কোথাও না!–পুলিসে ধরেছিল যে, আমি কী করব!
পুলিসে ধরেছিল? শুনেই মা আঁতকে ওঠেন–অ্যাঁ! …পুলিসে ধরেছিল তোকে?
ইস্কুল থেকে ফিরছিলাম তো! এক জায়গায় ছেলেরা সব পিকেটিং করছিল। পুলিসে ওদের ঘেরাও করে জায়গাটা ঘিরে রেখেছে, আমি কী করে জানব! সেই ফুট দিয়েই আসছিলাম, যেমন আসি না রোজ? ধরা পড়ে গেলাম। ছেলেদের সঙ্গে আমাকেও ধরে নিয়ে গেল থানায়। আমি কী করব?
পুলিসের হাতে পড়েছিলিস, বলিস কি? থানায় নিয়ে গেল পাকড়ে? তোর অমন সুন্দর চুল–কোথায় খোয়ালি?
পুলিসে ছেঁটে দিয়েছে যে! আমার কোনো হাত ছিল?
পুলিস ছেঁটে দিয়েছে? মেয়েদের গায়ে হাত দেয় পুলিস?
পুলিসের যে কী অত্যাচার তুমি জানো না মাসিমা?
মাঝখান থেকে বলতে হয় তখন আমায়-প্রাণে মারা যাচ্ছে কত জনা। আমার পাশেই একটা ছেলেকে এমন রুলের গুতো লাগালো না, সে কোঁক করে উঠেই ঢলে পড়ল, চোখ মেলল না আর। রিনি তো তবু রক্ষে পেয়েছে খুব। চুলের ওপর দিয়েই গেছে ওর–অল্পের জন্য রেহাই। এক চুলের জন্যেই বেঁচে গেছে বেচারা।
.
৫৪.
পুলিসে ধরে নিয়ে গেছল তোকে?-শুনে তো রিনির মার গালে হাত।
হ্যাঁ মা, ইস্কুল থেকে ফিরছিলাম, পথে এক জায়গায় ছেলেরা বিলিতি কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করছে দেখবার জন্যে একটুখানি দাঁড়িয়েছি কেবল, ওদের সঙ্গে পাকড়ে প্রিজন ভ্যানে পুরে আমাকেও ধরে নিয়ে গেল থানায়। সেখানে ছোরাগোছের এক বাঙালী পুলিস, পুলিস হলেও লোকটা ভালো, সে আমায় বলল কি–দিদি, মেয়েদের এখানে ভারী অসুবিধে, নানান বিপদ-আপদ, তুমি বরং ছেলেদের পোশাক পরে নাও, নিরাপদে থাকবে। তারপরে সেই আমায় এই হাফপ্যান্ট আর হাফ শার্ট এনে দিয়েছে, বিনুনি হেঁটে ব চুল বানিয়ে দিয়েছে সেই তো?
আমি হাঁ করে রিনির কাহিনী শুনছিলাম। সত্যি, মুখে মুখে এমন বানাতেও পারে বটে মেয়েরা।
গালগল্পে তাদের জোড়া মেলে না। কাহিনীবিন্যাসে তো অতুলনা। গল্প গাঁথনিতে তাদের জুড়ি নেই। উপমাহীন-তারা প্রত্যেকেই।
এই নিরুপমার কথাই ধরুন না! প্রায় সেই সময়েই নিজের দিদি নিয়ে প্রবাসীর আসরে এসে সারা ভারতবর্ষে কী শোরগোলই না তুলেছিলেন তিনি। লোকে প্রায় ধরেই নিয়েছিল যে, এই নিরুপমা দেবী আর কেউ নন, সেই শরৎচন্দ্রই–যিনি এর আগে আরেকবার অনিন্দিতা দেবীর ওরফে হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ভাগ্যিস তিনি যথাকালে ষোলোকলায় বিকশিত হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তাই রক্ষে, নইলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের একছত্ৰতলে তৃতীয় সম্রাটের হলে তাঁর বদলে আমরা একজন সাহিত্য-সম্রাজ্ঞীকেই পেতাম! ঐ নিরুপমা দেবীকেই।
সব মেয়েই গল্প রচনায় নিরুপমা। মালা গাঁথার মতই গল্পগাথায় ওস্তাদ।
জানো মা, সেই পুলিসটা কী বলেছিল আমায়? বলল যে, তোমার সঙ্গে এই যে বোনের মত ব্যবহার করলুম না,এর জন্য আসছে ভাইফোঁটায় তুমি আমায় নেমন্তন্ন করবে, বুঝলে? করবে তো?
