চলে গেলেন। মেয়েরাই রইলো শুধু সেই ঘরে–রিনির মা মাসি পিসি দিদি এরাই। বসে বসে গুলজার করতে লাগল।
রিনিও রয়ে গেল এক পাশটিতে চুপটি করে বসে, সেজেগুজে তেমনটিই।
আর, আমিও রয়ে গেলাম সেখানে স্থাণুর মতই। ওদের কেউ কিছু বলল না আমায়, ধর্তব্যের মধ্যেই ধরল না। গালগল্প চলতে লাগল তাদের।
চোখ জড়িয়ে আসছিল রিনির। সারাদিনের ঝাড়পোঁছ সাজগোজ–কম ধকলটা যায়নি তার ওপর। ঘুমের আবেশে কার্পেটের ওপর গড়িয়ে পড়েছিল সে।
নিজেদের গল্পেই গিন্নীরা সব মশগুল। কেউ লক্ষ্য করছিল না তাকে–আমিই একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। আমিই কেবল চেয়েছিলাম হাঁ করে…ফাঁসির আগেকার এই খাওয়া আমার-গিলছিলাম আমার দু চোখ দিয়ে।
ঘুমের ঘোরে গড়াতে গড়াতে কখন সে আমার চেয়ারের গোড়ায় চলে এসেছে–আমার পায়ের কাছটিতেই।–
পা গুটিয়ে নিয়েছি আমি–পাছে ওর মাথায় পা ঠেকে যায় আমার।
ঘুমের ঘোরেই যেন সে হাত তুলেছে, আলতো করে পা ছুঁয়েছে আমার, তার পরে সেই হাত নিয়ে যেন ঘুমের আবেশেই মাথায় ঠোঁটে ঠেকিয়েছে নিজের।
এটা কি ওর বিদায় নেওয়া নাকি? চিরবিদায় তার? এমনি করেই?
আমার মনটা কেমন করে উঠল। আমি আর বসতে পারলাম না। উঠে পড়লাম তক্ষুনি।
সিঁড়ির মুখে রিনির দিদির সঙ্গে দেখা-কোথায় বেরুচ্ছ এখন? এখনই সবাই খেতে বসবে, তুমিও আমাদের সঙ্গে খাবে আজ। তোমার তো অসুখ নেই আর। বাবা বলল।
মাথাটা বডডো ধরেছে দিদি। ঘুরে ফিরে একটু বাইরের হাওয়া লাগিয়ে আসি। দেরি কোরো না যেন। জানো, এই আশীর্বাদের খাওয়াটাই হচ্ছে আসল। বিয়ের ভোজটা কিছু না–চয়েস করার মতো খাবার না। এটাতেই পরিপাটি থাকে। বুঝেছ?
ঘাড় নেড়ে সিঁড়ি টপকে উতরে আসি রাজপথে, আমার স্বরাজ পথে। সোজা রাস্তায় আমার–চিরদিনের আস্তানায়।
আর কেন?
এবার চলে যাই আমার মায়ের উঠোনেই সটান। সেই ঠনঠনেয়। সেখানে গিয়ে লম্বা হইগে এখন।
কাল ভোর হতেই ফের লাইন লাগাতে হবে শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসে। আর, একটা মেসের খোঁজ করতে হবে তারপরই।
আচ্ছা, এটা কি করলো রিনি? যেতে যেতে ভাবি। ভাবতে ভাবতে যাই।
ঘুমের ঘোরে আড়মোড়া ভাঙার ছলনায় সবার অলক্ষ্যে সে আমার পায়ে হাত ঠেকিয়ে এই যে নিজের মাথায় মুখে ঠেকানো-মানেটা কী এর? এ কী রকমের তার বিদায় নেওয়া? কী ধরণের বিদায় দেওয়া?
অনেকদিন ক্ষণে ক্ষণে সেই কথাটা মনে মনে ভেবেছি, ভাবি আমি আজও। কিন্তু মানে খুঁজে পাই না। মনে হয়, বিদ্যায় বুদ্ধিতে বয়সে অভিজ্ঞতায় মেয়েরা যতই পরিণত হোক না, সারা জীবন ধরে আসলে তারা সেই একরকমটাই থেকে যায়–সেই পরিণীতাই। এক আঁচড়েই সেটা ধরা পড়ে।
