এ কী গান গাইছে রিনি? আমার মনের কথাগুলোই আমার কানের গোড়ায় উজাড় করে দিচ্ছে যেন…আমি তোমারই বিরহে রহিব বিলীন/আর তোমাতে করিব বাস/দীর্ঘদিবস, দীর্ঘরজনী, দীর্ঘ বরষমাস।…
অনেকক্ষণ পর পকেটভর্তি সন্দেশ নিয়ে এলো রিনিতোমার জন্যে আগের থেকে সরিয়ে রেখে ছিলাম…।
আমার খিদে নেই। তাকালাম না সন্দেশের দিকেও। জীবনে এই প্রথম। মিত্রদের সঙ্গে পাত্রও ছিল, জানা গেল, আর ছিল নাকি ওর মামা। বরের অভিভাবকদের ভেতর হলেও আবার তার বন্ধুও বটে সে। মেয়ে দেখে তাঁদের পছন্দ হয়েছে, এই তীদের পাকা কথা, পাকাপাকি তিনি বলে গেছেন নাকি। বরের কোনো পণের দাবিদাওয়া নেই জানা গেল তাঁর কাছেই।
এই সপ্তাহেই আমার আশীর্বাদ, পরের হপ্তায় বিয়ে।…নাও, এবার খেয়ে নাও তো লক্ষ্মীটি।
না! আমি দুধ-বার্লি খাবো। রুগীর পথ্য নাকি এ?
ওদের বাড়ির বাচ্চাটা একটা ক্যাম্পখাট এনে খাড়া করলে আমার চৌকির পাশে।
এটা কি জন্যে রে?
বা, আমি থাকব না এখানে রাত্তিরে?
ঐখেনে শুবি? আলাদা? কেন, সেই জেলের মতন…।
এটা জেল নয়…..ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে সারা রাত, মা বলেছে। সিঁড়ির আলোটাও জ্বলবে। বুঝেছ? মাঝে মাঝে এসে মা দেখে যাবে আমাদের।
কেন রে?
কেন যে তা কী বোঝাবো তোমায়! ঘরে সোমত্ত মেয়ে থাকলে মার যে কী অশান্তি কতো ভাবনা-তা সে মারাই জানে।
তুইও জানিস! তুই মা হয়েছিস কিনা!
আমরা মেয়েরা জন্ম থেকেই মা হই তা জানো? এইটুকুন-টুকুন খুকীদের পুতুল নিয়ে ঘরসংসার পাততে দ্যাখোনি? ছেলেমেয়েকে খাওয়ায় শোয়ায় নাওয়ায়, মাই খাওয়ায় আবার!…..তা, কী করেই বা দেখবে। তোমার তো কোনো বোন নেই, দ্যাখনি তুমি, জান না তাই।
মাই খাওয়ায়? ওই বাচ্চা খুকীরা? কিন্তু তাদের কি…তবে মা-ই খাওয়ায় বটে, সারা জীবন ধরে…..তার পরেও…জন্ম-জন্মান্তরে।
তবেই বোঝ।
আমার মাকে এমনি ধারার একটা কথা বলতে শুনেছি বটে। মেয়েরা জন্ম থেকেই মা। মা হয়েই জন্মায়-মা হবার জন্যেই। বলতেন বটে মা! কিন্তু তার মানেটা ঠিক ঠিক বুঝিনি তখন।
এখন তো বুঝলে? সব সময় মায়ের ভাবনা ভাবতে হয় আমাদের…একটা কথা বলব?
বল।
এবার তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে পড়াশুনায় মন দাও–কেমন? তারপর মনের মতন কাউকে বে-থা করে সংসারী হয়ে সুখে থাকো সারা জীবন।
ও কথা বলিসনে।…সংসার করা আমার ধাতে সইবে না।
বৈরাগযোগ কঠিন উধো, হাম না করব হো।–কোন্ বইয়ে যেন পড়েছিলাম কবে! সেই কথাটাই একটু পালটে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিই-সংসার ভারী কঠিন ঠাই ভাই! সংসারযোগ কঠিন উধো, হাম না করব হো! সে আমি পারব না উদ্ধব!
