বেয়ান তো দেখে গেছেন, এখন শুনছি ছেলের মাসিপিসীরা নাকি দেখতে আসবেন আবার। এসে যদি মেয়ের চুল না দেখতে পান…
ভাবতে গিয়ে আবার উনি দিশাহারা।
যারা আমায় দ্যাখে না মা, আমার চুল দ্যাখে খালি, একচুল মাত্র দাম দেয় আমায়, ফোঁস করে ওঠে রিনি, তাদের বাড়ি আমি নাই বা গেলাম মা!
সত্যি, যেখানে মেয়ের কোনো দর নেই, তার চুলেরই শুধু কদর… আমি ওর সানাই হতে যাই।
তুমি থামো তো রাছা! এক ঝটকায় আমায় উনি চুপ করিয়ে দেন–এ সবের কী বোঝো তুমি?
আমায় তোমরা পড়তে দাও না? বিয়ে পাশ করতে দাও না আগে? বিয়ের কী হয়েছে এখন? আমি আরো পড়ব… বাবার মতন ডাক্তার হই যদি? বি. এস-সি. পাশ করার পর আমি ডাক্তারি পড়তে চাই।।
তুই থাম। ঝাঁঝিয়ে ওঠেন উনি-বিয়ের বয়েস পার হয়ে যাচ্ছে, সে হুঁশ আছে তোর? বারো বছরে বিয়ে হয়েছিল আমার, সেই বারো কবে পেরিয়ে ষোলোয় পড়তে চলেছিস! বিয়ের সব ঠিক, এদিকে মেয়ে উধাও! কুটুমমহলে কান পাতা যাচ্ছে না–যে কেলেঙ্কারিটাই না হোলো!
কেলেঙ্কারি কিসের মা? দেশের জন্যে কি মেয়েরা আজ যাচ্ছে না জেলে? বাসন্তীদেবী, ঊর্মিলাদেবী, আরো কতো সব বড় বড় বাড়ির মেয়েরা যায়নি কি? তুমি তো জানো মা?
কুটুমদের কী আর, তারা তো সব মুখিয়েই রয়েছে কি করে এমন সম্বন্ধটা ভাঙচি দিয়ে ভাঙতে পারে, কোমর বেঁধে তৈরি সবাই! কতো বড়ো ঘর, বংশ মর্যাদা, বাড়ি গাড়ি, আরো কত কী! কেমন পাত্তর! মরবে না হিংসেয়? বিয়ের সব পাকা, ইদিকে এনার পাত্তা নেই। আত্মকুটুম মহলে মুখ দেখাবার যো নেই! কোথায় যে কার সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে মুখ পুড়িয়েছে ছুঁড়িটা! কানাঘুষা করছে সবাই।
কিন্তু মেয়ে তো আপনার কুলত্যাগ করেনি মাসিমা, চুলত্যাগ করেই ফিরেই এসেছে তো। মুখটুখ কিছু পোড়েনি, চেয়ে দেখুন এক চুল কম হলেও নিখুঁত সেই রকমটিই।
আমি রিনির সাফাই গাইতে যাই, উনি এমন ধমক লাগান আমায়! এক চুলের ফারাকে এমনটা কী যায় আসে, আমি তো তা ভেবে পাই না।
তুমি থামো তো বাপু! মেয়েটাকে আমার তুমিই বখিয়ে দিলে। ওর মাথাটা খেয়েছো তুমিই।
আমার মা কিন্তু বলে যে… বলার মুখেই বাধা পাই। অদূরে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে আমার কথার মুখে সে হাত চাপা দেয়। সেদিনকার কয়েদ গাড়িতে তার সেই তর্জনী সঙ্কেত দেখি।
আমি চেপে গেলেও উনি নিজের ক্ষোভ চাপতে পারেন না : আমার এমন সোনার টুকরো তোমার পাল্লায় পড়ে বিগড়ে গেল। এত ভালো মেয়ে, যার কেউ নাকি কখনো এতটুকু বেচাল পায়নি, সেই বিন্ন জেল খেটে এলো আবার। ওর মাথায় দেশোদ্ধারের এইসব পোকা কে ঢোকালো? চাঁচলে থাকতে পিস্তল নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে মারতে গিয়েছিলে তুমি, আমি জানিনে কি? ওর কচি মাথার দেশের ধান্দা কে ঢুকিয়েছে? কী মতলবে যে তুমি ওকে এমনি করে ফুসলে নিয়ে গেছলে তুমিই জানো!
