আমার সেই ব্যাঙের জিম্মায়, মনের ব্যাঙ্কে সযত্নে এতদিন ধরে যে আধুলিটি জমিতে রেখেছিলাম তা আজ এই অর্ধচন্দ্র হয়ে দেখা দিল আমায়।
তাহলে তুই নোস, আর কেউ হবে বোধ হয়। ভুল করে গুলিয়ে ফেলেছি।
আমি ছাড়া আবার কে খাওয়ায় তোমায়? তির্যক চাউনি তারকার খাও আর?
তাও তো বটে! কার খাবো আর? তুই ছাড়া আমায় খাওয়াবার কে আছে আবার? আমি ভাবিত হই-তুই-ই খাইয়েছিলিস-তবে সেটা স্বপ্নই হবে বোধহয়। স্বপ্নেই দেখে থাকল হয়ত।
তাই বলো! সে হাঁপ ছাড়ে : হ্যাঁ, স্বপ্নে ওরকমটা দেখা যায় বটে। কততদিন আমিং স্বপ্ন দেখেছি অমন–যে তুমি আমায় খাচ্ছ, আমিও তোমায় …হ্যাঁ, সেটা হতে পারে।
সে কথা যাক, ই যে অসহায় অসতর্ক পেয়ে আমায় সঙ্গে ঈদৃশ আচরণ করবি তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি…
কী ঈদৃশ আচরণ?
পথ্য দেবার ছলনায় আমার প্রতি অপত্যস্নেহ দেখাবি–এই রকম বাৎসল্য করবি? এটা করা কি তোর উচিত হয়েছে?
তোমার কথার মাথামুণ্ডু যদি বুঝতে পারি?
অজ্ঞান অবস্থায় ঝিনুকে করে দুধ খাইয়েছিস আমায়? ও তো ােকারা খায় রে। আমি কি খোকা নাকি এখনো? বড় হইনি আমি?
সন্দেহ হয়।
ঝিনুকে খাবার বয়েস আমার গেছে। আমি এখন চুমুক দিয়ে খেতে পারি। তাই খাব। চুমুকে চুমুকে খাওয়াবি তো তুই আমায়?
হয়েছে! থামো তো। চুপ করো এখন। এখানে ওসব উচ্চবাচ্য একদম না। কেউ শুনলে কি দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না। এ তোমার জেলখানা নয়। জেলের স্বাধীনতা এখানে নেই। এটা বাড়ি। বুঝেচ?
ভারী শেখাচ্ছিস আমায়। বাড়ি যে জেল তা আমি অনেককাল আগেই জানি–তুই বাড়িয়ে কী বলবি আর! সেই জন্যেই বাড়ি থেকে পালিয়েছি কবে। চিরদিনের জন্যই-ঘর ছেড়ে আমি এই হাঘরে!
তোমাদের বাড়ি জেলখানা? বোলো না, বোলো না–অমন কথাটি বোলো না। তোমার বাড়ির পরিবেশ আমি জানিনে নাকি? ওরকম স্বাধীনতা কটা বাড়িতে আছে? আর কী ভালো যে খাও-দাও তোমরা! কতো আম, কলো রসগোল্লা, কতো ক্ষীর সর পায়েস। আঃ! আয়েসে ওর চোখ বুজে আসে। ওই বাপ-মা, অমন ভাই-কজন পায় গো? আমি পেলে বর্তে যেতাম।
হাজার এ-ক্লাসের হলেও জেল সেই জেলই! বুঝেছিস?
অমন সুখের বাড়ি হয় নাকি! সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় তোমায়। সেই ভূত, যাকে তুমি নাকি দেখেছিলে ছোটবেলায়, এখনো তোমায় ছাড়েনি তুমি বলেছিলে না? সেই ভূতটাই। সে-ই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। সে-ভূত আর কোথাও নেই বাপু, তোমার ওই মনের মধ্যেই বাসা বেঁধে রয়েছে। তোমায় শান্তিতে থাকতে দেয় না।
তোরা মেয়েরা তো সেকথা বলবিই রে! তোদের দুঃখ কদিনের আর! কদিনের কারাবাস। বিয়ে হোলো কি বাড়ির জেলখানা ছাড়লি, রাতারাতি আরেক রাজ্য জয় করে বসলি। তোর সেই নিজের রাজধানীতে তুই-ই রাণী-রাজা নেই কেউ সেখানে। নামমাত্র একজন থাকে বটে, সে গোলাম। ভূতের ব্যাগার খাটবার, কি পেত্নীর ব্যাপার যাই বলো!
