বিলক্ষণ! রিনিকে যে অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারে, সে কি আর তার বিয়ের পদ্য বিলি করতে পারবে না?
লিখব বই কি মাসিমা। এমন একখানা কবিতা লিখব না!…
বিকেলের পড়ন্ত রোদ জানালা গলে মুখের ওপর এসে পড়তেই ঘুম ভাঙলো আমার। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি রিনি বসে বিছানার পাশটিতে। এমন সেজেগুজে এসেছে যে!
কি রকম আছো এখন?
ভালোই তো। কেবল গা-হাত-পা একটুখানি কামড়াচ্ছে যেন কেমন।
টিপে দেব একটু?
না।
টিপতে পারি বেশ। বাবার পা টিপে দিই তো আমি। দিই না কেন?
না। তোকে আমার পায়ে হাত ঠেকাতে দেব না, কক্ষনো না।
তুমি যে একদিন আমার পায়ে…..আর আমি তোমার পা ছুঁতে পর্যন্ত পারব না?
আমার পা কামড়াচ্ছে না আর। ইস, দারুণ সেজেছিস যে! সত্যিই ইন্দ্রাণীর মতই দেখাচ্ছে যেন তোকে।
ইন্দ্রচন্দ্ররা দেখতে আসছে না আমায় আজ? আরেকটু বাদেই এসে পড়বে।
তবে যে শুনলাম জটিলা কুটিলা? পূতনা সূর্পনখারা? ছেলের মাসিপিসীরা আসবেন বললেন না তোর মা?
পুতনা আসেন কি তাঁর পুত্ররা আসেন ঠিক নেই এখনো। ছেলে তার বন্ধুদের নিয়েও আসতে পারে শুনছি।
পুত্র মিত্ররা? মানে, পাত্র মিত্ররা? বুঝলি রিনি, তার মধ্যেই তোর বরও থাকবে রে, ছেলের বন্ধুর ছদ্মবেশে।
সে জানি। তা আর বলতে হয় না। কোটি যে, তাও টের পাবো এক নজরে। রিনি হেসে কয়, এই প্রথম বিয়ে পাশের পরীক্ষায় বসছি না মশাই! চাঁচল থেকে এসে অবধি এই পালাই চলছে আমার। ছেলেরা হলে সহজেই পার পাওয়া যায়, একটু মুচকি হাসি, একখানা গান গাইলেই মিটে যায়, কিন্তু মেয়েদের কাছে পরীক্ষায় পাশ করা দারুণ শক্ত-মহামারী ব্যাপার।
কিসে কিসের পরীক্ষা দিতে হয় রে? ইংরেজি অঙ্ক ইতিহাস ভূগোল গ্রামার সমসকৃত সব? এই বৈতরণী পেরুবার কোনো বই-টই নেই-নোট-ফোট?
বই নেই, কোন তরণীও নেই–তবে হ্যাঁ, নোটর গোছা পণ দিতে পারলে হয়!
রিনি কয়–আগাপাশতলা পরীক্ষা দিতে লাগে-মাসিপিসীরা কিছু বাকী রাখে না পরখ করার… চুলটুল টেনে টেনে দ্যাখে সব; জানা গেল রিনির কথায়, ঝুটো কিনা ঝুঁটি নেড়ে ভালো করে দেখে নেয়, দাঁতে টোকা মারে তার ওপর, বাঁধানো কিনা দেখতেই। দাঁতের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কথা কয় তারপর–হাঁ করো তত বাছা! হাঁটা কিসের জন্যে? না, মেয়ের হাঁ কতো বড়ো, তার সঙ্গে নাকি সুলক্ষণের কোন সম্পর্ক আছে। উই, আমি বলি, তা নয়। বাড়ির ডাল-ভাত কতো ধ্বসাবে, কেমন খাইয়ে মেয়েটা, তাই দেখবার জন্যেই ঐ হাঁ-কানোটা। কিন্তু ওভাবে কারো দাঁতে ঘা দিয়ে কথা কওয়াটা ঠিক কি? কিন্তু ছাড়ান নেই তার পরেও–পরীক্ষা আছে আরো। ঐ অতটুকুন ঘরের মধ্যেই ঘোড়দৌড় করিয়ে ছাড়ে। ঘোড়দৌড়টা কিসের জন্যে? মেয়ে খোঁড়া কিনা বাজিয়ে দেখতে হবে না? পদে পদে পরীক্ষা-হাতে হাতে বাজিয়ে নেওয়া।
সেই ভগবানের মতই কুমারী ভগবতীদেরও।
এমন করে আপাদমস্তক পরখ করার পর শেষ পর্যন্ত সেই এক কথা-বাড়ি ফিরে খবর দেব ভাই। জানাবো আপনাদের। সে-খবর কিন্তু আর কোনো দিনই আসে না।
বাঁচা যায়! আমি হাঁফ ছাড়ি।
বাড়ি গিয়ে জটলা করে মেয়েরা একটা না একটা খুঁত তারা বার করেই। বেরুবেই খুঁত। অমন চাঁদের খুঁত আছে আর মেয়ের খুঁত থাকবে না? নিখুঁত কেউ হয় নাকি কোথাও?