তুমি কী বলছো মা? রিনি চেঁচিয়ে ওঠে–রামদা কোথায়! আমি তো সেই জেলে গিয়েই না ওর দেখা পেলাম। ও যে কলকাতায় এসেছে তা-ই আমি জানতুম নাকি? রামদা এখানে এসে আমাকে ভুলিয়ে নিয়ে যাবে কি ও তো আমাদের বাড়ির ঠিকানাই জানত না। মিথ্যে দোষে দোষী করছ ওকে। অমন করে বলছ কেন রামদাকে? শক্ত রোগ হয়েছে না ওর? মনে লাগল অসুখ ওর আরো বেড়ে যাবে না? তুমি যে কী মা?
ওর মা কিছু বলেন না আর। চুপ করে শোনেন।
সত্যি বলতে গেলে, রামদার জন্যেই ছাড়া পেলাম তো! চার মাসের জেল হয়েছিল না আমার? এত তাড়াতাড়ি ছাড়ত নাকি? কিন্তু শক্ত অসুখের জন্য দশদিনের মধ্যেই ছেড়ে দিলো ওকে, আর আমি ওর ভাই বলে পরিচয় দিয়েছিলাম তাই ওর তদারকের জন্যে আমাকেও ছাড়তে হোলো তাদের। ও না হলে–ওর অসুখ না হলে এত শীগগির আমি ছাড়া পেতুম নাকি? অসুখটা বাঁধিয়েই তো রামদা বাঁচিয়ে দিয়েছে আমায়! তা জানো?
কর্তা এতক্ষণে বাথরুম থেকে বেরিয়েছেন। যা এবার তুই নেয়েটেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হ। সেজেগুজে তৈরি হয়ে থাকা রোজই ওরা ফোন করে খবর নিচ্ছে, কবে আসবে মেয়ে দেখতে। কখন এসে পড়বে ঠিক নেই। হয়ত আজ বিকেলেই তোকে দেখতে আসতে পারে। এই যা চুল আছে শাপু-টাপু করে একেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাতে হবে। এই কদিনে যা ছিরি হয়েছে না মেয়ের!
এতক্ষণ যেন বিষদৃষ্টি হানছিলেন, এবার মনে হল, আমার দিকে একটু উনিশ নজরে তাকিয়ে রিনিকে নিয়ে উনি চলে গেলেন। আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর এই ইতর-বিশেষে, আমার মনে হল, আমাকে আর বিশেষ ইতর বলে বোধ করছেন না বোধহয়। হাঁফ ছেড়ে আমি বাঁচলাম।
খানিক বাদেই তিনি ফিরে এলেন আবার–আমার খাবার নিয়ে। দুধ আর পাঁউরুটি।
খেয়েদেয়ে বেশ করে ঘুমোও। রেস্ট নাও এখন। উনি বলেছেন, গোড়াতেই ধরা পড়েছে রোগটা, এমন কিছু শক্ত হয়ে দাঁড়ায়নি। তেমন ভয়ের কিছু নেইকো। দশ বারো দিনেই তুমি সেরে উঠবে। সেরে উঠলেই উনি তোমার টিকিট কেটে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবেন-সোজা বাড়ি চলে যেয়ো। কোনো হুজ্জত হাঙ্গামায় মাথা গলিয়ো না। এখানে থেকো না আর, বুজলে? উঠতি বয়েসের ছেলেদের পক্ষে এই হইচই-এর সময় কলকাতায় থাকাটা ঠিক নয়। বুঝেছ?
আমি চুপ করে শুনি। কী জবাব দেব ওঁর কথার?
রিনির বিয়েটা তুমি দেখেই যেয়ো বরং। দশ বারো দিনের মধ্যেই চুকে যাবে আশা করছি। হ্যাঁ, তোমার নাকি পদ্যটদ্য লেখা আসে, বলছিলেন দিদি। তুমি তাহলে ওর বিয়ের প্রীতি উপহার লিখে দিয়োয়া, কেমন? পাড়ায় ছাপাখানা আছে, কর্তার পেশেন্ট তারা–সেখান থেকে ছাপিয়ে নিয়ে বিয়ের রাতে বিলি করা যাবে। কন্যাত্রী-বরযাত্রীদের তুমিই বিলি কোরো না হয়।