আমার এই উদো মার্কা জবাবে একটু চুপ করে থেকে সে বলে-সে কথা থাক তাহলে। যখন করবার করবে ঠিকই। সে রকম মেয়ের পাল্লায় পড়োনি তো! ঘাড় ধরে করিয়ে নেবে। আচ্ছা, বিয়ে না হয় নাই করলে এখন, রাস্তাঘাটে ওরকম হাঘরের মতন পড়ে থেকো না আর। একটা মেসবাড়ি খুঁজে নিয়ো। কলকাতার অলিতে গলিতে বাসা বেঁধে থাকে কেরাণী-ছাত্ররা, চাকরি করে পড়াশোনা চালায়, জানো না? খুব সস্তা খরচে থাকা যায় সেখানে, জানো?
জানব না কেন? চরিত্রহীন পড়েছি আর মেসবাড়ির খবর রাখিনে? সেখানে যে সাবিত্রীরা থাকে তাও বেশ জানি।
সাবিত্রীদের খপ্পরে পড়তে যেয়ো না যেন, সাবধান। শক্ত রোগে ধরবে। বাবার ডেস্ক থেকে একটা বই এনে পড়তে দেব তোমায় পড়ে দেখো, তাহলে বুঝবে।
জানি আমি। পাঁজির বিজ্ঞাপন পড়েই কবে আমার জানা! নেহাত যারা পাঁজির পাঝাড়া, তারাই সাধ করে ওই সব ফ্যাসাদ ডেকে আনে-ওই সব নোংরা অসুখ বাধায়। সে বিষয়ে আমি ওকে আশ্বস্ত করি- তাছাড়া সতী-সাবিত্রি বলে না? সাবিত্রিদের সতীশদের ওপর নজর। আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না কেউ, তুই নিশ্চিন্ত থাক।
আহা, তারা নজর না দিলেও তোমার নজর পড়তে তো কোনো বাধা নেই?
যে কারণে আমি স্ত্রৈণ হতে পারব না, ঠিক সেই কারণেই আমার ঐ পথে যেতে বাধবে, বুঝেছিস? আর, যে চেহারা নিয়ে জন্মেছি না, কারো পাতে পড়ার কোনো কথাই নেই…আমাদের জেলার সতীশ কি তোদের জেলার ঐ দেবেনের মতও যদি শরীরটা পেতাম না, তা হলেও কথা ছিল একটা, কিন্তু এ যা একখানা…..মরে গিয়ে ভাগাড়ে আমায় ফেলে দিলেও শেয়াল-কুকুরেও মুখে তুলবে না। সে কথা থাক, তোর কথাটা বল্। তোর এই চুল নিয়ে কোনো কথা উঠল না? একচুলও নয়? জানার কৌতূহল হয়।
এই বব চুলের জন্যেই আরো বেশি পছন্দ হয়েছে ছেলের, তা জানো? বলেছে যে, এমন মর্ডান মেয়ে, এমনটাই নাকি সে চাইছিল। চুলের জন্যেই কোনো পণ লাগছে আমার বিয়ের। এক কাঁড়ি চুল নিয়ে এক কাঁড়ি টাকা বেঁচে নিয়েছে বাবার। মা বেজায় খুশি তাই আমার ওপর এখন। এমন কি, তোমার ওপরও।
হিতে বিপরীত না হয়ে বিপরীতে হিত হয়ে গেল তো!
আমার পার্বণের পালা ফুরোলো এবার, শেষ পর্বে এসে পড়লাম শেষটায়। উৎসবের দিন কাটলো অবশেষ।…..
সেদিন বিকেলে অপরূপ সাজসজ্জায় রিনি এলো আমার ঘরে আবার।
আজ সন্ধ্যায় আমার আশীর্বাদ। কালকেই আমার বিয়ে।…তুমি কিছু বলছ না যে?
আমি কী বলব আবার? আমার কী বলার আছে? বিয়ে তো ভালোই রে! বে-থা করে সুখে ঘর বেঁধে ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসারী হ, সুখি হ।
এই তোমার কথা? আমার কথাগুলোই শোনাচ্ছ তুমি ঘুরিয়ে আমায়? আর কিছু বলার নেই তোমার?…এতো কথা ছিল যে তোমার গো!