আর ছেলেদের কাছে পরীক্ষা দিলে?
সঙ্গে সঙ্গে পাশ। একটুখানি আড়চোখে তাকালেই হোলো। বাড়ি গিয়ে মরে থাকবে সব কটাই। সবারই বাসনা হবে ওই মেয়েটিকেই।
ভাগ্যিস, একালে সুন্দ উপসুন্দর লড়াই হয় না–সুন্দরের জন্য! কিন্তু হলে কী হবে, মেয়ে আর পাত্রস্থ হয় না। ছেলের পছন্দ হলেও ছেলের বাবা-কাকারা আসেন তারপর-রে দামে পটে না। বাপের পণের কাছে ছেলের প্রাণপণ ভেসে যায় কোথায়।
তাই যাক না। আমি সায় দিই। সেই তত ভালো।…আচ্ছা, আড়চোখে তাকানোটা আবার কী রকমের রে? কাকাতুয়ার মন ঘাড় বেঁকিয়ে নাকি?
না না। এই রকমটা। তারাটাকে সে চোখের কোণে ঠেলে আনে-এই যে! আর এইটে হোলো গিয়ে চোরা চাউনি। আর একেই বলে কটাক্ষপাত।
তিনটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আমার মনের পিঠে যেন কশাঘাত। তিনখানা সপাৎ! –ও বাবা! তাই নাকি? বইয়ে পড়েছি বটে, কিন্তু চোখে পড়ল এই! আমার জীবনে এই প্রথম বটে! এমনি মারাত্মক একেকখানা? আমার জানা ছিল না।
কি করে জানবে! মেয়েরা জানে। জন্ম থেকে–আপনার থেকেই। তুমি তো কোনো মেয়ের সঙ্গে মেশনি কখনো? আমার আগে কোনো মেয়ে তো মেশেনি তোমার সঙ্গে জানবে কি করে?
আচ্ছা, যদি ছেলেরাই আসে আজ? আর তোকে গান গাইতে বলে, কোন গানটা গাইবি তুই? আমি শুধাই?
মনে করো-শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর/অন্য সবে কথা কবে/তুমি রবে নিরুত্তর বিয়ের ভাঙচি দেবার পক্ষে মোক্ষম হবে–কী বলে?
রাস্তা থেকে মোটরহর্নের আওয়াজ এলো। মা ডাকতেই রিনি নেমে গেল। কারা এলো কে জানে! সূর্পনখারা? না, সুলক্ষণরা?
একটু বাদেই রিনির গলা পেলাম ওপরে শুয়েই। সুরলহরী ভেসে এলো তলার থেকে। গাইছে রিনি….. কিন্তু এ তো সেই রম গানখানা না, গানের যা নাকি চরম!…আমার পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই তুমি তাই গো! তোমা ছাড়া এ ভুবনে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো।
আড়চোখের ওই চাউনির ওপর এই যদি গানের বউনি হয় ওর, তাহলে আর দেখতে হবে না! বউয়ের জন্যে ছেলে হন্যে হয়ে উঠেছে এতক্ষণে-বউ না নিয়ে বাড়ি ফিরছে না আর। তাই কি এখুনি হয়ত ঘাড়ে করে ঘোড়দৌড় লাগাবে সে-সেকালের পৃথ্বিরাজের মতই সংযুক্ত হয়ে।