মরে যাই আর কি! সুখের আর সীমা নেই আমার। বললেন রিনির মা-কনস্টেবলকে ভাইফোঁটা দেবো না তো দেবো কাকে! শুনেই আমি মূৰ্ছা যাচ্ছি।
মূৰ্ছা যাবার কথাই বটে! চুল ছাঁটাইয়ের পরই যে ভাই পাতিয়ে বসে, ভাতৃদ্বিতীয়ায় আসতে চায়, সেই অদ্বিতীয় ধুরন্ধর ফের ভাইফোঁটায় এলে উলটে জামাই হতে চাইবে কিনা তাই কে জানে!…পেয়াদাদের শ্বশুরবাড়ি হয় না, হতে নেই, সেই রক্ষে।
রিনির নিপুণ বর্ণনায় ওর মা আর আমি দুজনেই হাঁ।
তখনই আমার মনে হয়েছিল, অনুপমা আমার এই রিনিই একদিন হয়ত আমাদের নিরুপমা হয়ে উঠবে। নিরুপমার মতই সুলেখিকা।
সেটা হলে আমাদের সাহিত্যের এই বারো ভুইঞা রাজ্যে প্রথম সম্রাজ্ঞী হয়ে সে-ই বিরাজ বরত বুঝি আজ।
তবে সে আকাশ-কল্পনা না ফললেও দুঃখ নেই, উক্ত অভাবমোচনে, চতুর্থ সম্রাট তারাশঙ্করের পর অদ্বিতীয়া সম্রাজ্ঞীরূপে একজন এসে আমাদের সেই আশা পূর্ণ করছেন এখন। আশাপূর্ণাই।
তা, সেই শাড়ি ফাড়ি গুলো সব গেল কোথায় শুনি? মা শুধান।
আমি কি জানি! পুলিসটাই রেখে দিয়েছে হয়ত। জেলে গিয়ে শাড়ি যখন পরতেই পাব না তখন আর তার খোঁজ নিয়ে কী করব মা?
আমার আন্তরিক সায় তার কথায়। শুকসারির সম্বন্ধ অচ্ছেদ্য হলেও জেলের মধ্যে যেখানে কোনোই নাকি সুখ নেই, সেখানে ফের শাড়ির প্রয়োজনটা কিসের!
চুলোয় যাক শাড়ি, তার জন্য ভাবছিনে, কিন্তু তোর সেই চুল! তাও তো তুই খুইয়ে এসেছিস! তাঁর খেদোক্তি : আহা, সেই চুল!
আগুলফচুম্বিত! মানে না জানলেও বঙ্কিমরচনায় পঠিত কথাটা এই সুযোগে আমি যুগিয়ে দিই।
আমার প্রতি রোষকটাক্ষ হানেন মাসিমা। কিছু বলেন না।
হতভাগী! তোর সেই চুল দেখেই যে তারা পছন্দ করে গেছল রে! বেয়ানঠাকুরণ সেই চুল যদি না দেখতে পান মেয়ের…কী যে হবে তাহলে!
কী যে হবে ভেবে না পেয়ে তিনি মুহ্যমান, আর আমি ভাবি, এই চুলের ব্যত্যয়ে যদি বিয়েটা না হয় তাহলে তার চেয়ে ভালো বুঝি আর কিছুই হয় না!
লক্ষ কথায় যে বিয়ে নাকি ঘটে থাকে, লক্ষ্যে পৌঁছবার আগে এক কথায় তা ভেঙে যাওয়ার অনেক দৃষ্টান্ত আমি দেখেছি। এমন কি বিয়ের পরও তো কতই না ভাঙচুর হয়ে থাকে…হায়, দাম্পত্য জীবনের ন্যায় ক্ষণভঙ্গুর আর কিছুই নয় বুঝি!
এক চুলের হেরফেরে রিনির বিয়ে বাতিল হওয়ার তিলমাত্র সম্ভাবনায় ভর দিয়ে আমি দাঁড়াতে যাই। ভরসা পেতে চাই।