আর তোমাদের?
বিয়ের পরই বনবাস-সেই রামচন্দ্রের মতই। জন্মের থেকে বাপ-মার অধীনতার মায়াপাশ আর বিয়ের পর স্ত্রীপূত্রের তাঁবেদারি–সেই নাগপাশ–আমাদের মুক্তি কোথায়? আজন্ম কারাবাস আমাদের…আমরণ!
আহা! কপট সহানুভুতিতে সে নিশ্বাস ফেলে।
কন্যারাশির রাশি রাশি সুখ, আর কন্যালগ্নের…মানে ওই হতভাগ্যদের দুঃখের সীমা নেই আর। একযাত্রায় পৃথক ফল যদি কোথাও থাকে তো সে এই গোধূলি-যাত্রাতেই।
বোলো না, বোলো না!
বলব না? খুনের আসামীরও হয় ফাঁসি হয়, নয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড–একটাই হয়, দুটো কখনোই নয়। কিন্তু বিয়ের স্বামীদের গোড়াতেই ওই ফাঁসি, তার পরে যাবজ্জীবন কারাবাস!
আমার কপট দীর্ঘনিশ্বাস।
তোমার ভাবনা কিসের? সে-ফাড়া তো তোমার কেটেই গেছে। নতুন করে আর তো কোনো ফাঁদে তুমি পড়তে যাচ্ছে না আবার!
তাতে কী, যাবজ্জীবনটাই এড়ানো গেছে, ফাঁসির দণ্ড তো মুকুব হয়নি আমার। ফাঁস তো লেগেই রইলো এই গলায়! তুই তো দুদিনেই ভুলে যাবি, আমার কিন্তু তোর জন্যে হাঁসফাঁস করে কাটাতে হবে সারা জীবন!
আর আমি বুঝি খুব সুখে থাকবো!
সেই জন্যেই বলছিলাম কি, ওর দুঃখের কথায় কান না দিয়ে নিজের বিনীত নিবেদন রাখি–ফাঁসির আসামীও যা চায় জেলে বসেই পায়, যা খেতে চায় তাই দেওয়া হয় তাকে-জানিস তো? কিন্তু আমার কী বরাত দ্যাখ। এত করে চাইছি কিন্তু আমার সেই ফাঁসির খাওয়াটা পাচ্ছিনে আর।
পাবে পাবে–কিন্তু এখন না। আমার ফাঁসির আগে, ফাঁসি হবার আগের দিনটায় কোনো এক ফাঁকে খাইয়ে যাব তোমায়-অনেকক্ষণ ধরে একখানা। কথা দিচ্ছি। কিন্তু এখন না লক্ষ্মীটি! দোহাই তোমার। এখন নয়। এক্ষুনি কোত্থেকে কে এসে পড়বে, দেখে ফেলবে–সর্বনাশ হয়ে যাবে। বলেছি না যে জেলখানায় রয়েছি? জেলার সাহেব এখানে না থাকলেও-জেল ঠিকই আছে।
বলতে বলতে জেলার মেম এসে হাজির।
আমার প্রতি বিরূপ দৃষ্টি হেনে এমন এক ঝঙ্কার তুললেন যে, দুজনেই আমরা চমকে গেলাম।
বলি, এই ধড়াচূড়োগুলো কি ছাড়া হবে রাজকন্যের? নাওয়া-খাওয়া নেই বুঝি আজ?
যাচ্ছি মা এক্ষুনি। বাবাকে বাথরুমে ঢুকতে দেখলুম না! এই দশ দিন চান করতে পাইনি জানো মা? কীরকম করছে যে গা-টা!
ছিলি কোথায় এই দশ দিন–শুনি? পাত্রপক্ষ মেয়ে দেখে পছন্দ করে গেল, এসে আশীর্বাদ করবে, দিনক্ষণ সব ঠিকঠাক, মেয়ে ইদিকে উধাও! বলা নেই কওয়া নেই, বেপাত্তা? কোথায় নেচে নেচে বেড়ানো হচ্ছিল ধিঙ্গি মেয়ের?
